নভেল করোনাভাইরাস ডিজিজ বা কভিড-১৯। বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া মরণঘাতী এক ভাইরাসের নাম। ডিসেম্বরের একেবারে শেষে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব হয়। এর পর থেকে এটি বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যেখানে সংস্থাটির সদস্য দেশের সংখ্যা ১৯৪। ইউরোপের ধনী দেশ থেকে শুরু করে আফ্রিকার ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় শীর্ষে থাকা রথী-মহারথী থেকে শুরু করে পরাশক্তির দেশগুলো কেউ এ থেকে রক্ষা পায়নি। ভাইরাসটি রীতিমতো বিধ্বংসীরূপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বৈশ্বিক এ সংকট বিশ্বনেতৃত্বকে টালমাটাল পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। জননিরাপত্তার বিষয়ে খামখেয়ালিপনার কতটা মূল্য দিতে হয়, তা বিশ্বনেতৃত্ব ভালোভাবে বুঝছে। বিষয়টি আলোচনার জন্য বর্তমানে ভাইরাসটিতে সংক্রমিতের দিকে একেবারে শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে নজর দিতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে থাকা পরাশক্তির দেশটির সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে দক্ষিণ কোরিয়ার কথা। কারণ দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একই দিনে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হয় এবং এটি চীনের প্রতিবেশী দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র দেশ।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরে উহানে ভাইরাসটি প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার ১৯ দিন পর অর্থাত্ ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ৩৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির শরীরে প্রথম ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়া যায়, যিনি সদ্য উহান থেকে ফেরেন। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মাইল দূরে এশিয়ার দেশ দক্ষিণ কোরিয়ায়ও এদিন ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। এর পরই শুরু হয় ভাইরাসটি মোকাবেলায় যুদ্ধ। তবে অস্ত্র-ক্ষেপণাস্ত্রের ঝনঝনাত্কারে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকলেও ভাইরাসটি মোকাবেলার যুদ্ধে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। কারণ একই দিনে ভাইরাসটি শনাক্ত হলেও দেশ দুটির অবস্থান এখন বিপরীত দুটি মেরুতে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ভাইরাসটিতে সংক্রমিত ও মৃতের দিক থেকে একেবারে শীর্ষে, আর দক্ষিণ কোরিয়া রয়েছে শেষের দিকে।
ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার পর দেশ দুটো কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, তা এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। গত ২০ জানুয়ারি ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার দুদিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিএনবিসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে বেশ দম্ভ করে বলেছিলেন, চীন থেকে আসা একজনের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। সবকিছুই ঠিক আছে।
তবে ব্যবসায়ী থেকে রাতারাতি রাজনীতিক বনে যাওয়া এবং বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়া ট্রাম্পের সে কথায় জনমন কিছুটা আশ্বস্ত করতে পারলেও গণমাধ্যমের সে কথায় চিঁড়ে ভেজেনি। কারণ গণমাধ্যমের খুব ভালো করেই জানা ছিল, ট্রাম্পের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকবেই। সে কারণেই শুরু থেকে দেশটির গণমাধ্যম ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে হোয়াইট হাউজকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দিয়ে আসছিল।
ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি মতামত প্রকাশ করে। ‘অ্যাক্ট নাউ টু প্রিভেন্ট অ্যান আমেরিকান এপিডেমিক’ শিরোনামের ওই উপসম্পাদকীয়তে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ২০০৯ সালের এইচওয়ানএনওয়ান ফ্লুর বিষয়টি উল্লেখ করে আগেই থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়। তবে গণমাধ্যমের সঙ্গে সাপে-নেউলে সম্পর্ক থাকা ট্রাম্প সেটিতে গায়ে আঁচ লাগাননি।
এর পরও একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। এমনকি ভাইরাসটি নিয়ে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণার একদিন আগে অর্থাত্ ৩০ জানুয়ারি ট্রাম্প বলেন, আমাদের মাত্র পাঁচজন আক্রান্ত হয়েছেন। সবকিছুই খুব ভালোভাবে চলছে। আর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নভেল করোনাভাইরাস খুব ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে এর একদিন পর সেন্টার অব ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) শীর্ষ কর্মকর্তা ন্যান্সি ম্যাসোনিয়ের সত্যটা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মার্কিন জনজীবন প্রতিদিনই বড় হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। এছাড়া কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে। যদিও আগ বাড়িয়ে এমন তথ্য দেয়াকে মোটেই ভালোভাবে নেননি ট্রাম্প। ফোন করে ম্যাসোনিয়ের বসকে রীতিমতো এক হাত নিয়েছিলেন তিনি। তবে ধমক দিয়ে তো ভাইরাস থামিয়ে রাখা যায় না। ট্রাম্প যতদিনে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছেন বলে দাবি করেন, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মরণঘাতী ভাইরাসটি ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রকে রীতিমতো গ্রাস করে ফেলেছে।
ওয়াল স্ট্রিটের ওই উপসম্পাদকীয়র প্রায় এক মাস পর এবং ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার প্রায় ছয় সপ্তাহ পর নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হন ট্রাম্প। গণমাধ্যমের উপদেশ বাস্তবায়নে পরীক্ষাগার ও হাসপাতালগুলোয় দ্রুত কভিড-১৯ শনাক্তের পরীক্ষা শুরুর নির্দেশ দেন। কিন্তু ততদিনে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এছাড়া শুরু থেকেই ট্রাম্প ভাইরাসটি পরীক্ষায় গড়িমসি করেছেন এবং সিডিসির ওপরই নির্ভর করেছেন। তবে বিপরীত অবস্থানে ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটিতে ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার এক সপ্তাহ পর অর্থাত্ ২৭ জানুয়ারি দেশটির ২০টি নামি ওষুধ কোম্পানিকে নিয়ে দ্রুত বৈঠক করেন এবং ভাইরাসটি পরীক্ষার জন্য কিট তৈরির আহ্বান জানান এবং সেগুলোকে দ্রুত অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই একটি প্রতিষ্ঠানের কিটকে পরীক্ষার জন্য অনুমোদন দেয়া হয়। তারপর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কিটকেও দ্রুত অনুমোদন দিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পরীক্ষা শুরু করে দক্ষিণ কোরিয়া।
ফলে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে যখন মাত্র ৪২৬ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ততদিনে ৪৬ হাজার ১২৭ জনকে পরীক্ষা করা হয়। শুধু পরীক্ষা করেই দায়িত্ব শেষ করেনি দক্ষিণ কোরিয়া। এরপর আরো তিনটি ধাপ অনুসরণ করেছে। এগুলো হলো ট্র্যাকিং, ট্রেসিং ও ট্রিটমেন্ট। পরীক্ষায় কোনো ব্যক্তি সংক্রমিত বলে শনাক্ত হওয়ার পর পরই শুরু হয় ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং। অর্থাত্ শনাক্ত হওয়ার আগে ওই ব্যক্তি কোন কোন জায়গায় গিয়েছেন, তা ট্র্যাক করা হয় এবং কাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন, সেটি ট্রেসিং বা শনাক্ত করা হয়।
এটি করতে গিয়ে স্থানীয় সরকারের সঙেনগ সমন্বয় করে সংক্রমিত ওই ব্যক্তির স্মার্টফোন ডাটা, ক্রেডিট কার্ড ও স্থানীয় ভিডিও ফুটেজ খুঁজে বের করা হয়। এছাড়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান দিয়ে অ্যাপস তৈরি করা হয় এবং এটি সবাইকে ব্যবহারে বাধ্য করা হয়। ফলে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির ১০০ মিটারের মধ্যে এলেই ব্যবহারকারীদের মোবাইলে সতর্কবার্তা দিতে থাকে। এভাবে তাদের শনাক্ত করা হয় এবং চিকিত্সার আওতায় আনা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষপ ও ট্রাম্প প্রশাসনের উদাসীনতার চিত্র উঠে এসেছে গত ২৪ মার্চ ডব্লিউএইচওর এক প্রতিবেদনে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওইদিন পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় সংক্রমিতের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৩৭। আর মারা যায় ১২০ জন। বিপরীতে একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমিতের সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ১৬৪। আর মারা যায় ৪৭১ জন। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষার পরিধি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমিতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।
বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিস্টেমস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (সিএসএসই) সর্বশেষ (১৭ এপ্রিল বেলা ২টা) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৩৪ লাখ ২০ হাজার ৩৯৪ জনের। এর বিপরীতে করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ৬ লাখ ৭১ হাজার ৪২৫ জন। আর ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ২৮৬। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় ওই সময় পর্যন্ত সংক্রমিত হয়েছে ১০ হাজার ৬৩৫ জন। আর মারা গেছে ২৩০ জন। কোরিয়া সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (কেসিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৪৬৩ জনের, যেখানে এর আগের দিন অর্থাত্ ১৬ এপ্রিল পরীক্ষা করা হয় ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭৫ জনের। সেই হিসাবে একদিনের ব্যবধানে দেশটিতে পরীক্ষা করা হয়েছে ৭ হাজার ৬৮৮ জনের। এখানে একটি কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। সেটি হলো দেশটিতে এরই মধ্যে ভাইরাসটিতে সংক্রমিত ও মৃতের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এর পরও দেশটি এখনো পরীক্ষার ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে মৃত্যু হয়েছে একজনের। আর নতুন শনাক্ত হয়েছে ২২ জন। এর পরও দেশটিত সংক্রমণ ঠেকাতে পরীক্ষার ওপরই জোর দিচ্ছে। দুটো দেশের মধ্যে পার্থক্যের মূলে রয়েছে ভাইরাসটি শনাক্তে পরীক্ষা। একজন শুরু থেকেই জোর দিয়েছে, অন্যজন পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পর।
এবার আসা বাংলাদেশে বিষয়ে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী এবং বাণিজ্যিকভাবে দেশটির সঙ্গে অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সম্পর্ক রয়েছে ইউরোপের সঙ্গেও। এজন্য চীন ও ইউরোপে যখন ভাইরাসটি মহামারী আকার ধারণ করতে শুরু করে, তখন থেকেই সরকার দেশের স্থলবন্দর, নৌবন্দর ও বিমানবন্দরে পর্যবেক্ষণমূলক ব্যবস্থা নেয়। তবে নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সবচেয়ে যেটি জরুরি, সেটিতেই শুরু থেকে অনেকটা ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। মরণঘাতী ভাইরাসটি প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত কোনো ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। তবে ভাইরাসটি প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি জরুরি হিসেবে শুরু থেকেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে এবং পরীক্ষার আওতা বাড়িয়ে সংক্রমিতদের আইসোলেশনের ওপর জোর দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গত ১৬ মার্চ সংস্থাটির এক ব্রিফিংয়েও সব দেশের উদ্দেশে ভাইরাস মোকাবেলায় সাধারণ একটি বার্তা দেয়া হয়। সেখানে কয়েকবার একই কথা বলা হয়। সেটি হলো পরীক্ষা, পরীক্ষা এবং পরীক্ষা। অর্থাত্ নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রধান কাজ হলো পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত এবং তাদের আলাদা করে ফেলা। কিন্তু শুরু থেকেই বাংলাদেশ এ কাজকেই কম গুরুত্ব দিয়েছে। নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় শুরু থেকেই সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) এককভাবে কাজ করতে দেখা গেছে। পরীক্ষার পরিধি না বাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কেবল করোনার উপসর্গ, দেশ ভ্রমণের ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করে বেছে বেছে পরীক্ষা করেছে। অনেকের আবার উপসর্গ থাকলেও কিট সংকটের অজুহাত দেখিয়ে পরীক্ষা করা হয়নি।
বাংলাদেশ করোনা পরীক্ষায় কতটা পিছিয়ে, তার একটি তুলনামূলক চিত্র দেখা যাক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে করোনা পরীক্ষা হয়েছে ১৯ হাজার ৭৭ জনের। এর মধ্যে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৩৮ জন। আর মারা গেছে ৭৫ জন। এবার দেখা যাক অন্যান্য দেশে করোনা পরীক্ষার চিত্র। কভিড-১৯ নিয়ে সার্বক্ষণিক তথ্য সরবরাহকারী ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, একই দিন পর্যন্ত প্রতিবেশী ভারতে পরীক্ষা হয়েছে ৩ লাখ ২ হাজার ৯৫৬ জনের, পাকিস্তানে ৮৪ হাজার ৭০৪, মালয়েশিয়ায় ৯০ হাজার ৫৬২, ফিলিপাইনে ৪৮ হাজার ১৭১, ইন্দোনেশিয়ায় ৩৬ হাজার, থাইল্যান্ডে ১ লাখ ৪৯৮, সিঙ্গাপুরে ৯৪ হাজার ৭৯৬, হংকংয়ে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৭৩ ও ভিয়েতনামে ২ লাখ ৬ হাজার ২৫৩ জন। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ থাকা লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায়ও এ সময় পর্যন্ত ২ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৩ জনকে করোনা পরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশে পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। তবে সেটিও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেরি হয়ে গেছে। গত কয়েক দিনের ফলাফল সেটিই প্রমাণ করে। পরীক্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্যামিতিক হারে সংক্রমিত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। এরই মধ্যে দেশের ৪০টিরও বেশি জেলায় সংক্রমণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় গোটা দেশকে এখন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে সরকার। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে ভাইরাসটি এখন মহামারী পর্যায়ে চলে গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো দরকার। যেসব দেশ ভাইরাসটি সংক্রমণের প্রসার ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে, তাদের অধিকাংশই পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়েছে। এখন আর কেবল ক্লিনিক্যালি সিম্পটমের অপেক্ষা, বিদেশফেরত কিনা এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করার সময় নেই। এখন শুধুই জোর দিতে হবে পরীক্ষা, পরীক্ষা আর পরীক্ষায়। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা করে ফেলা অতিজরুরি। না হলে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশের মতো নিভৃতে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। শীর্ষ ক্ষমতাধর দেশটির এমন ব্যর্থতা পাঠ্যপুস্তকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করেন মার্কিন বিশ্লেষকরা। প্রযুক্তির এ উত্কর্ষের যুগে সে শিক্ষা থেকে আমরাও কিন্তু কম পিছিয়ে থাকব না। ট্রাম্প যদিও এখন নিজের ব্যর্থতার দায়টা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওপরই চাপাচ্ছেন। তবে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে দিয়ে তো আর দায় এড়ানো যায় না। দেশের মানুষ ঘরে থাকতে চায় না। অনেক কিছুই মানতে চায় না। তবে তাদের ঘরে রাখার ব্যবস্থা করাটাও কিন্তু কার্যকর নেতৃত্বের অন্যতম কাজ।










