রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও অভিবাসী কর্মীদের প্রবাসজীবন মোটেই নিষ্কণ্টক নয়। বলা চলে, নানা কষ্ট-যন্ত্রণায় ভরা। এসব বিষয় বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। সম্প্রতি বণিক বার্তায়ও এ-সম্পর্কিত তিন পর্বের এক সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে প্রবাসীদের বিদেশযাত্রা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে নানা সমস্যা ও বঞ্চনার খবর মিলছে। দুঃখজনক এ চিত্রের অবসানে অভিবাসন কূটনীতি জোরদার করা জরুরি।

প্রকৃত প্রস্তাবে প্রবাসীদের সমস্যার শুরু অভিবাসনযাত্রা থেকেই। এক্ষেত্রে প্রথমে আসে অভিবাসন ব্যয়। অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশীদের চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি খরচ করে বিদেশে যেতে হয়। অভিবাসন খরচ জোগাতে তাদের রীতিমতো নাকাল অবস্থা। অনেকে সম্পত্তি বিক্রি করেন, অনেকে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধারকর্জ করে বিদেশ যান। অভিবাসী কর্মীদের জন্য সরকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক গঠন করলেও সেখান থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা এখনো কম। এক জরিপের তথ্যানুযায়ী, বিদেশ যাওয়া ব্যক্তিদের তিন-চতুর্থাংশই ঋণ করেন। এসব ঋণ মূলত আত্মীয়স্বজন, এনজিও বা মহাজনদের কাছ থেকে নিয়েছেন। খুব অল্পসংখ্যকই ঋণ পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে। হতাশাজনক ব্যাপার হলো, অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন না। আবার জানলেও বন্ধকজনিত সমস্যা ও প্রক্রিয়াগত জটিলতায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে ঋণ পান না। ফলে তারা অনেকটা উচ্চসুদে অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নেয়ার পথ বেছে নেন। সমস্যার এখানেই শেষ নয়। কষ্টেসৃষ্টে বিদেশ যাওয়ার পর সেখানে অনেক অভিবাসী কর্মীই বেতনবৈষম্যের মুখোমুখি হন। দেখা যায়, বিদেশে যাওয়ার আগে চুক্তির সময় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যে বেতনের কথা বলে, বাস্তবে কর্মীরা সে অনুযায়ী বেতন পান না। এতে তারা বড় ধরনের ধাক্কা খান। একইভাবে প্রবাসী কর্মীরা ছুটির ক্ষেত্রেও বঞ্চনার শিকার। নিয়ম অনুযায়ী সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করার অধিকার থাকলেও অনেক অভিবাসী শ্রমিক তা পাচ্ছেন না। ছুটি ছাড়া কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বণিক বার্তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে প্রবাসে মাসের পর মাস ২৯ শতাংশ শ্রমিক ছুটিবিহীন কর্মজীবন কাটানোর তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া ছুটি কাটালেও বিভিন্ন অজুহাতে বেতনের বড় অংশ কেটে রাখার খবর মিলছে। একে তো চুক্তি অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন না, এর মধ্যে বেতন কাটায় তাদের জীবন দুর্বহ হয়ে উঠছে। তদুপরি আছে কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের ঘটনা। বিশেষ করে প্রবাসী গৃহকর্মীদের নির্যাতনের সংবাদ নিয়মিত বিরতিতে উঠে আসছে। এগুলো স্পষ্টতই তাদের অধিকারহীনতার চিত্রই তুলে ধরে। এর অবসানে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বলিষ্ঠ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশী প্রবাসীদের বড় গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল প্রভৃতি দেশ থেকেও অভিবাসী শ্রমিকরা সংশ্লিষ্ট দেশে যান। প্রবাসীদের অধিকার প্রশ্নে দেশগুলো বেশ সোচ্চার। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে দেশগুলো বিদেশের শ্রমবাজারে নিরাপত্তা বিধান থেকে শুরু করে অভিবাসীদের বিভিন্ন অধিকার নিশ্চিত করেছে। এক্ষেত্রে তাদের দূতাবাসগুলো সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। যখনই কেউ কোনো সমস্যায় পড়েন, তারা দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে আসে, সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। ফলে উল্লিখিত দেশের শ্রমিকদের অধিকারগুলো বেশ সুরক্ষিত। দুঃখজনকভাবে প্রবাসীদের অধিকার নিশ্চিতে সহায়তা ও সুরক্ষা দেয়া অন্যতম কাজ হলেও বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো এক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যর্থ। অনেক ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে দূতাবাসের সহযোগিতা চাইলে না পাওয়ার অভিযোগ এন্তার। ফলে গৃহকর্ম থেকে শুরু করে নানা পেশায় বিদেশের শ্রমবাজারে নিয়োজিত প্রবাসীরা নিয়ত শোষণ-নিষ্পেষণের শিকার হচ্ছেন, তার যথাযথ প্রতিকার মিলছে না। এভাবে আর চলতে পারে না। অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিশ্চিতে দূতাবাসগুলো তথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক সক্রিয়তা বাড়াতে হবে। বঞ্চনার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে অন্য দেশগুলোর মতো বৃদ্ধি করতে হবে দরকষাকষির ক্ষমতা। এখানে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোরও একটা ভূমিকা আছে। প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোমতে গন্তব্যে পাঠিয়ে দিতে পারলেই নিজেদের দায় শেষ মনে করে। এমনটি হওয়া উচিত নয়। তাদের মাধ্যমে যাওয়া কর্মীটিকে চুক্তি অনুযায়ী বেতনসহ অন্য সুবিধাদি দিচ্ছে কিনা, তা খোঁজখবর রাখা জরুরি। না দিলে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সহযোগিতায় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রাখা চাই। এতে সমস্যার একটা সমাধান হবে বৈকি। 

সর্বাধিক সংখ্যায় অভিবাসী শ্রমিক প্রেরণকারী দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। প্রতিদিনই দেশ থেকে ভাগ্যান্বেষণে বিদেশ যাচ্ছেন মানুষ। কিন্তু দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় এখনো সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দালালদের দৌরাত্ম্য, উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়িত্বহীনতা, সরকারের নজরদারির অভাব প্রভৃতি মিলিয়ে প্রতিপদে অভিবাসীপ্রত্যাশী ও প্রবাসীরা দুর্ভোগের শিকার। মনে রাখা দরকার যে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ডিঙিয়ে যারা পরিবার ও দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেগবান করছেন তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার দায় রাষ্ট্রের। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগী ভূমিকাই প্রত্যাশিত।