ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস, ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। জানুয়ারি মাস ব্যাংকারদের মাস, এ মাসে সব ব্যাংকের আর্থিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, ব্যাংকাররা ব্যবসায়িক নববর্ষ পালন করেন। ফেব্রুয়ারি মাস ভাষার মাস, শোক ও সংগ্রামের মাস। মার্চ মাস স্বাধীনতার মাস, আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেমন থাকে একদিকে, আরেকদিকে থাকে বেদনার ইতিহাস। এপ্রিলে বাঙালির নববর্ষ। বলতে গেলে এই সময়টা আনন্দ-বেদনার, অনুষ্ঠানের ও উদযাপনের। এবার যোগ হয়েছে আরো দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন এবং আরেকটি হচ্ছে বাংলাদেশের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন। ২০২০-এর ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত স্বাভাবিক অবস্থা থাকলে শুধু অনুষ্ঠান আর অনুষ্ঠান থাকত আমাদের জীবনে। স্মরণে, বরণে আমরা থাকতাম সদা ব্যস্ত। এর মধ্যে আবার পড়ত আমন ফসল তোলা, যা ‘অগ্রহায়ণী’ বলেও পরিচিত। আমন ধানের আগমনে আমরা করতাম পৌষসংক্রান্তি, পৌষ মেলা এবং নবান্ন। ভাগ্যের কী খেলা, এবার সবকিছুতেই ছেদ পড়েছে। কারণ চীন থেকে আসা মহামারী/অতিমারী কভিড-১৯ ভাইরাস, যা সারা বিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছে। ভাবা গিয়েছিল এই ভয়ংকর অদৃশ্য শত্রুর হাত থেকে বছরের শেষ দিকে কিছুটা রেহাই পাওয়া যাবে, তাও হলো না। সারা পৃথিবীতে এই মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বন্ধ। জনজীবন এখনো স্বাভাবিক হয়নি। মাস্ক পরতে হচ্ছে, দূরত্ব রক্ষা করতে হচ্ছে, হাত ধুতে হচ্ছে সাবান দিয়ে দিনে কয়েকবার। মানুষ ভারি আতঙ্কে। শীতকাল, সূর্য আমাদের পৃথিবী থেকে কিছুটা দূরে চলে যায়।

এটা সূর্যের দক্ষিণায়ন। এখন দিন ছোট, রাত বড়। ঠাণ্ডা, সর্দি, কাশি, জ্বর প্রতি বছরের ঘটনা এই সময়ে। কিন্তু এবার তা মহা আতঙ্কের। এটা করোনা-১৯, না সাধারণ জ্বর বোঝার উপায় নেই। অতএব, জনজীবনে নেমে আসে স্থিরতা, শ্লথতা। গতিময়তাহীন জীবন। যেখানে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসার কথা ছিল, তাতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আবার ছেদ পড়েছে। ভালোর মধ্যে একটি, আর সেটা হচ্ছে রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্সে কোনো ঘাটতি নেই। একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে। দারুণ ঘটনা। আমাদের আশঙ্কা ছিল রেমিট্যান্সে ধস নামবে। না, তা হয়নি; বরং উল্টো হচ্ছে। গত নভেম্বরেই এসেছে ২০৭ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স। এতে গ্রামাঞ্চলের রেমিট্যান্সের সুবিধাভোগীদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি হয়েছে। কিন্তু আমদানি ও রফতানি ব্যবসায় আবার মন্দা নেমে এসেছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগে রফতানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রফতানি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কারণ ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে ডিসেম্বর আনন্দের মাস। নববর্ষ সামনে। ডিসেম্বরে বড়দিন—খ্রিস্টমাস। এ সময়ে তারা দুই হাতে খরচ করে। কিন্তু বিধি বাম। এবার তা হলো না। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় ওইসব দেশের নাগরিকরা আবার বিপর্যস্ত। তাদের অর্থনীতি আবার গাড্ডায়। নাগরিকদের হাতে ‘ক্যাশ নেই’। যুক্তরাষ্ট্রের তাবৎ অর্থনীতিবিদ সরকারের কাছে আবেদন করেছেন নাগরিকদের আবার ক্যাশ জোগান দিতে। যাতে বাজার আবার চাঙ্গা হয়, লোকে বড়দিন পালন করতে পারে, নববর্ষ উদযাপন করতে পারে। বলা বাহুল্য, তাদের এই সংকটের বোঝা এখন আমাদের ঘাড়ে। আমাদের পোশাক রফতানিতে ছেদ বাড়ছে। রফতানি আদেশ এরই মধ্যে ৩০ শতাংশ কমেছে। নভেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে পোশাক রফতানি কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। রফতানি কমেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমদানিও কমেছে। আমদানি ব্যয় (ঋণপত্র সেটেলমেন্ট) ২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে বেশ কিছুটা কমেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। সবচেয়ে খারাপ খবর হচ্ছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাস পেয়েছে অনেক। প্রায় ১৫ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমার অর্থ হলো শিল্পায়নে শ্লথগতি দেখা দিয়েছে। এখানেই কথা, রেমিট্যান্সের টাকা দিয়ে যদি আমদানি বাড়িয়ে রফতানিতে জোয়ার আনতে না পারি তাহলে অর্থনীতি উজ্জীবিত হবে কীভাবে? এদিকে চালের বাজার, বিশেষ করে চিকন চালের বাজার গরম। মানুষ এখন চিকন চালই বেশি খায়। ভরা আমনের মৌসুম এখন। কৃষকরা নতুন ধান ঘরে তোলা শুরু করেছেন। এ সময়ে চালের দাম বাড়বে কেন? এই প্রশ্ন দেখলাম শুধু আমাদের নয়, সরকারেরও। দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে মিল মালিকদের, যারা ধান-চাল স্টক করে। এদিকে সরকারের চার লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করার কথা। এর মধ্যে চালের দামে ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ নতুন ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে। শীতকাল শুরু হয়েছে। বাজারে দোকানভর্তি শাকসবজি, মাছের বাজার মাছভর্তি। কিন্তু দাম কমে না। দাম উঁচু স্তরের স্থিতিশীল। ভোগ্যপণ্যের দামেও একই অবস্থা। কাগজে দেখলাম সয়াবিনের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী। বলা বাহুল্য, প্রত্যেকটি সাধারণ মানুষ, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য খারাপ খবর। তাদের জীবনে স্বস্তি নেই। গত ২ তারিখের একটি কাগজে দেখলাম শহুরে নিম্ন আয়ের লোকদের বাজেটের সার্বিক যাচ্ছে খাবার কিনতে। এটা আমাদের বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের জরিপের ফল। তারা বলছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে বাদ পড়েছে শহুরে নিম্ন আয়ের মানুষ। একই জরিপে বলা হচ্ছে, ২১ শতাংশ পরিবার (বাসা) গত মাসে তাদের পর্যাপ্ত খাবার না থাকার বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। তাহলে কী দাঁড়াল? মানুষ এখন শুধু ভাতেরই কাঙাল। সাধারণ মানুষ, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত নয়, মধ্যবিত্তরাও খরচ কমাতে কমাতে এখন শুধু দুবেলা ভাতের খরচের জন্য চিন্তিত। আর এই হলে সরকারের ‘সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি’ কোনো কাজে আসছে না। তারা বিরাট সংখ্যায় এই কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে থাকছে। এটা গ্রামের বেলায়ও সত্য। তাহলে দেখা যাচ্ছে, মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা কাটছে না। করোনার উত্পত্তি গত ফেব্রুয়ারির দিকে। এখন ডিসেম্বর। এক বছর যায় যায়। মানুষের আয় নেই, রোজগার নেই। অনেকে চাকরিচ্যুত, অনেকে ব্যবসাচ্যুত। ছোট ছোট শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরকারের স্টিমুলাস প্রোগ্রামের টাকা এখনো পাচ্ছে না। কৃষি খাত তার বরাদ্দের ৫০ শতাংশও এখন পর্যন্ত পায়নি বলে খবর। মানুষের সঞ্চয় ভাঙতে ভাঙতে এখন দেয়ালে তার মাথা ঠেকেছে। মানুষ বাড়িঘর, জমি বিক্রি, বন্ধক দিচ্ছে। গ্রামীণ মুদি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনেকেই ঋণ নিচ্ছে আগের মতোই উচ্চহারে। গ্রামাঞ্চলে একমাত্র কিছুটা স্বস্তিতে আছেন রেমিট্যান্স প্রাপকরা। স্বস্তিতে আছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আর যাই হোক, তাদের মাসিক বেতনের টাকা আছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে যারা আছেন, তারা মাসে মাসে কিছু ভাতা হয়তো পান। ধনীদের কোনো সমস্যা নেই। ব্যবসায় মন্দা থাকলেও বিদেশে তাদের টাকা জমা আছে। টাকা আসবে, খাবে তারা। কিছু দোকানদার, ব্যবসায়ী, যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসা করে, তাদেরও হাতে কিছু আয় আছে। পেশাজীবীদের অবস্থা খারাপ। রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি ইত্যাদি শ্রেণীর লোকদের অবস্থা খারাপ। অর্থনীতি-ব্যবসা-বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখিয়ে আবার মন্দাক্রান্ত। এ অবস্থায় মানুষকে বাঁচানোর পথ কী? যাদের দরকার তারা ক্যাশ কোথায় পাবে? যারা সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে, তারা ক্যাশ কোথায় পাবে? ক্যাশ না পেলে বাজার খরচ বন্ধ। বাড়িভাড়া, ওষুধপত্রের খরচ সব বন্ধ। সবকিছু বন্ধ হতে পারে। কিন্তু ডাল-ভাতের খরচ ছাড়া তো চলবে না। তাহলে?

এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের ঘটনার কথা। সেটা ১৯৭২ সালের কথা। মুক্তিযুদ্ধের পর বাড়ি যায়, দেশের বাড়ি। নয় মাসের যুদ্ধে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। কারো বাড়িঘর গেছে, কারো ঘরবাড়ি পুড়েছে। কৃষকরা নয় মাস কৃষিকাজ নিয়মিত ও ঠিকভাবে করতে পারেননি। খাবারের অভাব আছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব আছে। যাদের অভাব ছিল না, তাদের অর্ধেকেই অভাবে পড়েছে। সরকারের ওই সময়ের কাজ ছিল পুনর্বাসন-পুনর্গঠনের। আমি তখন সরকারি জগন্নাথ কলেজের শিক্ষক, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই নয় মাসের বকেয়া বেতন পাই। কিন্তু যতটুকু মনে পড়ে, তার অর্ধেক ছিল সঞ্চয়পত্রে, বাকিটা ক্যাশে। আমারও ক্যাশ দরকার, আবার অভাবী আত্মীয়স্বজনেরও দরকার। তখন বঙ্গবন্ধু সরকারের ব্যাংকগুলো এগিয়ে আসে। দরখাস্তের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়। আমি অগ্রণী ব্যাংক, সদরঘাট শাখা থেকে ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করি কিস্তিতে। ৫ হাজার টাকার তখন অনেক দাম। দেশের বাড়িতে দশ বিঘা ধানী জমি কেনা যায় ওই টাকায়। ওই টাকায় নিজের খরচ চালাই, আত্মীয়স্বজনদের কিছু ক্যাশ দিই। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের সঙ্গে এখনকার সময়ের বেশকিছু মিল আছে। মুক্তিযুদ্ধে শত্রু ছিল চিহ্নিত, পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী। তারা সারা বাংলাদেশে অত্যাচার-নির্যাতন করে। লাখ লাখ বাঙালি শহীদ হলো। মানুষ যারা নয় মাস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায় শ্রম বাঁচানোর জন্য। কলকারখানা চলেনি, কৃষিকাজ চলেনি। রীতিমতো অফিস করা যায়নি। আর এখন অতিমারীর কারণে কারখানা চলে না। এখন শত্রু অদৃশ্য, কিন্তু শক্তিশালী শত্রু। মানুষ মানুষের কাছে যেতে পারে না করোনা হলে। কারো সাহায্য পাওয়া যায় না। বন্ধুর মৃত্যুতেও বন্ধুদের পাওয়া যায় না। সরকার এসব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যাতে কিছু লাভ  হবে। কিন্তু লোকের হাতে ‘ক্যাশ’ না থাকলে বাজারে যাবে কে? বাজারে না যেতে পারলে ব্যবসা-শিল্পের পণ্য কিনবে কে? এ অবস্থায় আমি মনে করি, দরখাস্তের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অভাবী মানুষ, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে প্রয়োজন অনুসারে ঋণ দিতে পারে। অবশ্যই তা হতে হবে জামানতবিহীন। সুদ হতে হবে খুবই কম। ভর্তুকিতে তো অবশ্যই। পরিশোধের সময়সীমা হবে পর্যাপ্ত, যাতে তারা সহজে ওইসব ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারে। আমেরিকার অর্থনীতিবিদরা এ ধরনের দাবিই তুলেছেন। আমি মনে করি, এ ধরনের পদক্ষেপ আমাদেরও দরকার। মানুষ বাঁচানোর ব্যবস্থা আর নেই। সরকার কি এই প্রস্তাব বিবেচনা করবে? নাকি শুধু ব্যবসায়ীদের দাবির দিকেই নজর দেবে?

 

ড. আর এম দেবনাথ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক

অর্থনীতি বিশ্লেষক