প্রাথমিক শিক্ষা, বাংলাদেশ পুলিশ, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও রেলওয়ে—সরকারের পাঁচটি বড় বিভাগ। সরকারি সব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মোট ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অর্ধেকেরও বেশি এ পাঁচ বিভাগে নিয়োজিত। এদিকে বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, অদক্ষতায় পরিপূর্ণ হওয়ায় এ পাঁচ বড় বিভাগই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। বিপুল জনবল থাকার পরও এসব জনগুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কাঠামোগত দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও সেবা নিশ্চিতে ঘাটতি উদ্বেগের। এ সংকট অবশ্য একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকরণ ও প্রশাসনিক দুর্নীতি-অনিয়ম, প্রকল্পনির্ভর সম্প্রসারণ এবং দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণের মতো অদূরদর্শী নীতিমালা বর্তমান ভঙ্গুর পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। চ্যালেঞ্জটি নতুন সরকার তৈরি না করলেও এমন ভঙ্গুর অবস্থায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সম্ভব নয়। সম্প্রতি সরকার প্রশাসনিক কর্মীদের উৎসাহ বাড়াতে বেতন-ভাতা বাড়িয়েছে। এভাবে অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। বরং সুচিন্তিত সংস্কার, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিতের মাধ্যমে এসব বিভাগের গুণগত মানোন্নয়নকে দ্রুত অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রাথমিক স্তরে শিখন পদ্ধতির গুণগত মানের ঘাটতি ও দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতিকেই প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা গেছে। তাই এ খাতের মূল সমস্যা দৃশ্যমান অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত শিখনপদ্ধতি নয়। এ বিভাগে চার লাখেরও বেশি শিক্ষক নিয়োজিত থাকলেও বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো বিশেষ বিষয় শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠযোগ্য করার মতো দক্ষ শিক্ষকের সংখ্যা কম। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির গবেষণা দেখায়, প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষক নিজেদের ডিজিটাল দক্ষতায় পারদর্শী দাবি করেন, কিন্তু বাস্তবে শুধু ২৫ শতাংশ শ্রেণীকক্ষে সেই দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারেন। এক লাখেরও বেশি শিক্ষক এখনো প্রশিক্ষণবিহীন রয়েছেন, যা মোট শিক্ষকের ২৫ শতাংশ। প্রশিক্ষণ অনেকটা পদায়ন-পদোন্নতির আনুষ্ঠানিকতা হয়ে পড়েছে। শিক্ষকদের বেতন দ্বিগুণ করার পরও প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানমুখী হওয়ার ভিত গড়া যাচ্ছে না। সরকারকে শিখনমানের উন্নয়নের বিষয়টি নিয়ে তাই ভাবতে হবে।

এদিকে জননিরাপত্তা নিশ্চিতে বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে ২ লাখ ২০ হাজার ৫০০ সদস্য রয়েছেন। সরকার এরই মধ্যে আরো ১৪ হাজার সদস্য নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এই জনবল সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত নয়। কারণ পতিত সরকারের আমল থেকেই পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়ে আছে। তাছাড়া অব্যবস্থাপনা, টহলদারির জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন, প্রযুক্তিগত সুবিধা এমনকি আবাসনসংক্রান্ত জটিলতাও রয়েছে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় কর্মপরিবেশ সংকটপূর্ণ করছে। এর প্রমাণ বৈশ্বিক পুলিশিং কার্যকারিতার তালিকা। তালিকায় দেশের অবস্থান ১২৫ দেশের মধ্যে ১০০তম। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ১৬৩টি দেশের মধ্যে ১১৭তম। তাই নতুন সদস্য নিয়োগের আগে বর্তমান অবকাঠামোগত ঘাটতি চিহ্নিত করে সেগুলো পূরণ করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতের সংকট সম্ভবত সবচেয়ে জটিল। ২০২৫ সালে দেশের প্রায় সাত কোটি মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছে। সার্বক্ষণিক জরুরি পরিস্থিতিতেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট। বর্তমানে হাম ও ডেঙ্গু এ খাতের পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে অবকাঠামো হয়েছে। জনবলও আছে তবে তাদের সঠিক স্থানে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে প্রকল্পভিত্তিক পরিকল্পনার কারণে। নিজস্ব চিকিৎসা ও সেবাসামগ্রী অনেক স্থানে অব্যবহৃত পড়ে আছে। জনবল নেই অজুহাত দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ উপযুক্ত জায়গায় জনবল নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা করা যায়নি। এ খাতের জন্য তাই সঠিক কৌশলপত্র এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার পরিকল্পনা খাতে দীর্ঘদিনের সরবরাহ সংকট অব্যাহত রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত জনবল থাকা সত্ত্বেও সামগ্রী সংকট দূর না হওয়া সুস্পষ্টভাবে ব্যবস্থাপনায় অক্ষমতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যর্থতা নির্দেশ করে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সম্ভবত সবচেয়ে হতাশাজনক বিভাগ। রেলের উন্নয়নে বিগত সময়ে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে নতুন রেলপথ নির্মাণ, ইঞ্জিন-কোচ সংগ্রহ এবং সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নে। এর পরও হচ্ছে লোকসান। নীতিনির্ধারকরা জবাবদিহির আকারে এ বিভাগকে শুধু সেবাদানকারী বলে ভর্তুকি নেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। কিন্তু বণিক বার্তারই পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত পণ্যবাহী রেলের আয়ের মাধ্যমে যাত্রীবাহী আয়ের ঘাটতি মেটাতে পেরেছে এবং লাভজনক রয়েছে। রেলের সেবার মান অত্যন্ত নিম্ন এবং যাত্রীদের নিয়মিত অভিযোগের বিষয়। ট্রেন ও স্টেশনের নোংরা পরিবেশ, টিকিটের কালোবাজারি, অতিরিক্ত দামে খাবার বিক্রি, নিয়মিত ইঞ্জিন বিকল, লাইনচ্যুতি এবং অনিয়মিত সময়সূচি সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এজন্য কর্মীদের অদক্ষতা, অপেশাদারত্ব এবং কার্যকর জবাবদিহির অভাবই প্রধান কারণ। রেলের পদগুলো এখনো ব্রিটিশ আমলের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে রয়েছে। তবে ২০২১ সালে নতুন জনবল কাঠামোতে অনুমোদিত পদ কমিয়ে ৪৭ হাজার ৬৩৭টি করলেও কর্মীদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়েনি।

এ পাঁচ বিভাগের সমস্যা আলাদা হলেও তাদের দুর্বলতার মধ্যে কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই সরকারকে খাতভিত্তিক বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে একটি অভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কাঠামো তৈরি করতে হবে। নতুন নিয়োগ বা নতুন প্রকল্পের আগে প্রতিটি বিভাগের পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। কর্মী মূল্যায়নে দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে নির্বাচনী বা রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।