দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে পিছিয়ে পড়ছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে। ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল সরকার। অর্জন করা গেছে তার এক-তৃতীয়াংশ। গত এক যুগে দেশের বিদ্যুৎ খাতে অভাবনীয় সাফল্যের দাবি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তবে এ সফলতা এসেছে মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি প্রযুক্তির ওপর ভর করে। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে অন্য সব জ্বালানির মতোই সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সন্তোষজনক অবস্থান তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সৌর, বায়ু ও পানির মতো উৎসকে কাজে লাগিয়ে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যদিও বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়েই জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। 

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ হিসেবে সৌরবিদ্যুতের পরিচিতিই বেশি। এ সৌরবিদ্যুৎ ছড়িয়েছে প্রধানত গ্রাম, মফস্বল ও চরাঞ্চলে। সোলার সিস্টেমের ওয়াটপ্রতি দাম যখন ৪৫০ কিংবা ৫০০ টাকা ছিল, তখন থেকেই এটি ব্যবহারে সাধারণ মানুষের আগ্রহ সামাজিক গ্রহণযোগ্যতারই সাক্ষ্য দেয়। এর ফলে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গেই বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের ব্যবহার শুরু হয়েছে। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের দাম বিশ্বব্যাপী ৭২ শতাংশ কমে গেলেও বাংলাদেশে এ বিদ্যুৎ নীতিনির্ধারণী মহলে মূল ধারার ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনমাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। আর ঠিক এ কারণেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূর্বঘোষিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক করের আওতামুক্ত। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য এ সুযোগ মাত্র পাঁচ বছরের জন্য। সরকার জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ না নিলে উৎপাদনক্ষমতার কমপক্ষে ৪০ শতাংশ মূল্য ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে দিয়ে থাকে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ না নিলে কোনো ভর্তুকি দেয়া হয় না। এ বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর ও অন্যান্য করও বাতিল করা দরকার। একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ ৪০টি দপ্তর থেকে অনুমোদন গ্রহণ করতে হয়, যা শুধু সময়ক্ষেপণই করে না; বরং প্রকল্পের খরচ বাড়ায় এবং বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহী করে তোলে। রফতানিমূলক শিল্পের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনেও ‘এক কার্যালয়ে সব সেবা’ বা ওয়ান–স্টপ সেন্টার তৈরি করা জরুরি। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্রেডা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে স্রেডা সর্বোচ্চ ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন দিতে পারে। স্রেডার দায়িত্ব ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা একান্ত আবশ্যক।

আলবেনিয়া, কঙ্গো, আইসল্যান্ড, প্যারাগুয়েতে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া নামিবিয়া, কোস্টারিকা, নরওয়ে, তাজিকিস্তান, উরুগুয়ে ও জাম্বিয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের হার ৯৫ শতাংশের বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের হার এখনো ৪ শতাংশের কম। কিন্তু বাংলাদেশ কেন পারবে না শতভাগের লক্ষ্য অর্জন করতে? এরই মধ্যে আমরা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছি যে ছোট্ট একটা উন্নয়নশীল দেশ হয়েও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর চ্যাম্পিয়ন হতে পারি। আমরা ইলিশ উৎপাদনে প্রথম, তৈরি পোশাক ও পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, সবজি ও স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয়, ধান উৎপাদনে চতুর্থ এবং আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ হতে পারি। তাহলে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনেও আমরা প্রথম হতে পারব। প্রতিবেশী দেশ ভারতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, এক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যও পেয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মাত্র তিন বছরে ভারতে ১ লাখ ১০ হাজার সৌরবিদ্যুচ্চালিত পানির পাম্প চালু হয়েছে। জার্মানিতে একক উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শীর্ষে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ নির্ভরশীলতা দিয়েই ওই বছর জার্মানি ইউরোপে শীর্ষ বিদ্যুৎ রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়। অন্যদিকে ভারতের চতুর্থ ব্যস্ততম কোচিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুরোটাই চলছে সৌরবিদ্যুতে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুবিধা মূলধারার অর্থনীতিতে আত্তীকরণ করতে দেশে দেশে ঘোষিত হচ্ছে নিত্যনতুন লক্ষ্যমাত্রা। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যেই ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ অজীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। আর জার্মানির ক্ষেত্রে এ লক্ষ্যমাত্রা ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। বিপরীতে ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও ভারত থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রধানত পর্যাপ্ত জমির সংকুলান করতে না পারা এবং প্রযুক্তির উচ্চমূল্য। এ কারণে এ খাতে পর্যাপ্ত প্রকল্প গ্রহণ করা যায়নি। তাই বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়নি, একই সঙ্গে বিনিয়োগও আসেনি। তবে এখন এসব প্রতিবন্ধকতা অনেকটাই কেটে গেছে। এখন জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি লাভজনক। নেট মিটারিং গাইডলাইনের কারণে কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হয়ে উঠেছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নও সম্ভব। তাছাড়া সঠিকভাবে ভূমি জরিপ করা হলে কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য পর্যাপ্ত জায়গার সংকুলান করা যেতে পারে। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানা যাচ্ছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকেই মেটানো সম্ভব আর তাতে প্রতি বছর মাথাপিছু সাশ্রয় হবে ২ হাজার টাকা। কিন্তু এ সুলভ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সর্বব্যাপী উদ্যোগ আর রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। প্রচলিত কোম্পানিভিত্তিক মডেলে অধিক ব্যবসায়িক মুনাফার নিশ্চয়তা আসতে পারে, কিন্তু তাতে কখনই সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবে না। আর ঠিক এ কারণেই ব্যয় কমতে থাকা সৌরবিদ্যুতের সময়ে এসেও বাংলাদেশের কোথাও কোথাও গ্রাহককে ইউনিটপ্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। আর বর্তমানে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ১২ টাকা ইউনিটে বিদ্যুৎ কিনতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হচ্ছে, যার কারণে সুলভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধা সাধারণ মানুষ পাবে না। 

এক দশকের বেশি সময় ধরে আমাদের দেশে বিবিধ উদ্যোগ নেয়া হলেও অংশীজনদের মতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়ন সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করা যায়নি। ঋণের সুদহার এখনো বেশি। আবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের বিনিয়োগ উঠে আসার সময়কাল অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে বেশি বলে শোনা যায়। কিন্তু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদি ঋণ দিতে উৎসাহী নয়। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার বাংলাদেশে খুব ধীর। এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ প্রকল্পে সুবিধা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে সুবজ প্রকল্পে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করে। এর আওতায় প্রথম দিকে সুদের হার বেশি ছিল, কিন্তু ধাপে ধাপে তা কমানো হয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময় সবুজ বিনিয়োগে প্রণোদনার অংশ হিসেবে সুদের হার ৯ শতাংশের পরিবর্তে ৭-৮ শতাংশ এবং ঋণের মেয়াদ আট বছরের বেশি করার সুযোগ দেয়া হয়। জুলাই ২০২২-এ সুদের হার আরো একবার কমিয়ে ৫-৬ শতাংশ করা হয়। কাজেই বহুদিন যে সমস্যাগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের বিনিয়োগে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তা বহুলাংশে দূর হয়েছে বলা যায়। হয়তোবা সব অংশীজনের কাছে এ তথ্যগুলো এখনো পৌঁছেনি। এক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ নিতে পারে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন ছাড়াও দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইডকল নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। উদ্যোক্তারা এ সুযোগ গ্রহণে যেন উৎসাহিত হয়, তার পদক্ষেপ নিতে হবে। 

বিশ্বের অধিকাংশ দেশই নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে আগ্রহী হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য শক্তিকে সমালোচনা সহ্য করতে হয়। যেমন নবায়নযোগ্য শক্তির খরচ অনেক বেশি এবং এটি অনেক বেশি প্রকৃতিনির্ভর তথা পরিবর্তনশীল। এছাড়া কিছু নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন সৌরশক্তি, বায়োগ্যাসের জন্য তুলনামূলক বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় বলে মনে করেন অনেকে। যদিও বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, ক্রমাগত গবেষণা ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার ফলে নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুতের দাম কমে এসেছে। নবায়নযোগ্য শক্তির পরিবর্তনশীলতার জন্য মানানসই ব্যাটারি ব্যবস্থা দ্রুত উন্নতি হচ্ছে এবং অনেক দেশই স্মার্ট-গ্রিড পদ্ধতি স্থাপন করছে। তাছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি যেহেতু সীমিত তাই ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থা নির্ভর করবে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর। এছাড়া জলবাযু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না এবং ক্রমে নবায়নযোগ্য শক্তি জনপ্রিয়তা লাভ করছে। এ প্রবণতা ধরে রাখতে ব্যয় সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের প্রযুক্তি সহজলভ্য এবং প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।