আমাদের রান্নার অন্যতম অনুষঙ্গ পেঁয়াজ। কিন্তু সরবরাহ সংকটের দোহাই দিয়ে কয়েক বছর আগে রাতারাতি যখন পণ্যটির দাম ৪২৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল, তখন সাধারণ মানুষের দুর্দশার মাত্রা বেড়েছিল কয়েক গুণ। হঠাৎ দাম বৃদ্ধির এ ঘটনা সর্বত্র আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ না হওয়াতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে পণ্যটি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে ভারত থেকে। অতিবন্যা বা খরার কারণে দেশটিতে সরবরাহ সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে আমাদের এখানেও। অস্থিরতা সৃষ্টি হয় আমাদের বাজারে। বেশ কয়েক বছর ধরে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তিই ঘটে চলেছে। বিদ্যমান অবস্থায় পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের বিকল্প নেই। ইতিবাচক দিকটি হচ্ছে, পেঁয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চার বছরব্যাপী রোডম্যাপ তৈরি করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। উদ্যোগটি সময়োপযোগীও বটে।

রোডম্যাপ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পেঁয়াজের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, বীজ সংকট দূর, চাষাবাদের পরিমাণ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়নের বিষয়গুলোতে গুরুত্বারোপের কথা বলা হয়েছে। তবে এ পদক্ষেপগুলোই যথেষ্ট নয়। বিশেষ ঋণ সুবিধা, বীজ সরবরাহ ও চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে কৃষককে যদি উৎসাহিত করা যায়, তাহলে তারা এটি চাষে উদ্বুদ্ধ হবে। অতীতে যেমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহায়তার নজির রয়েছে। কৃষককে ধান আবাদের জন্য বিনা মূল্যে রাসায়নিক সার ও বীজ প্রদান করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে ভালো সাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু এতে ধান উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে। এক্ষেত্রে পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, কৃষকের যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ভর্তুকি প্রদানের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক দিকনির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক যাতে পণ্যটি বিক্রয়ের নিশ্চয়তা পান তা নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা দেখেছি ভারতে যখন পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পায়, তখন দেশটির সরকার পেঁয়াজ রফতানির ওপর থেকে ১০ শতাংশ প্রণোদনা প্রত্যাহার করে নেয়, যাতে তাদের দেশের ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত লাভের আশায় পেঁয়াজ রফতানি করতে না পারে। এরপর ন্যূনতম রফতানি মূল্য নির্ধারণ ও পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য স্থিরতা বজায় রাখতে পেঁয়াজের রফতানি নিষিদ্ধ করা হয়।

প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায় অসৎ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মজুদ করে কৃত্রিম সরবরাহ সংকট তৈরি করে পেঁয়াজের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। সারা দেশে সঠিকভাবে বণ্টিত হলে পেঁয়াজের সরবরাহ কম হলেও মূল্য খুব বেশি বাড়ার কথা নয়। এ অবস্থায় সরকারের বাজার মনিটরিং কার্যক্রম বাড়াতে হবে। কেউ অতিমুনাফার জন্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কিনা, সেটি অবশ্যই তদারকি জরুরি। এটি দরকার খুচরা ও আড়ত পর্যায়ে। পেঁয়াজের মূল্য এমন হওয়া উচিত, যাতে কৃষকের লোকসান গুনতে না হয়। ক্রেতা বেশি দামে পেঁয়াজ ক্রয় করলেও দেখা যায় কৃষক উৎপাদিত পেঁয়াজের মণপ্রতি বাজারমূল্য অনেক কম পান। উৎপাদন খরচ না ওঠায় বা লাভ না হওয়ায় এভাবে অনেক কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পরিণামে পেঁয়াজ চাষে তাদের অনীহা তৈরি হয়। তাই অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্র ভাঙা জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশন (টিসিবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা যদি একটি নির্দিষ্ট মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্যটি ক্রয়ের নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীদের রাহুগ্রাস থেকে কৃষক মুক্ত হতে পারবেন।

দেশে শুধু শীতকালেই পেঁয়াজ উৎপাদন করা হয়। মাত্র একটি ঋতুর ওপর নির্ভর করে পেঁয়াজ চাষ করলে তা ফলপ্রসূ হবে না। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি যেসব এলাকায় বন্যার পানি ওঠার সম্ভাবনা নেই, সেখানে চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে। দেখা যায় কৃষক নিজে যে বীজ উৎপাদন করেন, সেসব বীজের গুণগত মান তেমন ভালো না হওয়ায় ফলনও কম হয়। ক্রেতারাও দেশী পেঁয়াজ কিনতে অনাগ্রহ দেখান। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে গুণগত মানের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া পেঁয়াজ সংরক্ষণের তেমন ব্যবস্থা না থাকায় ঘরোয়া পদ্ধতিতেই এটি সংরক্ষণ করা হয়। ফলে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটা বিরাট অংশ যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। এ অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সঠিকভাবে পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা চাই। পণ্যটির বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে পাইকারি বাজার সৃষ্টি, কুল চেম্বার স্থাপন, রিফার ভ্যান পণ্য বিপণন, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়গুলোতেও নজর দেয়া চাই।

আমরা দেখছি, প্রায় প্রতি বছরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা তৈরির প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ২০১৩ সালে যেমন পেঁয়াজ সংকটের কারণে দ্রুত দাম বেড়েছিল, পরবর্তী সময়ে ২০১৮ ও ২০১৯ সালেও আমরা সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই। কারণ ছিল একটি মাত্র দেশের ওপর আমদানিনির্ভরতা। তাই যতদিন পর্যন্ত না আমরা পণ্যটি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারছি, ততদিন শুধু একটি দেশের ওপর থেকে আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে হবে। ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি অনুমানপূর্বক মিয়ানমার, তুরস্ক, মিসর, চীন, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস থেকে আমদানি পরিকল্পনা রাখতে হবে। এ কাজে সরকারি পর্যায়ে সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃষির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলে তার সুফল পাওয়া সম্ভব। কৃষককে পণ্যের মূল্য নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে পেঁয়াজের সংরক্ষণ ও বাজারজাত নিশ্চিত করতে হবে।