দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস আর অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের কারণে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর আড়াই লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে বলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে বাড়ছে না সংশ্লিষ্ট চিকিৎসার সুবিধা। যেটুকু সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা তার মানও ভালো নয়। সোমবার বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালের ক্যান্সার চিকিৎসার রোডিওথেরাপি যন্ত্রের অর্ধেকই নষ্ট। ক্যান্সারে আক্রান্তদের ৮০ শতাংশের রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। রোগীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ৩০০টি রেডিওথেরাপি মেশিন দরকার। তবে সরকারিভাবে নয়টি কেন্দ্রে ১৭টি রেডিওথেরাপি মেশিন আছে। তার ১১টিই নষ্ট। এতে ক্যান্সার রোগীদের রোডিওথেরাপির জন্য কয়েক সপ্তাহ এমনকি কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা রোগের প্রকোপ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে রোগীরা ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের শরণাপন্ন হচ্ছে অথবা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হচ্ছে। অনেকে অর্থের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরের হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্ত রেডিওথেরাপি যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং সেগুলো যেন কার্যকর থাকে তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল। এছাড়া ক্যান্সারে আক্রান্তের কথা শুনলেই দ্রুত চিকিৎসার জন্য মানুষ বিদেশে ছোটে। প্রতিবেশী দেশগুলো ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এখানে আমাদের ঘাটতি রয়েছে। দেশে বর্তমানে ১৫-১৬ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত। বিশ্ব সংস্থা সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে একটি ক্যান্সার কেন্দ্র দরকার। সেই হিসাবে দেশে ক্যান্সার কেন্দ্রের প্রয়োজন ১৬০টি। তবে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে আছে ৩০টিরও কম। এসব ক্যান্সার হাসপাতালও আবার রাজধানীকেন্দ্রিক। হাসপাতালের পাশাপাশি রয়েছে যন্ত্রপাতি সংকটও। কেমোথেরাপি কেন্দ্রও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এছাড়া এ বিপুলসংখ্যক রোগীর সেবায় মাত্র ৩০০ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। নেই ক্যান্সার শনাক্তকরণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৩০০-৩৫০ রোগীকে কেমোথেরাপি ও ৪০০ রোগীকে রেডিওথেরাপি দেয়া হয়। হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে সব রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় না। এ কারণে স্থিতিশীল রোগীকে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেয়ার পর ছেড়ে দেয়া হয়। রোগীরা তারপর নিজ দায়িত্বে যেকোনো জায়গায় থেকে চিকিৎসা চালিয়ে যায়। ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়ালের জন্য তিন-চার মাস অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ করেছে রোগীরা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য করছে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেট। অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা না থাকায় দেশের সব জেলার রোগী এ হাসপাতালেই ভিড় করে। ফলে রোগী বাগিয়ে নিতে হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসকই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে ক্লিনিক খুলেছেন। এসব ক্লিনিকে রোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়েরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ১৫ লাখ, যা ২০৩৫ সাল নাগাদ দাঁড়াবে ৩২ লাখ ৫০ হাজার ৭২৬ জনে। বাংলাদেশে বর্তমানে ক্যান্সারজনিত মৃত্যু প্রতি বছর দেড় লাখ। প্রতি বছর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে দুই লাখ মানুষ, যা সামনের দিনগুলোয় আরো বৃদ্ধির সম্ভাবনা। বাংলাদেশে ১৯টি হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ বলতে যা বোঝায় তা নেই। নেই প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। ওষুধপত্র বলতে গেলে পুরোটাই কিনতে হয়। এসব ওষুধের জন্য রোগীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন কারসাজিতে ওষুধ উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। প্রয়োজনীয় পুষ্টিবিদ, মনোশ্চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সুযোগ থাকলেও রোগের প্রথম দিকের চিকিৎসার ব্যবস্থা শূন্যের কোঠায়। ক্যান্সার চিকিৎসার সুবিধা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে। রোগীদের জন্য আধুনিক স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন ক্যান্সার রোগীদের জাতীয় নিবন্ধনের নিয়ম, যেন এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের তথ্য-উপাত্ত তৈরি করা যেতে পারে, যার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে জাতীয় ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসানীতি প্রণয়ন করা সহজ এবং বাস্তবমুখী হয়। স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মৌলিক প্রতিরোধী কার্যক্রমের অভাব রোগের ব্যাপ্তিকে আরো বিস্তৃত করেছে। রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যয়বহুল হওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধের দুষ্প্রাপ্যতা, চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়া, চিকিৎসকের স্বল্পতা সব মিলিয়ে ক্যান্সার চিকিৎসা আমাদের দেশে এখনো সাধারণের নাগালের বাইরে। অন্যদিকে এ ব্যাপারে জনসচেতনতার অভাব এ চিত্রকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। ফলে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসার জন্য বহির্মুখী। এটিকে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? ব্লাড ক্যান্সারের ব্যাপ্তি ও চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত।
কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন করে মেশিন কেনার প্রক্রিয়া চলছে। কয়েক মাস আগে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এ প্রক্রিয়া পরবর্তী সময়ে বাতিল করা হয়। একেকটি মেশিনের দাম ন্যূনতম ২০ কোটি টাকা। তাই কিছুটা সময় এতে লেগে যাবে। সারা দেশের যেসব সরকারি হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রগুলো নষ্ট হওয়ায় তারা রোগীদের এ হাসপাতালে (এনআইসিআরএইচ) পাঠান। এতে রোগীর চাপ সবসময়ই বেশি থাকে। তবে প্রায় দুই বছর ধরে মেশিনগুলো বেশির ভাগ সময়ই অকার্যকর ছিল। গত বছরের শেষে চারটি মেশিনকে অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে। দুটির মধ্যে যেটি নষ্ট, তা মেরামত করা হবে। সাধারণত এসব মেশিন ১০ বছরের বেশি চালানো যায় না।
ক্রমবর্ধমান ক্যান্সার রোগীর পটভূমিতে এখন প্রয়োজন ক্যান্সার চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির দ্রুত বাস্তবায়ন। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, রোগী, সমাজকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, ধর্মীয় নেতা, প্রচারণা শিল্পে জড়িত সবাইকে নিয়ে সমন্বিত কার্যক্রম এখন সময়ের দাবি। সচেতনতা সৃষ্টি, রোগ নিরূপণ, চিকিৎসা এবং পরবর্তী সময়ের জন্য পরামর্শক, মনোবিজ্ঞানী, পুষ্টিবিদ ও সরকারের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টাই কেবল পারে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সফলতা আনতে। সঙ্গে সঙ্গে বিনামূল্যে অথবা কম মূল্যে ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঢাল ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যাপ্তি রোধ করতে। জনসচেতনতার দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারেও জোরালো কার্যক্রম প্রয়োজন। ক্যান্সার চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার ক্ষেত্রে একে অন্যের প্রতি দোষের সংস্কৃতি পরিহার করে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে বর্তমানে বন্ধ যন্ত্রগুলোকে সচল করে অনতিবিলম্বে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
বিশ্বের সব দেশে এসব পরীক্ষা করার পরই ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু করা হয়। কাজেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পেতে হলে অবশ্যই একটি প্রসেসের মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং এতেই যথার্থ চিকিৎসা ও ফলাফল পাওয়া যাবে। এখন কথা হচ্ছে এ ধাপগুলো আমাদের দেশের দরিদ্র-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য কতটা সহজলভ্য ও সহজভাবে বোধগম্য করার ব্যবস্থা করা হয়েছে? এসব জটিল হিসাব সাধারণ মানুষ করতে না পেরে চিকিৎসায় অবহেলা করে এবং দিন দিন পরিস্থিতি যে খারাপের দিকে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল থাকে না। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কী কী ব্যবস্থা নেয়া যায় দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের জন্য সেসব নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখনই ভাবতে হবে এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব। আর ক্যান্সারের মতো আতঙ্কজনক রোগের পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুনিশ্চিত করা আরো বড় দায়িত্ব। আমরা মনে করি, সরকার অচিরেই চিকিৎসা বিভাগের এ খাতে জরুরি সেবাগুলো নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।










