১৯০৫ সালের অক্টোবরে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে
নতুন প্রদেশ ঘোষিত হলে এ অঞ্চলের মুসলিম নেতারা স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। কিন্তু ১৯১১
সালের ডিসেম্বরে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ায় হতভম্ব ও বিক্ষুব্ধ হন। মুসলিমদের সান্ত্বনা দেয়ার
জন্য লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় এসে ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার
ঘোষণা দেন। ঘোষণার নয় বছরের অধিক সময় পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময়কালে
যেসব মুসলিম নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের
মধ্যে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর নাম সর্বাগ্রে। তিনি ১৮৬৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের
ধনবাড়ীর বিখ্যাত সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯০৬-১১ পূর্ববঙ্গ ও আসাম ব্যবস্থাপক
সভা, ১৯১২-১৬ বঙ্গ প্রেসিডেন্সি ব্যবস্থাপক সভা, ১৯১৬-২০ ভারতীয় আইনসভা এবং ১৯২১-২৩
বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য ও রিফমস কাউন্সিলে মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। নওয়াব আলী চৌধুরী
১৯২৫ সালে বেঙ্গল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হন এবং ১৯২৯ সালের ১৭ এপ্রিল মৃত্যু
পর্যন্ত সে পদে বহাল ছিলেন। তিনি ঢাকা, কলকাতা ও আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য
ছিলেন।
ঢাকায়
বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি ও বিরোধিতা: পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হওয়ার পর সরকার
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইকোর্ট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে
ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্সের অধিবেশনে পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয়
স্থাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন অবাঙালি মুসলিম নেতা সাহেবজাদা আফতাব আহমদ খাঁ। এরপর
১৯০৮ সালের এপ্রিলে ময়মনসিংহে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতির অধিবেশনে
মৌলভী আব্দুস সালাম, ১৯১০ সালের এপ্রিলে ঢাকা গভর্মেন্ট হাউজে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক
পরিষদের কাউন্সিল সভায় বাবু অনঙ্গ মোহন সাহা, ১৯১১ সালের আগস্টে ঢাকার কার্জন হলে গভর্নর
স্যার ল্যান্সলট হেয়ারের বিদায় ও স্যার চার্লস স্টুয়ার্ট বেইলির গমন উপলক্ষে আয়োজিত
সভায় মুসলিম নেতারা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি তোলেন। সর্বশেষ বঙ্গভঙ্গ রদের পর মুসলমানদের
সান্ত্বনা দেয়ার জন্য ঢাকায় এসে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এ সময় প্রধানত কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবর্গীয় হিন্দু সমাজ ঢাকায়
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে বিরোধিতা শুরু করে। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়
ঘোষিত হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন স্থানে ফেব্রুয়ারি ও মার্চজুড়ে প্রতিবাদ
সভা অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু এলিটরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে মোট ১৮ বার
স্মারকলিপি দিয়ে লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। লর্ড হার্ডিঞ্জ
তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।
নাথান
কমিটি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গঠন: ভারত সরকার ১৯১২ সালের ৪ এপ্রিল বাংলা সরকারকে
জানান যে গভর্নর জেনারেল ঢাকায় টিচিং ও রেসিডেনশিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত
নিয়েছেন। ১৯১২ সালের ২৭ মে বাংলা সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় এবং
রবার্ট নাথানকে প্রেসিডেন্ট করে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী
এই কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। কমিটি ১৯১২ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলা সরকারের
কাছে এবং বাংলা সরকার ১৯১৩ সালের ৬ জুন ভারত সরকারের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত
প্রতিবেদন জমা দেয়। নানা জটিলতায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রক্রিয়া স্থবির হওয়ার পর
১৯১৭ সালের ৬ জানুয়ারি লর্ড চেমসফোর্ড কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
কমিশন গঠনের কথা ঘোষণা করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির রিপোর্টটি বিবেচনার জন্য ওই
কমিশনের হাতে অর্পণ করা হয়। কমিশন নাথান কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা করে ঢাকায় একক,
টিচিং ও আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে একমত পোষণ করে।
সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর ভূমিকা: নওয়াব আলী চৌধুরীর অনেকটা একক প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আলোর মুখ দেখে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নিয়ে বিরোধিতা শুরু হলে মিশন নিয়ে তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে কলকাতায় যান। সেখান থেকে ১৯১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি স্যার সলিমুল্লাহকে একপত্রে ভারতের সব মুসলিম আঞ্জুমানকে তারবার্তা পাঠানোর অনুরোধ রেখে জানাতে বলেন যে হিন্দু সংবাদপত্রগুলো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকে অকার্যকর করতে চরম আন্দোলন করছে। কাজেই সমিতিগুলোকে সভা ডেকে লর্ড হার্ডিঞ্জকে ধন্যবাদ প্রদান ও বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষাদায়ক ও আবাসিক করার প্রস্তাবনা রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। স্যার সলিমুল্লাহর কাছে প্রেরিত আরেক চিঠিতে তিনি বলেন পূর্ববঙ্গের আমরা যদি দ্রুত সভা না ডাকি এবং স্কিম সমর্থন না করি তাহলে নিঃসন্দেহে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে। তিনি জানান, বেঙ্গল প্রভিনশিয়াল লীগ কমিটির সভায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রশ্নে প্রতিকূল সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছিল কিন্তু তিনি ও সৈয়দ শামসুল হুদা দৃঢভাবে তা প্রতিহত করেন।
সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী
১৯১২ সালের মার্চে কলকাতায় মুসলিম লীগের অধিবেশনে
সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন যে ‘বঙ্গভঙ্গের
মাধ্যমে মনে হয়েছিল যেন মুসলিম শিক্ষার অগ্রগতি আকস্মিকভাবে থেমে যাবে। কিন্তু ঢাকায়
একটি শিক্ষাদায়ক এবং আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সময়োপযোগী ও বিবেচনাপ্রসূত প্রস্তাবনার
জন্য ভাইসরয়কে ধন্যবাদ— এ বিপর্যয় এড়ানো গেছে।’ ১৯১৩ সালের এপ্রিলে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির
ব্যবস্থাপক সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অর্থ বরাদ্দ রাখায় সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী
খুশি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ঢাকা শহরের মধ্যে সীমিত থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ
করেন। তিনি জানান লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণার সময়
এ ধরনের কোনো শর্তারোপ ছিল না। তিনি বলেন, মুসলমানরা কখনো সাম্প্রদায়িক মনোভাব পোষণ
করে না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কলকাতার সংস্কৃত কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসা, হিন্দু স্কুল, মেট্রোপলিটন
ইনস্টিটিউশন যদি হিন্দু-মুসলিম সৌহার্দে ক্ষতিকর না হয় তবে ঢাকায় মোহামেডান কলেজ স্থাপনে
ক্ষতির কি আশঙ্কা রয়েছে? ইসলামিক স্টাডিজ খোলার বিষয়ে তিনি বলেন, মুসলিম মনীষীদের চিন্তাধারা
ও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সম্পর্কে মুসলমানদের জানতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের আধুনিক
ভাবধারার সঙ্গেও পরিচিত হতে হবে।
১৯১৪ সালের এপ্রিলে মুসলিম শিক্ষা সমিতির
যৌথ সম্মেলনে নওয়াব আলী বলেন, ‘যখন একটি শিক্ষাদায়ক ও আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা
আসে তখন ভেবেছিলাম দুঃখ-কষ্ট শেষের দিকে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্যাপ্ত সুবিধা
পাচ্ছি না অনুভব করে সরকার মুসলিম অধ্যুষিত জনগণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বরাদ্দ করেছে।
আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম, কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাবনায় বিক্ষোভ হলো তখন অবহিত
হলাম যে বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকা শহরের মিউনিসিপ্যালিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এটি আমাদের
উচ্চাশা ও আকাঙ্ক্ষায়ও প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছে। কমিটির সদস্য হিসেবে এটি শুনে সত্যি
হতবাক করার বিষয় যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা নেয়ার ক্ষমতা নেই। একমাত্র
তাদের ভর্তি করবে যারা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করেছে। এমনকি ঢাকার
ল’ কলেজ কলকাতার হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
যদি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জট না দূর হয় তাহলে কেন আবার একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর
জন্য প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে?’ তিনি সভায় প্রস্তাব রাখেন যে ঢাকা শহরের কলেজগুলোকে
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিকল্পনাভুক্ত এবং পূর্ববঙ্গ ও আসামের কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের
ফেডারেল পদ্ধতির আওতাভুক্ত করা গেলে তা হবে সুন্দর পরিকল্পনা এবং তা ঢাকা থেকে তত্ত্বাবধান
করা সুবিধাজনক হবে। ১৯১৫ সালের এপ্রিলে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশনে নওয়াব আলী
চৌধুরী আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘যুদ্ধকালীন সংকট থাকা সত্ত্বেও সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে
জন্য বাজেটে কিছুটা অর্থের ব্যবস্থা রেখেছে, সুতরাং পূর্ণাঙ্গ স্কিমের জন্য শিগগিরই
অর্থ পাওয়া যাবে এবং নির্মাণকাজ শুরু হবে।’
১৯১৬ সালের এপ্রিলে কলকাতায় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির
ব্যবস্থাপক সভায় নওয়াব আলী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি সুপারিশ করেছিল ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং
স্কুলটি কলেজে পরিণত হবে ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনস্টিটিউট স্থাপিত হবে। পরে একটি কমিটি
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটি ঢাকায় স্থানান্তর করা হবে। বাস্তবে
কিছুই হয়নি। উল্টো ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে সার্ভে ক্লাস, ইলেকট্রিক ও মেকানিক্যাল
সেকশন সরিয়ে নেয়া হয়েছে।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘যুদ্ধকালীন সংকটের দরুন বিশ্ববিদ্যালয়ের
কাজ শিকায় তুলে রাখা হয়েছে।’ ভারতের লক্ষ্নৌতে ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে বার্ষিক অধিবেশনে
মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণের
দাবি জানানোর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। অধিবেশনে নওয়াব আলী চৌধুরী এ প্রস্তাব উত্থাপন
করলে তা গৃহীত হয়। অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নটি আমার নিকট
এক বিশেষ আকর্ষণীয় বিষয়। গত কয়েক বছরে পূর্ববাংলাসংশ্লিষ্ট অন্য বিষয়ে আমি এতটা মনোযোগ
দিইনি। এ বিষয়টির ত্বরিত ও সঠিক সমাধানের ওপরই নির্ভর করছে পূর্ববাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের
ভবিষ্যত্। মুসলমানদের উত্তেজনাকে প্রশমিত করার জন্য লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় আসেন। তিনি
আমার নেতৃত্বে এক মুসলিম প্রতিনিধি দলকে পূর্ববাংলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ প্রতিশ্রুতি
দেন।’ নওয়াব আলী চৌধুরী অধিবেশনে জানান, ‘পাটনায় উচ্চ আদালত ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
করার মতো যথেষ্ট অর্থ সরকারের আছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন উঠলেই সেই পুরনো
গল্পের পুনরাবৃত্তি হয়। হয়তো কারো উপলব্ধিতেই আসে না যে পূর্ববাংলার হিন্দু কী মুসলিম
মানুষের জন্য এটা কতটা অন্যায়। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে এটা শুধু পূর্ববাংলার
মানুষেরই মূল্যবান সম্পদ হবে না, ভারতেরও হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয় হিন্দু-মুসলিম ছাত্রদের
কাছে তাদের গৌরবময় অতীত ও ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাসের মূল্যবান
সম্পদও তুলে ধরবে। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জন্য এটা আলিগড় বা বেনারসে প্রস্তাবিত
বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অনেক ভালো হবে।’
নওয়াব আলী ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে
১৯১৭ সালের ৭ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয় পুনরায় উপস্থাপন ও ২০ মার্চ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় বিল উত্থাপন করেন। এ সময় শিক্ষা সচিব স্যার শংকরণ নায়ার বলেন, ‘সরকার
নিশ্চিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, বিলের খসড়া এরই মধ্যে
প্রস্তুত হয়েছে। তবে তা চূড়ান্তকরণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের প্রতিবেদনের জন্য
অপেক্ষা করতে হবে।’ শংকরণ নায়ারের বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে নওয়াব আলী চৌধুরী তার প্রস্তাব
প্রত্যাহার করেন। ১৯১৭ সালের ২৩ মার্চ ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে লর্ড চেমসফোর্ড
জানান যে লর্ড হার্ডিঞ্জ প্রতিশ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৯১৯ সালের
১১ সেপ্টেম্বর ভারতীয় আইনসভায় শিক্ষার ভারপ্রাপ্ত সদস্য মি. শফি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিল উত্থাপন করেন। নওয়াব আলী চৌধুরী বিলটিকে স্বাগত জানিয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে আবেগপ্রবণ
হয়ে পড়েন। তিনি সভায় উল্লসিত হয়ে বলেন, ‘আজ এ আইনসভায় আমার চেয়ে বেশি সুখী দ্বিতীয়
আর কোনো ব্যক্তি নেই।’ ১৯২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারির অধিবেশনে তিনি পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের
নিয়ন্ত্রণ পৌরসভার মধ্যে নির্দিষ্ট না রেখে পূর্ববঙ্গের স্কুল-কলেজকে তার সঙ্গে অধিভুক্ত
করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘কলকাতা ও পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় যদি সপরীক্ষা পরিষদ হওয়া
বাঞ্ছনীয় হয়, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তা সমীচীন হবে না কেন?’ ১৯২০ সালের ১৮
মার্চে ভারতীয় আইনসভায় ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ বিলে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ
প্রকাশ করলে তা গৃহীত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল এ অধিবেশনে অ্যাক্টে পরিণত হয়। ১৯২০
সালের ২৩ মার্চ বিল গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে। ১৯২১ সালের ১ জুলাই থেকে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।
উপসংহার: নবাব স্যার সলিমুল্লাহর
মৃত্যুর পর নওয়াব আলী চৌধুরীর একক প্রচেষ্টা ও অব্যাহত আন্দোলনের ফলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অব্যাহতভাবে তিনি আন্দোলন না চালালে লর্ড হার্ডিঞ্জের প্রতিশ্রুতি
বাস্তবায়ন হতো কিনা সন্দেহ। তিনি ১৯২৩ সালের জুলাইয়ে ‘মাই আপিল টু মাই কনস্টিটিউয়েন্সিস’
শিরোনামে নির্বাচনী প্রচারপত্রে লিখেছেন, ‘পুনরায় আমিই একটি ডেপুটেশন গঠন করিয়া লর্ড
হার্ডিঞ্জের নিকট লইয়া যাই, তাহাতে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা
ও মুসলমানদের শিক্ষার অন্য নানাবিধ সুবিধা করিয়া দিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন।
আমি যখন ইম্পিরিয়াল কাউন্সিলের সদস্য ছিলাম, তখন লর্ড হার্ডিঞ্জের সেই প্রতিশ্রুতি
কার্যে পরিণত হইয়াছিল। কিন্তু তথাপি নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিবার সময় ছিল না, কারণ কলিকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন যে সকল অভিমত প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাহার বিরুদ্ধে আমাকেই দাঁড়াইতে
হইয়াছিল। তত্পরে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহক কমিটিতে ও কোর্টে হিন্দুদের
সহিত মুসলমানদের সমভাবে প্রতিনিধি প্রেরণ করিবার অধিকার লাভে সমর্থ হই।’ তিনি প্রচারপত্রে
আরো বলেন, ‘আপনাদের ও আমার সেই চিরপোষিত স্বপ্ন সফল হইয়াছে— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত
হইয়াছে, তাহার আইন প্রস্তুত হইয়াছে, এ কথা মনে করিয়াও আমি আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেছি’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের নাম সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর নামে রাখা হয়েছে। এটি
একটি বড় স্বীকৃতি। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ
বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই তাহলে তিনজনের নাম বিশেষভাবে
উল্লেখ করতে হয়। তারা হলেন— নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ও শেরেবাংলা
একে ফজলুল হক। কারো কারো মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রেখেছিলেন নওয়াব আলী চৌধুরী।’
এরই মধ্যে শতবর্ষ উদযাপন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন স্মারকগ্রন্থ প্রকাশসহ
নানা কর্মসূচি পালন করেছে। শতলেখকের লেখা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের
উদ্যোগে ‘শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১-২০২১’ শীর্ষক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে।
এর আগে এই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তাদের নিয়মিত প্রকাশনী ‘যাত্রিক’-এর
শতবর্ষ সংখ্যা ‘শতবর্ষের শতজনের নিবেদন’ নামে প্রকাশ হয়। এসব প্রকাশনা বিজ্ঞজনের লেখায়
সমৃদ্ধ হলেও সেসব লেখায় সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা
নিদারুণভাবে অবহেলিত। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা
গ্রহণ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। শিক্ষক সংখ্যাও নেহাত কম নয়। এ অসংখ্য নতুন-পুরনো
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তার কতজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জানেন
বা জানার চেষ্টা করেন? পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের কল্যাণে শতবছর
আগে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীসহ যে মানুষগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেন, সংগ্রাম করলেন, অনেকটা বিনা পয়সায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের
সুযোগ তৈরি করে দিলেন এবং বাঙালি মুসলমান তথা পূর্ববঙ্গের পশ্চাত্পদ মানুষের মুক্তাচিন্তা
শানিত করার বীজ বুনে দিলেন তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি হলো না কেন? এর দায়
কার?
আবু
মুহাম্মাদ মুকাম্মেল: জ্যেষ্ঠ সহকারী রেজিস্ট্রার, গণ বিশ্ববিদ্যালয়










