আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। বৈষম্য ও পরাধীনতার শিকল ভেঙে মর্যাদাপূর্ণ জীবনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আহ্বানে সাড়া দেয় কোটি বাঙালি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের পটভূমিতে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয়। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগের মুহূর্তে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর তার অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। আজ আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী ৩০ লাখ শহীদকে, স্মরণ করি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও চার জাতীয় নেতাকে।
বাংলাদেশ এ বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে। উৎসব চলছে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকীর। উন্নয়ন পরিক্রমায় নতুন অর্জনের পথে রয়েছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টি পাকাপোক্ত হয়েছে। এটি অর্জিত হতে যাচ্ছে মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে উন্নতির ফলে। অর্থনীতির সমৃদ্ধ বিকাশ ঘটছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ একসঙ্গে চলছে অনেক মেগা প্রকল্পের কাজ। তাই বলা যায়, স্বাধীনতার পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্জন অনেক।
তবে বিশ্বব্যাপী করোনার আঘাতে যে দুর্যোগ নেমে এসেছে, তার প্রভাব পড়ছে আমাদের ওপরও। নতুন করে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি চিন্তায় ফেলেছে। কভিড পরিস্থিতি বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতির ওপর। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। যদিও দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিভিন্ন ঘটনা সামলাতে হয়েছে আমাদের। বাংলাদেশ সবসময় অমিত সম্ভাবনা ধারণ করে টিকিয়ে রেখেছে তার স্বকীয়তা। তাই বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো দুর্বল—এটা নতুন বিষয় নয়। করোনার মতো মহামারী মোকাবেলায় চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা জরুরি। নজর দিতে হবে স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো উন্নয়নের দিকেও। আমরা জানি, স্বাধীনতার অঙ্গীকার একটি ভূখণ্ড প্রাপ্তিতেই শেষ হয়ে যায় না। সেখানে বসবাসরত জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের মাধ্যমে স্বাধীনতার সার্বিক উদ্দেশ্য পূরণ হয়। চিকিৎসা মানুষের তেমন একটি মৌলিক অধিকার।
স্বাধীনতার প্রথম লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলমুক্তি। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সেটি অর্জিত হয়েছে। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন; যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে। সম্পদের সুষম বণ্টন, জাতীয় আয়ের ওপর সব শ্রেণীর নাগরিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য হ্রাস, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগে অবস্থান নির্বিশেষে সবার সমান সুযোগপ্রাপ্তির মধ্যে নিহিত থাকে স্বাধীনতা। স্বাধীনতার ৫০ বছরে নতুন করে নিজেদের অর্জন ও ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করে দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।
২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজির শর্ত পূরণে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের কর্মসূচি রয়েছে আমাদের। এক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ না হওয়া, কর্মসংস্থানহীনতা নতুন প্রতিবন্ধক হয়ে দেখা দিয়েছে। কাজ আছে, তবে আমাদের তরুণরা বাজারে চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা দৃশ্যমান। করোনা পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরো ভঙ্গুর করে তুলেছে। এ অবস্থায় দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার পর পোশাক শিল্পের অন্যতম গন্তব্য ইউরোপের বাজারে আমরা বর্তমানের অনেক সুযোগ ও সুবিধা পাব না। তাছাড়া বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুনভাবে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের যে বাঁকবদল ঘটবে, তার সঙ্গে সক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে আমাদের দূরদৃষ্টি ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চিত্র অনুমানপূর্বক প্রস্তুতি গ্রহণ করা চাই। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা জরুরি।
সামাজিক ঐক্য স্বাধীন বাংলাদেশের আবির্ভাবের কালে শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল, তা আজও টিকে আছে। যদিও নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলগুলোর মধ্যকার বিরোধপূর্ণ রাজনীতি, সংঘাত ও সংঘর্ষ, রূঢ় মতদ্বৈধতা এ সামাজিক সম্মিলনের সুখকর পরিবেশ বারবার নষ্ট করে আসছে। এরই প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন রকম প্রতিষ্ঠানে। সরাসরি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন পেশাদার হয়ে উঠতে পারছে না, তেমনি বিভিন্ন আর্থিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানও প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগতভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়ে গেছে। মুষ্টিমেয় ব্যক্তির লাভালাভের হিসাব বেশির ভাগ মানুষের জীবনযাপনে জোর প্রভাব রাখছে কখনো কখনো। জবাবদিহিতার পরিবেশও সবসময় কার্যকর নেই বলা চলে। এ জায়গাগুলোয় দৃষ্টি দেয়া জরুরি। মনোযোগ দিতে হবে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও বাক্-স্বাধীনতার সংকুচিত পরিসরের দিকে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। আয় ও সম্পদের বৈষম্য আগের চেয়ে বেড়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো দুর্যোগ সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতিগুলো নিয়েও ভাবতে হবে। আমরা যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো সংকট মোকাবেলার আগাম প্রস্তুতি ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারি, তার লক্ষ্যে এখন থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের স্বাধীনতার শতভাগ অর্জিত হবে এ চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণের মাধ্যমে।










