পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সার্বিক নির্দেশনা দেবেন, নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন আর ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা নীতিমালা বাস্তবায়ন করবেন, এটাই নিয়ম; কিন্তু বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। গতকাল বণিক বার্তায় এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে ব্যাংকাররা ব্যাংক পরিচালনা করছেন কিনা সে বিষয় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যাংকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নয়, ব্যাংক কর্মকর্তাদের চাকরি নির্ভর করে পরিচালনা পর্ষদের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির ওপর বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংক খাতের জন্য প্রণীত নীতিমালা ও আইনকানুন, কোম্পানি আইন, নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানের; কিন্তু এগুলো আন্তর্জাতিক মানে প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে পরিচালনা পর্ষদ হয়ে ওঠে স্বেচ্ছাচারী। সমস্যা যখন পরিচালনা পর্ষদ, তখন সুশাসন নিশ্চিত করে ব্যাংক খাতকে টিকিয়ে রাখার মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকেই। কেবল পরিচালকদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় কাউকে সরিয়ে দেয়া কিংবা কাউকে নিয়োগ দেয়া সুশাসনের পরিপন্থী। ব্যাংক খাত রক্ষায় এমন প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থাপকদের সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। এক্ষেত্রে পর্ষদের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ ও সঠিকভাবে ব্যাংক পরিচালনায় কর্মকর্তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

দুর্বল নীতির কারণে ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাবের সৃষ্টি। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং সময়ে সময়ে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনেক সময় ঋণখেলাপিদের সহায়ক হয়েছে। এ ধরনের এক বিধানে তিন বছর করে তিন মেয়াদে মোট নয় বছর একাধারে পরিচালক থাকতে পারার সুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোয় জনস্বার্থকে বিঘ্নিত করে পারিবারিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে। পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা স্তরের নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাসহ কেউ সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দেখাতে পারেননি। এসব অনিয়ম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কার্যপরিধি আইন দিয়ে নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদকে অনেক সময় ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কাজে হস্তক্ষেপ করতে দেখা যায়; নীতিগত সিদ্ধান্ত দেয়ার চেয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতেই অনেক সময় তাদের বেশি উৎসাহী দেখা যায়। ফলে ব্যবস্থাপকদের পক্ষে স্বাধীনভাবে সৃজনশীলতা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না; বরং পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে তারা বাধ্য হন। এটি কোনোভাবেই ব্যাংক খাতের সুশাসনের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারার কারণে ব্যাংক খাতে দুর্নীতির নানা ঘটনা ঘটছে, জবাবদিহির ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে পরস্পরকে দোষারোপ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে জবাবদিহির বিষয়টি একসময় গৌণ হয়ে পড়ছে। নজরদারি ও তদারকিও হয়ে পড়ছে দুর্বল। যারা পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান বা পরিচালক হয়ে আসেন, তাদের নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য থাকে। তারা আত্মীয়-স্বজনের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা দেয়ার এবং নিজের লোকদের ঋণ বা চাকরি দেয়ার জন্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে চাপ দেন; তাদের ওপর প্রভাব খাটান। এ অবস্থার বেশ অবনতি দেখা যাচ্ছে এখন। আগে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় এমন মাত্রায় ছিল না এটি।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিযুক্তি এমনকি তাদের চাকরি থাকা-না থাকা অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা পর্ষদের ওপর। কাজেই তারা ইচ্ছা করলেই পরিচালনা পর্ষদের সদস্য কিংবা চেয়ারম্যানের পরামর্শ বা নির্দেশনা উপেক্ষা করতে পারেন না। পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে এমনকি ব্যবস্থাপনার মধ্যেও অনেকেই সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, যা বহুলাংশে দক্ষ ও সততার সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতিতে অনেক সময় যুক্ত হয়ে পড়েন। ব্যবস্থাপনার শীর্ষ পর্যায়ে অদক্ষতা বা দুর্বলতা অনেক সময় প্রবল হয়ে ওঠে। এতে নিচের দিকের কর্মীরাও নানা ধরনের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। টপ ম্যানেজমেন্ট যদি কঠোরভাবে সুশাসন নিশ্চিত না করে, তাহলে তার প্রভাব নিচের দিকে পড়তে থাকে। 

দেশের চলমান সময়ের আর্থিক কেলেঙ্কারি ব্যাংক ব্যবস্থাপনা তথা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে বিপদগ্রস্ত করে ফেলেছে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। এরই মধ্যে ১০টি দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিতপূর্বক সেগুলোয় সংস্কারের ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা বলেছেন তিনি। অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত এ খাতে কোনো ধরনের ধসের সৃষ্টি হলে তা পুরো অর্থনীতিকে গ্রাস করে ফেলবে। সুতরাং বাংলাদেশ ব্যাংককে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যেসব উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছেন, তাতে সবাই আশ্বস্ত হবেন। এর আগেও সাবেক গভর্নর ও সাবেক অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নানা প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার কোনো কিছুই সেভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপে সংস্কার থেকে সরে এসে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যার ফলে এখন ব্যাংক খাত এক মারাত্মক আস্থা সংকটের মুখে পড়েছে। এখান থেকে অবশ্যই উত্তরণ প্রয়োজন। কারণ দেশের অর্থনীতি ব্যাংক খাতের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। এতে কোনো ধরনের বিপত্তির সৃষ্টি হলে তা পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। বাংলাদেশে আইন-কানুন-নিয়মের কোনো কমতি নেই। সংকট শুধু আইনের প্রয়োগ নিয়ে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। কোনো ব্যাংক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে যথাযথ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণে কার্পণ্য করা যাবে না। 

উন্নত দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায়ও আর্থিক কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়। তবে তা ধরা পড়ে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হয়। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোয় একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটন হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা সেভাবে নিতে দেখা যায় না। এর ফলে অনিয়ম বেড়ে উঠতে পারছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যে পর্যায়ে আছে, তা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কিছু পদক্ষেপ, যেমন সংজ্ঞা পরিবর্তন এবং ঋণের সুদহার কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু মূল সমস্যাগুলো দূর করার কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা ভালোভাবে ফেরানোর জন্য যে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে যে সক্রিয়তা প্রয়োজন, তার ঘাটতি রয়েছে এখনো। এ ঘাটতির কারণে ঋণের ওপর সুদের হার কমানোর যেসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তা কার্যকর হচ্ছে না।

ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার মধ্যে অবশ্যই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আমানতকারী, গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা; এর মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে অর্থায়ন ও বিনিয়োগের নানা সেবা দিয়ে সমৃদ্ধ করা। এর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতিগত ঝুঁকি কমানো, যাতে তা অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দিয়ে প্রকৃত উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং মানবকল্যাণের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি প্রতিরোধ করে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে টেকসই সুশাসন ও সার্বিক আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারি কার্য পরিচালনায় স্বচ্ছতা বিধানের বিকল্প নেই। অথচ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণে ব্যাংক খাতে একের পর এক বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটছে। ঋণগ্রহীতা ও কর্মকর্তারা সমঝোতার মাধ্যমে অস্বচ্ছ উপায়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে তারল্য সংকটে পড়েছে আলোচিত ব্যাংকগুলো।

ব্যাংক খাতে সুশাসন আনতে প্রয়োজন স্বচ্ছ ও বলিষ্ঠ ঋণ ব্যবস্থাপনা। ব্যাংকের অন্যতম কাজ হলো দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার চাকা সচল রাখতে ঋণ দেয়া এবং সময়মতো সে ঋণ আদায় করা। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিরাপদ, কল্যাণমুখী খাতে বিনিয়োগসহ শক্তিশালী ব্যাংক ব্যবস্থা অপরিহার্য। সুশাসনের অভাব, আর্থিক অপরাধ ও চুরি এবং নীতির ধারাবাহিকতা না থাকার কারণে ব্যবসার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর ব্যাংক খাতকে ইতিবাচক ধারায় রাখা প্রয়োজন। সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে সব ধরনের নীতি অনুসরণে ব্যাংকগুলোকে সব পর্যায়ে বাধ্য করতে হবে। আর পরিচালনা পর্ষদসংশ্লিষ্ট বিষয় মোকাবেলায় ব্যবস্থাপকদের চাপমুক্ত রাখতে হবে।