দেশের আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)। অতীতে প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বিশেষ করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দুর্দশায় পুরো খাতের সুশাসন প্রশ্নের সম্মুখীন। ফলে নানা সংকটের আবর্তে দীর্ণ খাতটি। এমন এক প্রেক্ষাপটে এ খাতের প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠক হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। আলোচ্য বৈঠকে খাতটিতে বিরাজমান সমস্যাগুলো এবং তা থেকে উত্তরণে করণীয় বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বৈঠকে এনবিএফআইগুলোয় সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অনেকগুলো ব্যাংক থাকলেও ফ্যাক্টরিং, ব্রিজ ফাইন্যান্সিং, ইক্যুইটি জোগান, লিজ-সুবিধা প্রদানসহ, বিশেষ করে এসএমই কিংবা নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন নিশ্চিতে আর্থিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এনবিএফআইয়ের গুরুত্ব অনেক। মূলত এ প্রয়োজনীয়তার জায়গা থেকে সময়ান্তরে দেশে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৫-এ উন্নীত হয়েছে। কিন্তু বহরে বাড়লেও এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই এখন সমস্যাসংকুল। এর মধ্যে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের কারণে ছয়-সাতটি চরম সংকটে নিপতিত। এর একটি হলো পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। তহবিল তছরুপ কেলেঙ্কারিতে পর্যুদস্ত প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে অবসায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কার্যক্রমে থাকা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ও এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিও (বিআইএফসি) আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। যার সবক’টির মালিকানায় রয়েছে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদার। এছাড়া আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানেরও আর্থিক পরিস্থিতি খারাপ হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় পুরো খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থা তলানিতে। ফলে নতুন আমানত তো পাচ্ছেই নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনেকেই নিজেদের আমানত প্রত্যাহার করছে। এতে বেড়ে চলা তারল্য সংকটে রীতিমতো পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে এটিই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বস্তুত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধিও সীমিত। ব্যাংকের মতো বড় পরিসরে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ করার আইনগত সুযোগ নেই। তাদের কাজ মূলত আমানত সংগ্রহ, ঋণ, লিজ দেয়া, ব্রিজ ফাইন্যান্সিং এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেদিক থেকে তাদের আয়ের পথটিও সংকুচিত। এ অবস্থায় আমানত সংগ্রহ করে ঋণ দিতে না পারলে টিকে থাকা দুষ্কর। আবার বেশি সুদের বিনিময়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ায় তাদের তহবিল ব্যয়ও বেশি। এর মধ্যে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি হওয়ায় মার্জিন, পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে মুনাফা করাটা সহজ ব্যাপার নয়। সুতরাং বিষয়গুলো বিবেচনার দাবি রাখে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতসহ এশিয়ার অনেক দেশেও এনবিএফআই রয়েছে। এর মধ্যে কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে এ খাতটি একটা পরিণত অবস্থায় পৌঁছেছে। ভারতেও এটি ভালো অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু শ্রীলংকা, নেপাল ও বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের আর্থিক মধ্যস্থতা বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। যেসব দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা ভালো, সেখানে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সেগুলো ভালোভাবে সংযুক্ত। ভৌত পরিসর ছোট হলেও ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়া, প্রযুক্তির দিক থেকে কোনোভাবে তারা পিছিয়ে নয়। অথচ ব্যাংকগুলো কিছুটা ভালো অবস্থায় থাকলেও আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে অনেকটা পিছিয়ে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের আস্থাশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকেও ওইসব দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসরণীয়, বাংলাদেশে যা বিরলই বলা চলে। তাই বহির্বিশ্বের অভিজ্ঞতাগুলো পর্যালোচনাপূর্বক এসব ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে বৈকি।
রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। নতুন নতুন ব্যবসার জন্য অর্থায়নের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে উদ্যোক্তাদের মূলধন জোগাতে এনবিএফআইগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সংখ্যায় বেশি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা অনেক। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ভালো ব্যবসা করতে না পারা এবং সুশাসন ঘাটতির কারণে আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করছে। এ অবস্থায় এনবিএফআইয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনার কথা বলছেন কেউ কেউ। এখনো এ খাতে কিছু ভালো ও সক্ষম আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে। তাদের সঙ্গে অন্যগুলো একীভূত করা বা অধিগ্রহণ করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। এমনকি ব্যাংকগুলোও তা করতে পারে, যেভাবে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান চালায়, সেভাবে তারা এসব প্রতিষ্ঠান চালাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকেও নির্বাহীদের পক্ষ থেকে এ ধরনের পুনর্গঠনের প্রস্তাব এসেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক তথা সরকারের দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেয়া চাই। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনা দক্ষতাও বাড়াতে হবে। দক্ষভাবে পরিচালনা করা না গেলে কোনো প্রতিষ্ঠানই টিকিয়ে রাখা কঠিন। এতগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য সৎ, দক্ষ ও যোগ্য লোকবল নেই। বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেকে এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চায় না। কাজেই এসব ক্ষেত্রে নজর দেয়ার সময় এসেছে। ব্যবসার ক্ষেত্রেও অভিনবত্ব দরকার। গতানুগতিক গ্রাহকভিত্তির বাইরে শেয়ারবাজারে ব্রোকার হিসেবে কাজ করারও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ আছে। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য তাদের এ সুযোগ নিতে হবে। ব্যবসার ক্ষেত্রে নানা উদ্ভাবনী উপায় অন্বেষণ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ প্রডাক্টগুলো গতানুগতিক। এক্ষেত্রে বৈচিত্র্য প্রয়োজন। গ্রাহকের চাহিদার দিকে খেয়াল রেখে নতুন নতুন প্রডাক্টের সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। গ্রাহকভিত্তিও আরো বহুমুখী করা দরকার। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিলেও দুঃখজনকভাবে এখানে সংস্থাটির তত্ত্বাবধান ব্যাংকের চেয়ে তুলনামূলক কম, নজরদারি দুর্বল। এ সুযোগে নানা ধরনের অনিয়ম ঘটছে এবং গ্রাহকের কাঙ্ক্ষিত সেবাপ্রাপ্তি ব্যাহত হচ্ছে। কাজেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি বাড়াতে হবে। তবে নজরদারি করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ যেন ব্যাহত না হয়, সেটিও দেখতে হবে। সমরূপভাবে স্ব-উদ্যোগী হয়ে উন্নয়ন করতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন ব্যবস্থার। সর্বোপরি, অর্জন করতে হবে গ্রাহকের আস্থা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ পরিবীক্ষণ ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতায় খাতটি সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়াবে বলে প্রত্যাশা।










