ঢাকা ওয়াসার পানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট কোনো বিধি প্রণয়ন ছাড়া পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের পানির মূল্য নির্ধারণ ও কর্মচারীদের পারফরম্যান্স বোনাস দেয়ার সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন বৃহস্পতিবার। ঢাকা ওয়াসা আইন ১৯৯৬-এ সুস্পষ্টভাবে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পানির মূল্যবৃদ্ধির কথা বলা থাকলেও কোনো বিধি প্রণয়ন ছাড়াই খেয়ালখুশিমতো পানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অবৈধভাবে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারফরম্যান্স বোনাস দিয়ে আসছিল। ওয়াসার কর্মকর্তারা সুযোগ পেলেই পানির শুল্ক বাড়িয়ে দিতে চান। তারা গত দুই বছরে দুবার এবং গত ১৩ বছরে ১৫ বার শুল্ক বাড়িয়েছেন। কিন্তু রাজধানীর প্রায় দুই কোটিরও বেশি বাসিন্দার জন্য বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি পূরণে তারা কখনই খুব বেশি উৎসাহ দেখায়নি। অনেক ক্ষেত্রে তারা তাদের ব্যর্থতার উত্তর দেয়ারও প্রয়োজন মনে করেননি। অথচ তাদের সক্ষমতা, পরিকল্পনা ও জবাবদিহির অভাবে ভুগছে রাজধানীর বাসিন্দারা। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালতের রায় তাৎপর্যপূর্ণ। প্রত্যাশা থাকবে, ঢাকা ওয়াসা দ্রুতই পানির মূল্যবৃদ্ধি সংক্রান্ত বিধি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবে।
জনগুরুত্বপূর্ণ যেকোনো পণ্য ও সেবার মূল্য নির্ধারণে সাধারণ কিছু নিয়ম অনুসরণ করা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানই নিয়ম-বিধি ছাড়া মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। বাংলাদেশে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়াসা দাম নির্ধারণ করে আসছিল, যা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিধি প্রণয়ন ছাড়া আগে নির্ধারিত পানির দাম সম্পর্কে উচ্চ আদালত বলেছেন, যেহেতু অন্যায় কাজগুলো আগেই সমাপ্ত হয়েছে তাই সেসব বাতিল না করে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কিন্তু ভবিষ্যতে বিধি ছাড়া যেন পানির মূল্য নির্ধারণ করা না হয় এবং পারফরম্যান্স বোনাস দেয়া না হয় সে মর্মে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। মহামান্য আদালতের কাছে বিধি প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত জুডিশিয়াল গাইডলাইন করে দেয়ার যে আবেদন ছিল তা আপাতত মঞ্জুর করা থেকে বিরত থেকেছেন এবং প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন যে সরকার অনতিবিলম্বে বিধি প্রণয়ন করে বিদ্যমান অসুবিধা দূর করবে। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে পানির দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতা আসবে। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য গণশুনানির মাধ্যমে পানির দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে।
ভোক্তার অধিকার রক্ষায় অস্ট্রেলিয়ায় অস্ট্রেলিয়ান কম্পিটিশন অ্যান্ড কনজিউমারস কমিশন আছে। কোথাও ভোক্তা স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে কিনা সেটি দেখা এ কমিশনের কাজ। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে, যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়ায় এসব নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। সরকারি মালিকানাধীন অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানই এসব সংস্থার ব্যবস্থা অনুসারে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি কিংবা বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। আসলে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থাটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা না সরকারের বিভাগীয় দপ্তর হবে তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকলেও এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে কতটুকু আন্তরিক ও যত্নবান। সরকার আন্তরিক না হলে ভোক্তার অধিকার কখনই আদায় হবে না। উন্নত বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ভোক্তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব আইন ও আইনের আঙ্গিকে প্রণীত নীতিমালার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব হচ্ছে কনজিউমারস কমিশন বা ভোক্তার স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের। ভোক্তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট আইনি বিষয়গুলো বিবেচনা করার জন্য দরকার হাইকোর্টের ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ আদালত। অস্ট্রেলিয়ার কম্পিটিশন ট্রাইব্যুনাল এসব আদালতের অন্যতম।
সারা বছরই রাজধানীর কোথাও না কোথাও পানির সংকট লেগেই থাকে। আবার পানি পেলেও মান অতি খারাপ। কিন্তু ওয়াসার দাবি, সংস্থাটি সুপেয় ও নিরাপদ পানি সরবরাহ করে থাকে। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ওয়াসা যে আইনের অজুহাত দেয় তা খোঁড়া যুক্তি। তাদের সেবার মানের কোনো উন্নতিই হয়নি যে দাম বাড়ানো হবে। বরং পানির মান ও সরবরাহ নিয়ে ওয়াসার আওতাধীন এলাকায় মানুষের বিস্তর অভিযোগ আছে। অনেকেই ঠিকমতো পানি পায় না। পেলেও সেটির মান একেবারেই খারাপ। ওয়াসা স্যুয়ারেজের বিলও নেয়। অথচ তারা স্যুয়ারেজের ব্যবস্থাপনা করে না।
বিধি প্রণয়ন ছাড়া পানির মূল্য নির্ধারণ ও কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্স বোনাস দেয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে উচ্চ আদালতের রায় সবার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নিয়মবহির্ভূতভাবে কোনো সংস্থা একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে যেন পণ্য ও সেবার মূল্য নির্ধারণ করতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। পানির মতো বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণেও এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ এখন একান্তভাবে কাম্য। সারা বিশ্বে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই এ ধরনের পণ্যের দাম নির্ধারণ হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে উন্নত দেশের পথে যাত্রা করা বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটতে পারে না। এতে জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো পণ্য সরবরাহকারীরা বাংলাদেশে একচেটিয়া ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। ফলে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বোঝা তারা সহজেই জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিতে পারে। এ শঙ্কা থেকেই বিধি প্রণয়ন জরুরি। কী নিয়মে ওয়াসার পানির দাম বাড়ানো হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন সবার আগে। পানির দাম অবশ্যই যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। মানুষের জন্য যেন কষ্টকর না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আবার কম মূল্যে পানি সরবরাহ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠান যাতে অকার্যকর না হয়, সে দিকটাও লক্ষ রাখতে হবে। এক্ষেত্রে তাই যথাযথ বিধি প্রণয়ন জরুরি।










