‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট কর হ্রাসের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিতকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যা বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতিতে আয় বাড়বে, ফলে ভোগ ও চাহিদা বাড়বে, অর্থনীতি সবল হবে এবং কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। তাই এ বাজেট ‘প্রবৃদ্ধি অর্জনযোগ্য’ বাজেট। কিছু বিষয় বাদ দিলে বাজেটটি অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে। কভিড-১৯-এর প্রভাবে যখন জীবন শঙ্কাগ্রস্ত, কর্মহীন, আয়হীন ও লকডাউনের কারণে মানুষের জীবিকা বিপর্যস্ত, এ অবস্থায় প্রয়োজন সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি। বিষয়টি মেনে এবারের বাজেটে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েই করা হয়েছে ঘাটতি বাজেট। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫৭ (৬২.৭%) কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন  কর্মসূচিতে ব্যয় ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা (৩৭.৩%)। কিন্তু এ বাজেটে পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় বেশি কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় কম। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা (মোট রাজস্ব আয়ের ৮৪.৮%), এনবিআর-বহির্ভূত সূত্র থেকে কর রাজস্ব ১৬ হাজার কোটি টাকা (মোট রাজস্ব আয়ের ৪.১%) এবং করবহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আহরিত হবে ৪৩ হাজার কোটি টাকা (মোট রাজস্ব আয়ের ১১.১%)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব সংগ্রহের এ লক্ষ্যমাত্রা বেশি হলেও ২০২১-২২ অর্থবছরে গৃহীত আর্থিক সংস্কার, কর নেটের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধে নানা পদক্ষেপ, প্রশাসনিক সংস্কার, করছাড়ের মাধ্যমে বিনিয়োগে উৎসাহিতকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে তা অর্জন সম্ভব। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা (জিডিপির ৬.২%)। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা (মোট ঘাটতির ৪৭.২%) এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা (মোট ঘাটতির ৫২ দশমিক ৮%) সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ উেসর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সংগৃহীত হবে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে আসবে ৩৭ হাজার ১ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে জিডিপির ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এটা সাধারণত ৫ শতাংশের কম রাখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে করোনার মধ্যে অর্থনীতি সবল রাখতে হলে বেশি ব্যয় করতে হবে। তবে এ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণ দিতে অনেক দেশই আগ্রহী হওয়ায় বাংলাদেশ সহজে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। আবার বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থপ্রাপ্তি সম্ভব। রাজস্বের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তা গত বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। এটা অর্জন করা সম্ভব। এছাড়া ব্যাংকে প্রচুর তারল্য রয়েছে, সেটি ব্যবহার করা যাবে, তবে খেয়াল রাখতে হবে সরকারের গৃহীত অতিরিক্ত তারল্য যেন বেসরকারি বিনিয়োগের ঋণপ্রাপ্তিতে বাধা না হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। মোট বিনিয়োগ ধরা হয়েছে জিডিপির শতকরা হিসাবে ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির শতকরা হিসাবে ২৫ দশমিক শূন্য শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির শতকরা হিসাবে মাত্র ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ICOR  হলো ৪ দশমিক ৬, এটি অর্জনযোগ্য প্রবৃদ্ধি নির্দেশক।

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলো

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অর্থাত্ বরাদ্দ বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ, বাজেটের শতাংশ হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৪২ শতাংশে বৃদ্ধি পেলেও জিডিপির শতাংশ হিসাবে সমান (০.৯৫%)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ও মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে জিডিপির ১ শতাংশের কম ও মোট জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশের সামান্য বেশি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হচ্ছে। কাজেই এ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দ্রুত টিকা সংগ্রহ করে যারা কভিড-১৯ টিকা নেয়ার যোগ্য, তাদের সবাইকে দ্রুত টিকা দিতে হবে। দিনে ২০-২৫ লাখ মানুষকে টিকা দিতে হবে। টিকার নিবন্ধন মানুষের আরো দোরগোড়ায় নিতে হবে। দেশে টিকা উত্পাদন করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা সৃষ্টি করতে হবে। জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করে স্থানীয় থেকে জাতীয় সব পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনতে হবে। সুনির্দিষ্ট সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সব নাগরিকের নিবন্ধিত সাধারণ ডাক্তার থাকার ব্যবস্থা করা ও বিশেষজ্ঞ হাসপাতালের সঙ্গে নিবন্ধিত সাধারণ ডাক্তারের মাধ্যমে সংযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আর এ ব্যবস্থা চালু করতে জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে জন্ম, মৃত্যু, আয়-ব্যয়সহ নাগরিকের প্রয়োজনীয় সব তথ্য-উপাত্তের ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শিক্ষা খাত অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিমাণ ৫ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ ও জিডিপির ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ করা হয়েছিল মোট বাজেটের  ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থাত্ মোট বাজেটের বরাদ্দ বাড়লেও জিডিপির শতাংশিক হিসাবে বরাদ্দ কমেছে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে  মোট জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ ও  জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে মোট জাতীয় বাজেটের ১১ শতাংশ ও জিডিপির ২ শতাংশের সামান্য কম বা বেশি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়। করোনায় শিক্ষা খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থ বরাদ্দ দিয়ে পূরণ সম্ভব নয়। করোনার কারণে দেশের সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। স্থগিত পাবলিক পরীক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত এ প্রজন্ম। মেধা ও মননে ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশ ও জাতির সার্বিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিক্ষার এ ক্ষতি পূরণে কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি। দেশের শিক্ষাবিদ, শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের নিয়ে কমিটি গঠন করে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা খাতে করণীয় নির্ধারণ করা যেতে পারে। শিক্ষা খাতে সংস্কার করতে হবে। সময়ের প্রয়োজনে জাতীয় শিক্ষানীতি, পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষায় ডিজিটাল অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। ‘ডিজিটাল ডিভাইড’-এর শিকার শিক্ষার্থীদের সুলভ মূল্যে, বিনা মূল্যে কিংবা কম সুদে শিক্ষাঋণ দিয়ে স্মার্ট ডিভাইস ও ইন্টারনেট সেবা দেয়ার জন্য বাজেটে ভর্তুকি বরাদ্দ প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্লাস, প্রশিক্ষণ ক্লাস ও অন্যান্য প্রয়োজনে আলাদা টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন।

কৃষি খাতে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ২০২১-১১ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু মোট বাজেটে কৃষি খাতের শতাংশিক অংশ ২০২০-২১ সালে ছিল ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ হয়েছে। কৃষি খাতে ভর্তুকির সব টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয় না। ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত ১০ মাসে (জুলাই/২০২০-এপ্রিল ২০২১) ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। বাজেটে ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ‘কৃষি বীমা বা শস্য বীমা’ চালু করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সঠিক কবে শুরু হবে তা বলা হয়নি। বাংলাদেশে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে শস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শস্য বীমা করা কৃষক বীমার কিছু প্রিমিয়াম দেবেন আর বাকি প্রিমিয়াম সরকার ভর্তুকি  দেবে। কৃষি খাতের অর্জন ধরে রাখতে ও বাড়াতে হলে কৃষি খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি, কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে ভর্তুকি বৈষম্য হ্রাস করতে হবে। ব্যাপক মাত্রায় গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় ছাড়া প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বৈষম্য হ্রাস ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন। এজন্য গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ‘শস্য বীমা’ বা ‘কৃষি বীমা’, গবাদিপশু বীমা চালু করতে হবে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম (কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করে) চালু করা যেতে পারে। দারিদ্র্যপীড়িত ভৌগোলিক এলাকা (চর-হাওর-বাঁওড়) এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ (আইলা- সিডর-সাইক্লোন-বন্যা-খরা) এলাকার ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে কৃষিজ উপকরণ ক্রয়ে সুদহীন স্বল্পমেয়াদি (৬ মাস) ঋণ প্রদান দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে বলে তা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।  কৃষকরা যাতে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, এজন্য কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। প্রতিটি উপজেলাভিত্তিক কৃষি উপকরণ, পণ্য সংরক্ষণ এবং বিপণনের জন্য পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ (প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ) নির্মাণকল্পে বিশেষ অবকাঠামো, অনলাইন বাজার তৈরি প্রয়োজন। কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে। কৃষি উপকরণ কার্ডধারীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। কৃষকদের কৃষিঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে জামানতের পরিবর্তে ‘কৃষি কার্ড’ বা স্থানীয় পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের ‘প্রত্যয়নপত্র’ আমলে নেয়ার ব্যবস্থা করা।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়েছে ১২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। অর্থাত্ ১২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় মোট বাজেটের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল বাজেটের ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ ও জিডিপির ৩ দশমিক  শূন্য ১ শতাংশ। এ খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের শতাংশিক ও জিডিপির শতাংশিক উভয় ক্ষেত্রেই পরিমাণ বেড়েছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন (৩০ হাজার কোটি টাকা), সঞ্চয়পত্রের সুদ যোগ করা হয়েছে। ফলে এ খাতে বরাদ্দ বেশি দেখানো হয়েছে। তাছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা খাতের উপকারভোগীদের ত্রুটিহীন স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন হয়নি। সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী যোগ্য না হয়েও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভাতা নেন ৪৬ শতাংশ সুবিধাভোগী।  এছাড়া বিআইজিডি ও পিপিআরসির গবেষণা অনুযায়ী দেশে করোনার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে, তারা সামাজিক নিরাপত্তার আওতাভুক্ত হয়নি। শহুরে দরিদ্র জনগণের ওপর যথাযথ মনোযোগ দেয়া হয়নি। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আরো বেশি বরাদ্দ দিতে হবে। উপকারভোগীর সংখ্যা ও মাথাপিছু বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে ‘দরিদ্রের তথ্যভাণ্ডার’ বা ডাটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি। উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটি, এলাকাভিত্তিক চাহিদা নিরূপণে ত্রুটি ও দুর্নীতি দূর করতে হবে।

কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ বাজেটে পর্যাপ্ত প্রত্যক্ষ বরাদ্দ রাখা হয়নি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ উভয়ই বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নির্ভর করছে ব্যবসায়ীদের ওপর। করপোরেট করে ছাড় দেয়ার উদ্দেশ্য বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। দীর্ঘমেয়াদি এ প্রক্রিয়া বর্তমান ও নতুন ব্যবসাকে লগ্নি ও উত্পাদনে উৎসাহিত করবে, ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। করপোরেট করহার কমিয়ে বিনেয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরকারি প্রচেষ্টা বাস্তবায়ন করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে হবে। অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় না বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে না। এজন্য বেসরকারি বিনিয়োগের দিকে না তাকিয়ে কর্মসৃজনমূলক প্রকল্প সরকারকে নিতে হবে। সরকারি খাতে আরো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রত্যেক মন্ত্রণালয় কর্মসৃজনমূলক প্রকল্প প্রস্তাব রাখে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা দেশে চলমান ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে হবে। যেখানে আনুমানিক এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে। দ্রুত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালুর জন্য উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রশিক্ষণ ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করা প্রয়োজন।

কভিডের ধাক্কায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ব্যবসাগুলো শোচনীয় অবস্থায় পড়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ঘোষিত অর্থের মাত্র ২৬ শতাংশ ব্যাংকগুলো ঋণ হিসেবে প্রদান করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের বরাদ্দ অর্থের সিংহভাগ নিয়েছে বৃহত্ শিল্পের সাবসিডিয়ারিগুলো। তাছাড়া শর্তেও জটিলতায় ফেলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবসাগুলোকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ প্রদানে অনীহা দেখিয়ে যাচ্ছে। শিল্পে সুবিধা দেয়ায় বিভিন্ন খাতে কর ছাড় দেয়া হয়েছে। এটি খুব ভালো পদক্ষেপ। যদিও কর ছাড়ের মাধ্যমে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ কিছু বাড়ানো হয়েছে। বাজেট ই-কমার্সবান্ধব হয়নি। শিল্পে সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অতিমারী মোকাবেলার উপযোগী করতে হবে, যাতে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো প্রণোদনার অর্থ পায়,  রেয়াতি সুদে ঋণ নিতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মূলধনি যন্ত্রাংশের ওপর আরোপিত ১ শতাংশের অতিরিক্ত সব ধরনের শুল্ক-কর প্রত্যাহার করতে হবে। ই- কমার্স খাতের বিকাশের জন্য কর আরোপের পরিবর্তে প্রণোদনা, প্রযুক্তিগত সহায়তা, কর মওকুফ ও ইন্টারনেট খরচ কমানোর সুপারিশ করা হলো। স্টার্টআপদের জন্য ট্যাক্স হলিডে বাড়াতে হবে। শিল্পোন্নয়নের জন্য ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ব্যাংক ও সংস্থা ‘ইনোভেটিভ আইডিয়া’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচন করে তরুণ জনগোষ্ঠীকে উদ্যোক্তা হওয়ার উৎসাহ, আর্থিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পৃথক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম পথ হলো অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধিসহ ‘ব্যবসায় ব্যয় কমিয়ে আনা’ এবং ‘ব্যবসায় প্রক্রিয়া সহজীকরণ’ করা। এ বিষয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন কৌশলগুলো নির্দেশ করা প্রয়োজন। রফতানিমুখী উন্নয়ন কৌশলে রফতানি বাস্কেট বহুমুখীকরণ এবং সেই সঙ্গে যারা উচ্চমূল্যের রফতানি পণ্য উত্পাদন করবেন, তাদের যুক্তিসিদ্ধ প্রণোদনা প্রদানের বিষয় বাজেট বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন। রফতানির জন্য নতুন গন্তব্য দেশ অনুসন্ধান উৎসাহিত করতে হবে। গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে অধিকতর ও কার্যকর অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণে বৈদেশিক বিনিয়োগবান্ধব কর্মকৌশল নির্ধারণ ও তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বিবেচনায় রেখে শিল্পনীতি ঢেলে সাজিয়ে তা দেশজ বৈদেশিক বিনিয়োগবান্ধব ও টেকসই অর্থনীতি বিনির্মাণবান্ধব করতে হবে।

স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে এ অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিমাণ ২ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা, অর্থাত্ বাজেটে বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এর অনেক প্রকল্প গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক। করোনার অভিঘাতকালীন এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এ বরাদ্দের ফলে গ্রামীণ মানুষের জীবনে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। গ্রামীণ উন্নয়নে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আগামী অর্থবছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক প্রতিনিধিদের সম্মিলিত উদ্যোগে সব অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সঠিক তালিকা (ডাটাবেজ) তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। বিকেন্দ্রীকরণ নীতির আলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান কার্যক্রমের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য যেকোনো খাতে দুর্নীতি হলে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা।

দেশের শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে অ্যাডভান্স আইটিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে স্ব-কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এছাড়া দেশীয় সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশে দেশীয় সফটওয়্যার ক্রয়ে ছাড় নীতিমালা প্রণয়ন করা ও বিকাশমান স্টার্টআপগুলোয় সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে তথ্যপ্রযুক্তিতে উন্নয়ন অর্জন সম্ভব হবে। আইটি খাতে ১০ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে এবং ২০২১ সালে আরো ১০ লাখ কর্মসংস্থান হবে এ খাতে। বাজেটে আইসিটি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রয়োজন তরুণদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগুলোর ওপর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। দেশী সফটওয়্যার ও আইটিএস সেবা ক্রয়ে অগ্রাধিকার প্রদান করা এবং ট্যাক্স ছাড় নীতিমালা প্রণয়ন করা। একটি টেকসই স্টার্টআপ  ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডের মূলধন বৃদ্ধি করা ও সম্ভাবনাময় স্টার্টআপগুলোয় সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং রেজিস্টার্ড আউটসোর্সারদের জন্য ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করা। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আইটি ম্যানেজমেন্ট বেসিক ও অ্যাডভান্সড) প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা।

অন্যান্য বিষয় হিসেবে বলা যায়, বাজেটে আঞ্চলিক বৈষম্যের কথা আলোচনা করা হয়নি। সরকারি বরাদ্দ কম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, শিল্পায়ন, গ্যাস ও অন্যান্য সুবিধা না থাকায় রংপুর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার বেশি। উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর উন্নয়নের জন্য নিয়মিত এডিপির অতিরিক্ত একটি নির্দিষ্ট শতাংশিক হারে গ্রহণযোগ্য এডিপির বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। বিষয়টি অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় থাকলেও ২০২১-২২ বাজেটে তার উল্লেখ ও বরাদ্দ কোনোটিই নেই। এটি অন্তর্ভুক্ত করা ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন।

বাজেটে অন্যান্য দেশের মতো ইনোভেশন, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট খাত তৈরি করে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব দেয়া হলো। ইউনেস্কোর তথ্য অনুসারে, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে নেপাল বরাদ্দ দেয় তার জিডিপির শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ, পাকিস্তান দেয় তার জিডিপির শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ, ভারত দেয় তার জিডিপির শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ, চীন দেয় তার জিডিপির ২ দশমিক ১৯ শতাংশ, জাপান দেয় তার জিডিপির ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ, কোরিয়া দেয় তার জিডিপির ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ইউনেস্কোর এ তালিকায় বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের জায়গা খালি। কারণ এ দুই দেশে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নামে আলাদা কোনো খাত নেই। এটি অন্তর্ভুক্ত করা ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন।

বাজেটের প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর, ভ্যাট, শুল্ক

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট কর নন-লিস্টেড কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অনুরূপভাবে লিস্টেড কোম্পানির জন্য করহার ২৫ শতাংশ থেকে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। এক ব্যক্তি কোম্পানির জন্য নন-লিস্টেড কোম্পানির জন্য করহার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এটি ব্যবসাবান্ধব একটি পদক্ষেপ। তবে এ করপোরেট করহার এখনো এ অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশি। যেমন ভারতে করপোরেট করহার ১৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ২২ শতাংশ ও থাইল্যান্ডে ২০ শতাংশ। এছাড়া বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রফতানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামে এ হার ২০ শতাংশ। করপোরেট কর কমালে বাংলাদেশী কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে বেসরকারি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণেও তা সহায়তা করবে। কর ছাড়ের ফলে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। এ করহার পর্যায়ক্রমে আরো কমানো প্রয়োজন।

পাবলিক ট্রেডেড—ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান (৩৭.৫%), পাবলিক ট্রেডেড নয় এরূপ ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান (৪০%), মার্চেন্ট ব্যাংক (৩৭.৫%), সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সব প্রকার তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী (৪৫%+ ২.৫% সারচার্জ), পাবলিক ট্রেডেড মোবাইল ফোন কোম্পানি (৪০%), পাবলিক ট্রেডেড নয়, এমন মোবাইল ফোন কোম্পানির (৪৫%) করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রয়েছে। সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সব প্রকার তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারীর ওপর করপোরেট করহার ও সারচার্জ উভয়ই বাড়ানো যেতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এসব পণ্য উত্পাদনে নিয়োজিত ব্যক্তি ও ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি এবং এসব পণ্যের কারণে সংগঠিত অসুখের ব্যয় বেশি বিধায় এর ব্যবহার কমানোর জন্য উচ্চহারে কর বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

পাবলিকলি ট্রেডেড মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি, পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এমন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবার ওপর করপোরেট কর বাড়ানোর এ প্রস্তাব সময়োপযোগী নয়। কারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ই-কমার্স, এফ-কমার্স, অনলাইন পণ্য সরবরাহ, দরিদ্রদের অর্থ স্থানান্তর মূলত মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের ওপর নির্ভরশীল। ১৮টি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। এটি দরিদ্র লোকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে। দীর্ঘমেয়াদে এ খাতে বিনিয়োগ সংকুচিত হতে পারে। তাই এ খাতে বর্ধিত কর প্রত্যাহার করে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ করহার বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্ভূত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর বসালে তা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বে। এর ফলে অনেকের শিক্ষাজীবন হুমকির সম্মুখীন হবে। এতে শিক্ষা সংকোচন হবে এবং অনেক বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কর প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হলো।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতার জন্য বিদ্যমান করহার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের সামাজিক আত্মীকরণের লক্ষ্যে বিশেষ বিধান চালুর পাশাপাশি তাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে করোনাকালীন সময়ে ব্যবসায়, উত্পাদনে মন্দা, কর্মহীন হয়ে যাওয়া ও জনগণের আয় কমে যাওয়ায় এ আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হলো। এতে জনগণ অর্থব্যয় করলে অর্থনীতিতে চাহিদার সৃষ্টি হবে, অর্থনীতি এগিয়ে যাবে।

তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, ব্যক্তিশ্রেণীর ব্যবসায়িক টার্নওভার ট্যাক্স হ্রাস, বিত্তবানদের সম্পদের ওপর সারচার্জ বৃদ্ধি, করনেট সম্প্রসারণে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা, তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে আইটি খাতে ১০ বছরের কর অব্যাহতি। নারী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা টার্নওভার সুবিধা, দেশে মেগা শিল্পের বিকাশে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে ১০ বছরের করমুক্ত সুবিধা, স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ, বিদেশী পণ্যের নির্ভরশীলতা কমাতে দেশীয় শিল্পের ভ্যাট ও আগাম অব্যাহতি, কৃষি উপকরণে ও নারী স্বাস্থ্য সংরক্ষণে ভ্যাট অব্যাহতি ও দেশীয় চাষীদের প্রতিরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, যা প্রশংসার দাবিদার।

প্রতি বছর কৃষি খাতের জন্য যেসব প্রণোদনা দেয়া হয়, তা এবারো অব্যাহত আছে। যেমন কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি বহাল রয়েছে, যা কৃষির জন্য খুবই প্রয়োজন। পাশাপাশি আমদানিতে অগ্রিম কর ও উত্পাদনে ভ্যাট তুলে দেয়ার প্রস্তাব করেছে। এটা খুবই সময়োপযোগী প্রস্তাব। কৃষি যন্ত্রপাতির আমদানির ওপর বিদ্যমান অগ্রিম কর ফেরত পাওয়া কঠিন। কৃষিযন্ত্র আমদানি করলে ভ্যাট দিতে হয় না কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে উত্পাদন করলে ৪ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। ফলে স্থানীয় উত্পাদিত পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ৪ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার হওয়ায় স্থানীয়ভাবে অনেকেই কৃষিযন্ত্র উত্পাদনে নজর দেবে। বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে বিনিয়োগ করার চিন্তা করবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিরক্ষণে ওই শিল্প কর্তৃক তৈরীকৃত কয়েকটি পণ্য  আমদানিতে প্রযোজ্য শুল্কহার বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের যন্ত্রপাতি বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে ১ শতাংশ হারে আমদানির সুযোগ প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশীয় কম্পিউটার-ল্যাপটপ ও আইসিটি পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিরক্ষণে কম্পিউটারের আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও আইসিটি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে। মাইক্রোবাস আমদানি, পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড গাড়ি আমদানি উৎসাহিত করতে শুল্কহার পুনর্বিন্যাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ভালো পদক্ষেপ। কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ না দিয়ে হাইটেক পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ জরিমানা আদায় ও টাকার উৎস জানানো সাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বর্ধিত করা যেতে পারে। তবে তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরী না থাকাই ভালো। এতে সত্ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন।

বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর বাস্তবায়ন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সক্ষমতা তৈরি না করে বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করা, প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীতকরণ প্রয়োজন। সক্ষমতার অভাবে এডিপির বাস্তবায়ন পুরোপুরি না হওয়া, সরকারি বিনিয়োগের গুণগত মান কম হওয়া, অবকাঠামোগত ঘাটতি, ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা বাজেট বাস্তবায়নে বড় বাধা। বাজেট সঠিকভাবে বাস্তবায়নে সক্ষমতা অর্জন প্রয়োজন। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের স্বচ্ছ রোডম্যাপ তৈরি প্রয়োজন। রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত পরিবর্তন করতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। মাসিক ভিত্তিতে প্রকল্প রেজাল্ট ভিত্তিতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিন মাস পরপর বাজেটের অন্তর্বর্তী মূল্যায়ন দরকার। সঠিক সময়ে এবং সঠিক গুণে ও মানে প্রকল্প সমাপ্তকারীকে পুরস্কার এবং ব্যর্থ হলে শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

২০২১-২২ সালের বাজেট, করোনাযুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়ন পথচলার বাজেট। এ বাজেট বাস্তবায়ন মসৃণ করুক উন্নয়ন পথচলা, করোনা চলে যাক ইতিহাসের পাতায়, গড়ে উঠুক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা—এ প্রত্যাশা।