একটি তত্ত্ব তা সে দর্শন, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান বা অন্য কিছু হোক না কেন, তার উৎপত্তির সমকালে কিংবা পরবর্তী কোনোকালে তার প্রাসঙ্গিকতা নিরূপণের কিছু মাপকাঠি রয়েছে। এ লেখায় আমরা মার্ক্সবাদকে সেই ব্যবহারিক মাপকাঠি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করব এবং বর্তমানকালে তার প্রাসঙ্গিকতা নিরূপণে সেই একই মাপকাঠি আমরা ব্যবহার করতে প্রবৃত্ত হব। এখানে শুরুতেই আরেকটা কথাও বলে রাখা ভালো। কোনো তত্ত্বের টিকে থাকা মানুষের মনোজগতের ওপরও নির্ভরশীল। আর সেটি তখনই মানব মনকে প্রভাবিত করতে পারে যখন তা মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারে অর্থাৎ তার সঞ্জীবনী শক্তি মানুষের ওপর কাজ করে। সে জায়গায় মার্ক্সবাদের অবস্থান কোথায়, তাও আমাদের পর্যালোচনার বিষয়। 

মার্ক্স ও এঙ্গেলস তাদের জীবদ্দশায় দাবি করেছেন যে তাদের ধারণায়িত সমাজবীক্ষণ একটি বিজ্ঞান। এ বিজ্ঞান গড়ে উঠেছে ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে। সেই কাজে তারা সেকালে লব্ধ ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত সব গুরুত্বপূর্ণ দর্শন, অর্থনৈতিক তত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানকে ব্যবহার করেছেন এবং প্রয়োজনমাফিক প্রাপ্ত তথ্যাদি থেকে গ্রহণ-বর্জন করেছেন এবং গৃহীত তথ্যাদির মধ্যে সুসমন্বয় করেছেন। এ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশকে উৎপাদন উপায় এবং উৎপাদন সম্পর্কের নিরিখে বিশ্লেষণ করা, যেটির সমালোচনা ইতিহাসে বহুবার হলেও এ দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি অপনোদন বা খারিজ করার সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত সৃষ্ট হয়নি। হেগেলের দ্বান্দ্বিক ভাববাদকে মার্ক্স ও এঙ্গেলস দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে পর্যবসিত করেছেন, যদিও এ শব্দমালা তারা কখনই ব্যবহার করেননি। পরে এমিল ডুর্কহাইম থেকে মাক্স ভেবার, দেরিদা থেকে ফ্যুকো এবং অর্থশাস্ত্রের আলোচনায় জন মাইনার্ড কেইনস, জন রবিনসন থেকে হালের অমর্ত্য সেন পর্যন্ত সবাই মার্ক্স-এঙ্গেলসের চিন্তার ক্রমরেখা দ্বারা প্রভাবিত ও পরিপুষ্ট হয়েছেন। অমর্ত্য সেনের ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচের ‘‌ডুইংস অ্যান্ড বিংস’-এর ধারণা যে মানুষের অধিকারবিষয়ক চিন্তাপ্রসূত এবং তাতে ভূমিকা রেখেছেন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো, আমেরিকান দার্শনিক জন রলস এবং জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্ক্স—এ কথা সেন নিজেই তার বই ও গবেষণা সন্দর্ভগুলোতে বহুবার উল্লেখ করেছেন। এখন দেখা যাক কী আছে মার্ক্স ও এঙ্গেলসের বয়ানে, যে কারণে একদা সারা পৃথিবীর এক বড় অংশ তাদের চিন্তাকে অনুসরণ করে বিশ্ব ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে বদ্ধপরিকর হয়েছিল। মনে রাখতে হবে আজও কিন্তু সারা দুনিয়া থেকে কমিউনিস্ট শাসন পুরোপুরি নির্বাসিত হয়নি। তার মানে মার্ক্সীয় বীক্ষণের একটি ব্যাপক ব্যবহারিক উপযোগিতা আছে। যা বর্তমানকালেও তার প্রাসঙ্গিকতার রেশ ধরে রেখেছে। আমরা এ জায়গা থেকেই আমাদের আলোচনা শুরু করব। এখানে আরেকটি কথা স্মর্তব্য, একটি দার্শনিক তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা মানব মনে আবেদন সৃষ্টি করতে পারে কিনা, বিষয়টির যেমন মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগসঞ্জাত দিক আছে, সেই সঙ্গে তারও অনেকগুলো ব্যবহারিক দিক আছে। মার্ক্সীয় চিন্তার ব্যাকরণ এক্ষেত্রে কতটা সফল হয়েছে, সেটিরও কিছুটা পর্যালোচনা আমরা করব।

২০১৮ সালে মার্ক্সের ২০০তম জন্মদিনে স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে মার্ক্স এ কালে কতটা প্রাসঙ্গিক, কতটা সঞ্জীবনী শক্তি এখনো আছে তার তত্ত্বে বিশেষত মানুষকে জাগিয়ে তুলতে। সারা পৃথিবীর বোদ্ধারা সে বছর এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন। জার্মান দেশের খ্যাতনামা দার্শনিক আন্দ্রিয়াস আর্ন্ট মনে করেন, আধুনিককালে মার্ক্সই প্রথম সার্থকভাবে বিশ্বায়নের কথা ভেবেছেন এবং তাকে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করেছেন। তবে তার সূচনা পৃথিবীর জন্য ইতিবাচক হয়নি। ঔপনিবেশিক দুনিয়ায় অগ্রসর ইউরোপীয় জাতিগুলো সস্তায় কাঁচামাল পাওয়ার এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার খোঁজার জন্যই বিশ্বায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা সূচনা করেছে। আর এ বিষয়কে পদ্ধতিগত আলোচনা করেছেন প্রথম মার্ক্স ও এঙ্গেলস। ধর্মের ও শিববোলেথের মোহাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় মানুষ যে পণ্যনির্ভরশীলতার আতিশয্যে পণ্যমানব হয়ে উঠবে, এর ক্রমিক পরিণতি জন্ম দেবে পণ্যমোহাবদ্ধতার—মার্ক্সের এ বয়ান কিন্তু আজকের দিনের মানুষের জন্যও প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে প্রথিতযশা জার্মান মার্ক্সবাদী মিকায়েল নিয়ার এবং খ্যাতনামা রোটফুক্স পত্রিকার সম্পাদক হোর্স্ট নয়েমান তাদের বক্তব্যে মার্ক্সীয় বীক্ষণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক এবং কিছু মনঃসমীক্ষণবাদী বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। যেমন আর কিছু যদি বাদও যায়, একটা কারণেই মার্ক্স ও এঙ্গেলস চিরকালই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন আর তা হচ্ছে পুঁজিবাদ ও তার বিকাশে মানব মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে যুগান্তকারী পর্যালোচনা। ব্যক্তিগত সম্পদের উৎপত্তি এবং পুঁজির বিকাশ আধুনিককালেও পুঁজিপতি ও শ্রমিকের মধ্যে যে পার্থক্য রচনা করে রেখেছে এবং এখনো যে বিশ্বে শ্রমশোষণ ঘটছে, সেই সঙ্গে ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে, নিঃস্বরা হচ্ছে নিঃস্বতর—এ বাস্তবতা কি আড়াল করার জো আছে? এমনকি পশ্চিমা বিশ্বগুলো থেকে যে জরিপ প্রকাশিত হয়, তাও এ বক্তব্যকেই প্রকটিত করে। মার্ক্স প্রলেতারিয়েতদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘‌এরা হচ্ছে আলুর বস্তার আলু। সবাই একসঙ্গে আছে, কিন্তু একাকার হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না।’ আজকের দুনিয়ায় তৃতীয় বিশ্ব মানেই হয়তোবা নির্বিকল্প প্রলেতারিয়েত নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মার্ক্সবাদ কোনো ধর্ম নয়। তার মূল চিন্তার ধারাপাত দিয়ে পরিবর্তিত বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে বুঝতে হবে। সে জায়গা থেকে চিন্তা করলে আমরা দেখি, শোষিত রাষ্ট্রগুলো আজও শোষণকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। বৈশ্বিক লুণ্ঠন ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে নানা মাত্রায় হয়েই চলেছে। ‘‌ইহুদি প্রশ্ন সম্পর্কে’ নামক প্রবন্ধে মার্ক্স দেখিয়েছিলেন টাকার সৃষ্টির কারণে পণ্যের মূল্য যখন বিমূর্ত, তখন তা ইহুদি-খ্রিস্ট ধর্মের বিমূর্ত ঈশ্বরের জায়গায় স্বকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করবে। এ বাস্তবতা কি আজও পৃথিবীতে বজায় নেই? 

মার্ক্সের তত্ত্বের যে মেটান্যারেটিভ তার টিকে থাকার আরেকটি কারণ তার সঞ্জীবনী শক্তি, যার ব্যবহারিক মূল্যও অসীম। আর তা হচ্ছে শোষিত ও বঞ্চিত শ্রেণীকে জাগিয়ে তোলার এক অমোঘ শক্তি। এ সঞ্জীবনী শক্তি শুধু ধর্মপ্রচারকদের অপৌরুষেয় ক্ষমতার সঙ্গেই তুল্য। কিন্তু মার্ক্স সেই কাজটি করেছেন প্রাসঙ্গিক সমাজ পরিবর্তনের নিয়ামকগুলোকে দ্রষ্টব্য করে। যে কারণে হালের প্রভাবশালী ফ্রাঙ্কফুর্ট বিদ্যানিকেতনের এরিখ ফ্রম ও মাক্স হোর্কহাইমার মার্ক্সকে ইহুদি-খ্রিস্ট ধর্মের পয়গম্বরদের ধারাবাহিকতায় আধুনিককালে তাদের একজন হিসেবেই দেখেছেন। অনেকে বলছেন, রাশিয়ায় তো কমিউনিস্ট যুগের সমাপ্তি ঘটেছে, আর চীনে যা আছে তা তো রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ। তারা ভুলে যান যে মার্ক্স নিজেই বলেছেন, এক দেশের জন্য যে কমিউনিজম, সেটা অন্য দেশের জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে। অর্থাৎ তিনি স্থান-কালের পার্থক্যের কারণে সৃষ্ট পরিবর্তিত বাস্তবতা বিষয়ে সম্যক অবহিত ছিলেন। অন্যদিকে টিকে থাকার প্রশ্নে অন্তর্বর্তীকালীন যে কৌশল চীনে দেং জিয়াও পিং গ্রহণ করেছেন, তাকেও সর্বতোভাবে অমার্ক্সীয় বলার জো নেই। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক লুই আলথুসার মার্ক্সবাদকে পরমকারণবাদ বা টেলেওলজি মনে করতেন। তিনি মনে করতেন, বিশ্বে শ্রমিক শ্রেণীর সামগ্রিক অভ্যুত্থান একসঙ্গে হবে। রাশিয়ায় কৃত্রিম উপায়ে লেনিনীয় কায়দায় প্রলেতারীয় বিপ্লব ঘটানোয় তার দ্রুত মৃত্যু ঘটেছে। চিন্তাগত জায়গায় এ পার্থক্যগুলো থাকতেই পারে, যেহেতু মার্ক্সবাদ একটি বৈশ্বিক দর্শন। কিন্তু তার পরও ব্যবহারিক উপযোগিতার ভিত্তিতে আমরা মার্ক্সবাদের যে স্বরূপ দেখলাম, তাকে কি আজও অগ্রাহ্য করা যায়?

মুহাম্মদ তানিম নওশাদ: লেখক, অনুবাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক