দেশে করোনা সংক্রমণ অনেকটা স্থিতিশীল পর্যায়ে চলে এসেছিল। কিন্তু চলতি মাসে হঠাৎ করে করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেছে। হাসপাতালে রোগীর ভিড় বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুহারও। সংকটাপন্ন রোগীদের শেষ ভরসা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) হলেও এখন বিশেষায়িত এ সেবার অপ্রতুলতার খবর মিলছে। তথ্য বলছে, দেশে করোনা চিকিৎসার জন্য নিবেদিত ৯৬টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ৬৪ শতাংশেই (৬১টি) আইসিইউ নেই। যা আছে, তাও বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক। এটা উদ্বেগজনক বৈকি।
পুরো করোনাকালে দেশে শনাক্ত অনুপাতে মৃত্যুহার দেড় থেকে দুই শতাংশের মধ্যে ছিল। তবে আকস্মিকভাবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে মৃত্যু বেড়েছে ৮৬ শতাংশ। এ থেকে অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, এখন যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি সম্ভবত আগের তুলনায় বেড়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে, করোনাভাইরাসের রূপান্তর ঘটেছে এবং তা আরো শক্তিশালী হচ্ছে। আরেকটি কারণ হতে পারে একাধিক নতুন ধরনের করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, পড়ছে। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনাভাইরাস বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যার ক্ষেত্রে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কার্যকর নয় বলা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ধরনের করোনাভাইরাসও বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যার সংক্রমণ ক্ষমতা খুব বেশি। বলতে গেলে, নতুন নতুন ধরনের করোনাভাইরাসের প্রবেশ কিংবা আগে থেকে ক্রিয়াশীল করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য রূপান্তর আমাদের মহামারী মোকাবেলার সামগ্রিক চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে তুলছে। এ অবস্থায় আইসিইউসহ করোনার সার্বিক চিকিৎসার সুবিধা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
সত্য যে করোনা মোকাবেলায় সরকার পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী গত বছরের জুনেই সরকারি জেলা হাসপাতালগুলোয় আইসিইউর ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে খুব একটা অগ্রগতি নেই। বর্তমানে যে হারে সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে পরিস্থিতির ব্যাপকতর অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোগীদের জন্য আইসিইউ অত্যন্ত আবশ্যকীয় হলেও এরই মধ্যে তা দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। আইসিইউ সংকটের কারণে মৃত্যুসংখ্যা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। সন্দেহ নেই, শয্যা স্থাপন করা যায় না। এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা তখন থেকে বাস্তবায়ন করলে আজকের এ দুরবস্থা অনেকটা সামাল দেয়া যেত। কাজেই এর দায় স্বাস্থ্য বিভাগ এড়াতে পারে না।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বেশ আগেই কভিড হাসপাতালের সংখ্যা কমিয়ে এনেছিল। এখন সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন নতুন হাসপাতাল সংযোজন করলে আইসিইউ শয্যা যেমন বাড়বে, তেমনি চিকিৎসার পরিধিও বাড়বে। সুতরাং দ্রুত এ বিষয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত দরকার। এছাড়া সরকারি কভিড হাসপাতালগুলোয় বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে কীভাবে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো যায়, তার চেষ্টা করতে হবে। করোনার মাঝামাঝি সময়ে অক্সিজেন সরবরাহ, ভেন্টিলেটরের ব্যাপক সরবরাহ ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। এ সময়ে ওই ঘাটতির পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোও জোরদার করা জরুরি। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান ছাড়া দেশে বর্তমানে দৃশ্যমান কোনো কর্মকাণ্ড মাঠ পর্যায়ে নেই। একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া আর সবকিছু চলছে মহামারী শুরু হওয়ার আগের অবস্থায়। গত বছর মার্চ থেকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। ৩০ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের ভিড়ের কমতি নেই। বিয়ে ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে সমাগম থেমে নেই। এসব ক্ষেত্রে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগেই আমাদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ জোর দিতে হবে। এক. টিকা গ্রহণে সর্বসাধারণকে উৎসাহিত করার ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে টিকা গ্রহণের পক্ষে প্রচার বাড়াতে হবে। দুই. স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে চলমান শিথিলতা অবশ্যই দূর করতে হবে। এজন্য এখন কঠোর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে। তিন. বিদেশ থেকে যারা আসছেন, তাদের প্রত্যেককেই বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভাইরাসের নতুন নতুন ধরন প্রবেশ করতে না পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বেড়ে চলা করোনা সংক্রমণ রোধে ১২ দফা সুপারিশ করেছে। গুরুত্ব বিবেচনায় সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে হবে।
দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য অবকাঠামোর বড় দুর্বলতা আইসিইউর অপ্রতুলতা। কভিড পরিস্থিতি এ দুর্বলতা আমাদের সামনে আরো প্রত্যক্ষভাবে স্পষ্ট করে তুলেছে। মনে রাখা চাই, চলমান মহামারীই শেষ স্বাস্থ্য দুর্যোগ নয়। আরো বিপর্যয় সামনে আসতে পারে। সেগুলো মোকাবেলায় এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো আমাদের সামনে বড় দৃষ্টান্ত। বিশেষত সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান প্রভৃতি দেশ সার্চ ভাইরাসের প্রকোপের পর নিজেদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে ঢেলে সাজিয়েছিল। আজ এর সুফল পাচ্ছে তারা। সুতরাং ওই দেশের অনুসরণে কভিড থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাজুকতাগুলো দূর করতে হবে। আইসিইউ সুবিধা বাড়াতে জোর দিতে হবে। এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে অবকাঠামো যেমন লাগে, প্রয়োজন হয় একদল দক্ষ জনবলও। বর্তমানে আইসিইউ সুবিধা পেতে সংকটাপন্ন রোগীরা বড় শহর, বিশেষ করে রাজধানীতে ব্যাপকভাবে ভিড় করছে। ফলে বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালগুলোয় বাড়তি চাপ পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসাও ব্যাহত হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে আাাইসিইউ সুবিধা থাকলে এ চাপ অনেকটা এড়ানো যেত। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সক্রিয়তা কাম্য।










