নারী শ্রমিকরা ভাগ্যবদলের আশায় নিজ দেশের সীমানা পাড়ি দেন। সরকারও তাদের উৎসাহ দেয় দেশের রেমিট্যান্স বাড়বে বলে। সরকারকে সৌদি আরব শর্ত দেয় পুরুষ শ্রমিকদের চাকরির সুযোগ করে দেবে। সমীকরণের এসব অংক সহজে মিলে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে নারীদের শ্রম অভিবাসনের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিদেশে গিয়ে বাঙালি নারীরা যে রেমিট্যান্স পাঠান, তার একটি বিশেষ দিকও রয়েছে। তারা যা আয় করেন, তার ৭২ শতাংশই দেশে পাঠিয়ে দেন, যেখানে পুরুষরা পাঠান ৫৪ শতাংশ। এতে তার পরিবার হয়তো সুখে থাকে, দেশের রিজার্ভও বাড়ে, কিন্তু নারীর নিজের সুখ কি বেড়েছে? পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের হিসাব মতে, গত বছর প্রায় ৮০০ নারী যৌন নির্যাতন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়ে বাংলাদেশে ফিরেছেন। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক বলেছে, গত তিন বছরে (২০১৬-১৯) ৪১০ নারীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) গবেষণায় দেখা যায়, দেশে ফেরত নারীদের মধ্যে ৬৩ শতাংশই বিভিন্ন নির্যাতনের ফলে অসুস্থতা নিয়ে নিজের বাড়িতে পা রাখেন। ফলে রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখতে নারীকে যে মূল্য দিতে হচ্ছে, সে হিসাব আমাদের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
যেসব নারী সাধারণত অত্যাচারিত হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন, তারা আর কখনো বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখান না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা কোনো টাকা-পয়সা হাতে না নিয়ে শারীরিকভাবে দুর্বল এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে দেশে ফেরেন। এ রকম পরিস্থিতিতে একজন পুরুষ অভিবাসী তার ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার জন্য পুনরায় বিদেশ যেতে চান। কিন্তু নারী চান না। তার প্রধান কারণ হচ্ছে, শুধু নারী হওয়ার কারণেই তাকে বাড়তি কিছু বীভৎস অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়, যার কোনো প্রতিকারের আশ্বাস তাকে কেউ দেয় না। উল্টো তাকে সামাজিক নিপীড়নের শিকার হতে হয়। দ্বিতীয়ত, বিদেশের বাজারে নারীর জন্য চাকরির সীমাবদ্ধতা। আইওএমের হিসাব মতে, ৯৯ শতাংশ নারীই বিদেশে গৃহভৃত্যের কাজ করেন। অধিকাংশই ১৪ ঘণ্টার ওপরে কাজ করেন। থাকা-খাওয়ার ন্যূনতম সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বেতন পান অনিয়মিতভাবে।
বিদেশে নারী শ্রমিকদের এসব নিগ্রহের বিপরীতে তাদের অদক্ষতার কথা বলা হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা প্রাপ্য বেতন দাবি, যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়া বা ন্যায্য অধিকারের কথা বলা ইত্যাদি কারণে নির্যাতিত হন, যেটা কাজের দক্ষতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। বরং দেখা যায়, গৃহভৃত্যের কাজগুলোর সঙ্গে বাঙালি নারীদের মানিয়ে নেয়ার সহজাত প্রবণতা রয়েছে। একভাবে বলা যায়, বহির্বিশ্বে এটিই বাঙালির প্রথম পেশা। প্রখ্যাত সমাজ গবেষক গোলাম মুরশিদ তার বিলেতে বাঙালির ইতিহাস বইতে উল্লেখ করেন, বাঙালিরা বিলেতের মাটিতে প্রথম পা রাখে সতেরো শতকে। এসব বাঙালি মূলত গৃহভৃত্য বা আয়া হিসেবে সে দেশে যায়। ডাচ চিত্রশিল্পী পিটার লেলির ১৬৭৪ সালে আঁকা ছবিতে দেখা যায়, একজন ভারতীয় কাজের মেয়ে ইংরেজ পরিবারের একটি মেয়ের দেখাশোনা করছে। ফলে গৃহভৃত্যের কাজের সঙ্গে বাঙালির একটা ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। আসলে দক্ষতা নয়, বরং যে প্রক্রিয়া বা চুক্তির মাধ্যমে তাদের সেখানে পাঠানো হয়, তার মধ্যেই গলদ আছে।
নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নারীর শ্রম অভিবাসন থেমে থাকেনি। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট শ্রম অভিবাসীর মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ হচ্ছেন নারী। তবে তারা প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় সীমিত হয়ে আছেন। এর কারণ বোধহয় মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বাংলাদেশে বিরাজ করা একটি ইতিবাচক ধারণা। দেশগুলোর ‘মুসলিম’ পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশী নারীদের সেখানে যেতে উৎসাহিত করেছে। নির্যাতিত হয়ে দেশে ফেরা নারীদের তথ্য নিয়েছে বদ্ত্রাক মাইৃগ্রশন ৃপ্রাগ্রাম। তার মধ্যে ৬০ বছর বয়স্ক একজন নারী সৌদি আরবকে ‘ভালো দেশ’ ভেবে সেখানে গিয়েছিলেন। ইচ্ছা ছিল কাজ করার ফাঁকে হজও করে ফেলবেন। কিন্তু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন। নারীর শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে আরেকটি ফ্যাক্টর হচ্ছে তার শ্রেণীগত অবস্থান। অধিকাংশ নারীই সাধারণত সামাজিকভাবে উচ্চ শ্রেণীভুক্ত নন। অর্থনৈতিক তাড়নায় সামাজিক মূল্যবোধগুলো এদের ক্ষেত্রে খুব কাজ করে না। যেমন ভৃত্যরাই বিলেতে প্রথম বাঙালি হিসেবে যেতে পেরেছিল তাদের ‘নিম্ন জাতে’র কারণে। ‘ভালো জাতে’র লোকদের তখন সমুদ্র পানি পাড়ি দেয়া সমাজবিরুদ্ধ ব্যাপার ছিল। তেমনিভাবে অভাব-অনটনে পোড় খাওয়া বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত শ্রেণীর নারীরা সংসারের হাল ফেরাতে বিদেশ যাওয়া শুরু করেন।
তবে নারী শ্রমিকদের এই অভিযাত্রাকে মসৃণ করে তুলতে পারেনি রাষ্ট্র। নির্যাতনের ঘটনার ফলে কয়েকটি রাষ্ট্র এরই মধ্যে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার ও সিভিল সমাজ এ সিদ্ধান্তে আগ্রহ দেখায়নি। প্রথম কারণ হিসাবে বলা হয়, এর ফলে অবৈধ অভিবাসন বেড়ে যাবে। তথ্য-উপাত্তও অবশ্য একই ইঙ্গিত দেয়। যেমন বাংলাদেশে নারীদের শ্রম অভিবাসনের পরিসংখ্যান প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯৯১ সালে। সে বছর মোট শ্রম অভিবাসনের ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ ছিল নারী। এ হার মাঝে মাঝে ওঠানামা করতে থাকে। কিন্তু ২০০৩ সালে নারীর শ্রম অভিবাসন বন্ধ করে দেয়ার পর তা হু-হু বেড়ে যায়। সে বছর ছিল ১ শতাংশের কম। পরের বছর ৪ শতাংশের বেশি। ২০১৩ সালে এ নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ শতাংশে। এখন নারীর শ্রম অভিবাসনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অবৈধ অভিবাসন হয়তো কমেছেও। কিন্তু বিদেশের মাটিতে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ে রাষ্ট্র কতটুকু সচেষ্ট হতে পেরেছে?
নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ না করার অন্য আরেকটি কারণ হিসেবে বলা হয়, সৌদি আরবের বিশাল বাজার হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। আমাদের দেশের ‘চাকরিবিহীন প্রবৃদ্ধির’ ধাক্কা কাটানোর জন্য এই বাজার আসলেই গুরুত্বপূর্ণ। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, এ বছর (২০২০) যতসংখ্যক মানুষ শ্রম অভিবাসন করেছে, তার প্রায় ৭৪ শতাংশই সৌদি আরব গেছে। একইভাবে সে দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্সও আসে বাংলাদেশে। এ কারণে যেকোনো উপায়ে এই বাজার ধরে রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর হয়েছি।
বিশ্বায়নের যুগে উন্নত ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো কীভাবে বাজার বিনিময় করে, তা বোঝার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক একটি আদর্শ উদাহরণ। সত্তরের দশক থেকে সৌদির তেলভিত্তিক অর্থনীতির উত্থান হয় এবং ক্রমান্বয়ে এটি একটি ধনী দেশে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে রেমিট্যান্স। কিন্তু তা প্রধানত সৌদি আরবের বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি অসম অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সাধারণত উন্নত রাষ্ট্র নির্ভরশীল রাষ্ট্রের ওপর বিভিন্ন অন্যায় শর্ত চাপিয়ে দেয়। যেমন সৌদিতে বাংলাদেশী নারী শ্রমিক পাঠানোর শর্তে পুরুষ শ্রমিকের প্রবেশাধিকার। যদিও সৌদিতে নারীদের মানবাধিকারের অবস্থা খুবই শোচনীয় এবং বাংলাদেশী নারীরা নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসছেন। বাংলাদেশ এ নিয়ে কোনো প্রতিবাদ করার সাহস করেনি। বরং বাজার ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশ নারী শ্রমিক পাঠিয়ে যাচ্ছে। তাতে অবশ্য ফল মিলেছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে। একই সঙ্গে নারীর মরদেহ, নির্যাতনের সংখ্যাও বেড়েছে। তাহলে দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তিকে জিইয়ে রাখতে নারীর যে আত্মবিসর্জন, তার ফল কী দাঁড়িয়েছে? কবি তারাপদ রায় বহু আগে সে কথাগুলো বলেছিলেন দারিদ্র্য প্রসঙ্গে। নারীর ‘...ক্ষুধার অন্ন এখন আরো কমে গেছে, ...লজ্জা নিবারণের কাপড় এখন আরো ছিঁড়ে গেছে, ...মাথার ওপরের আচ্ছাদন আরো সরে গেছে।’
নারীর স্বাবলম্বনের পথে তাকে দমিয়ে দেয়ার প্রবণতা একটা বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। শ্রেণী, সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় সেটাকে আমরা অনেকাংশে মেনেও নিয়েছি। আসলে সামষ্টিকভাবে আমাদের একটা অবচেতন অবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে গৃহকর্মী নির্যাতন শুধু বিদেশে নয়, নিজের দেশের পরিসংখ্যানও গা শিউরে ওঠার মতো। আমাদের সমাজ ব্যবস্থার পিতৃতান্ত্রিকতা, অর্থনীতির অন্যায্যতা, রাজনীতির স্বেচ্ছাচারিতা, সংস্কৃতির বিভাজিত অবস্থা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন আকৃতি দিয়েছে যে তা নারীদের আরো বেশি প্রান্তিক করে দেয়। যদি আমরা আমাদের উন্নয়নকে টেকসই করতে চাই, তবে পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকারকে আমাদের নীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। সে নীতি বাস্তবায়নে জোরালো সদিচ্ছা ও পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি আমরা সত্যিকারের সমতা নিশ্চিত করতে চাই, তবে নারীর শ্রমের যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
আতাউর রহমান মারুফ: ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে কর্মরত










