বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা আর দেশে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটের মুখে রফতানি আয় আর রেমিট্যান্স প্রবাহের গতিপ্রকৃতির দিকে এখন সবার নজর। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স অপেক্ষাকৃত ভালো। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে পণ্য রফতানি ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দেশে কয়েক মাস ধরেই দুশ্চিন্তার বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সেটিকে আরো উসকে দিচ্ছিল প্রবাসী আয় ও পণ্য রফতানি আয়। এক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় কমে আসা ও রফতানি আয় বেড়ে ওঠার খবর নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। রফতানি বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। ব্যাংকঋণসহ পুঁজির জোগান বৃদ্ধি ও সহজলভ্য করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। সর্বোপরি বাজার বিস্তৃত করা ও নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
আশির দশকে বাংলাদেশ ‘এক্সপোর্ট লেড গ্রোথ’ নীতি গ্রহণ করে এবং সন্দেহ নেই যে তা সুফল দিয়েছে। এর ফলে রফতানি আয় বিপুলভাবে বেড়েছে, একই সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে লাখ লাখ কর্মসংস্থান। এক্সপোর্ট লেড গ্রোথের ধারায় এখন দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—সীমিত পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বাজার বহুমুখী করা। অধিক মূল্য সংযোজিত হয় এমন পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। দেশজ কাঁচামালভিত্তিক পণ্যের উৎপাদন বাড়াতেও মনোযোগী হতে হবে। আমরা জানি, কেবল পোশাক ও সংশ্লিষ্ট বস্ত্র খাত থেকেই আসে রফতানি আয়ের প্রায় ৮৮ শতাংশ। আর রফতানি আয়ের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ। এ দুটি লক্ষ্য অর্জন যে সহজ নয় সেটা সরকার, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জানা আছে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে তারা যেমন এক্ষেত্রে উদ্যোগী হবেন, তেমনি চাই সমন্বিত পদক্ষেপ। বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কথাও মনে রাখা চাই। আমরা যে বাজারে যেতে চাইব, প্রতিযোগীদের টার্গেটেও সেটা থাকা স্বাভাবিক। এ অবস্থায় বাজার সম্প্রসারণ করতে হলে পণ্যের গুণমান যেমন ক্রমে বাড়িয়ে যেতে হবে, তেমনি দামও রাখতে হবে প্রতিযোগিতামূলক। উন্নত বিশ্ব থেকে শুল্কছাড়সহ বাণিজ্য সুবিধা আদায়েও চাই কূটনৈতিক উদ্যোগ।
বিশ্ব পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পোশাক শিল্পের বিকাশ ও প্রবৃদ্ধিতে এবং বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত সর্বাগ্রে। তাই রফতানি বহুমুখীকরণে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। থাইল্যান্ড রফতানি বহুমুখীকরণের একটি সফল উদাহরণ, প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক শিল্প (যেমন—কৃষি ও মৎস্যপণ্য) আপগ্রেড করার জন্য এবং শ্রমনিবিড় উৎপাদিত রফতানি, বিশেষ করে পোশাক এবং ইলেকট্রনিকসকে উৎসাহিত করার জন্য একটি দ্বৈত কৌশল গ্রহণ করেছে দেশটি। চীনের সঙ্গে সমগ্র পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি আঞ্চলিক বিষয়গুলোকে অর্থনৈতিক একীকরণের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে। ক্রস-কান্ট্রি প্রডাকশন নেটওয়ার্কের একীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন চেইনের অবস্থান সংহত করেছে। এর ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে কম খরচে উৎপাদনের যে সুবিধা চেয়েছিল তার ব্যবস্থা থাইল্যান্ড করেছে। বাংলাদেশের পণ্য বৈচিত্র্য, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, গুণগত বৈচিত্র্য, পণ্য পরিষেবার বৈচিত্র্য নিয়ে ভাবতে হবে। রফতানি বহুমুখীকরণের জন্য শুল্ক ব্যবস্থার একটি রফতানিবিরোধী অবস্থান থেকে সরিয়ে এসে কীভাবে আরএমজি ছাড়াও অন্যান্য রফতানি পণ্য বাড়ানো যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। খরচ, গুণগত মান, সময় ও নির্ভরযোগ্যতা এ চারটি মাত্রার কথা ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে রফতানি ঝুড়িতে শুধু একটি পণ্যের আধিপত্য। একটি পণ্য দিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করা বেশ কঠিন। চীন, ভারতসহ প্রতিশ্রুতিশীল বাজারে প্রবেশের জন্য এসব দেশের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনে উদ্যোগ নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ভিয়েতনাম চীনে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের টেলিফোন, মোবাইল ফোন অ্যাকসেসরিজ, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ও সেমিকন্ডাক্টর রফতানি করে থাকে। বাংলাদেশে এসব পণ্য উৎপাদন হয় না বললেই চলে। ভিয়েতনাম গত ২০ বছরে এ খাতে বিশ্বের রফতানিতে ৪৭তম থেকে দশম স্থানে উন্নীত হয়েছে এবং এর পটভূমি হিসেবে রয়েছে স্বল্প মজুরি, উৎসাহমূলক কর সুবিধা, বিশ্ববাজারের সমর্থন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পাদিত মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। স্যামসাং, এলজি ও ক্যাননের মতো বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড ভিয়েতনামে তাদের প্লান্ট স্থাপন করেছে। এছাড়া ইন্টেল ভিয়েতনামে প্রসেসর ও ইলেকট্রনিকস চিপস তৈরির প্লান্ট চালু করেছে। ভিয়েতনাম বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাইরে থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ এনে সংযোজন করে ইলেকট্রনিকস তৈরি করে আবার রফতানি করে থাকে। ভিয়েতনাম এখন বিশ্বের স্মার্টফোন উৎপাদনের একটি বড় হাব হিসেবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেরও উচিত এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সুবিধা দেয়া। যেমন- ১৫ বছরের জন্য কর সুবিধা, প্রশ্নবিহীন বিনিয়োগ সুবিধা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, চীন-জাপান-ভারতসহ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন এবং বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডকে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে এ খাত দেশের রফতানি বাণিজ্যে বিশাল অবদান রাখতে পারে। এরই মধ্যে বিশ্বের বড় কিছু ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট শুধু বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বাজারের দিকে নজর দিয়ে এ খাতে এগিয়ে এলেও খাতটি যেন শুধু দেশের বাজারমুখী না হয়, সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন।
২০৪১ সাল নাগাদ একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার রূপকল্প বাস্তবায়নের জন্য আরো শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার ২০ শতাংশ ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে সম্পৃক্ত হতে হবে। এটি অসম্ভব নয়, যদি আমরা অর্থনীতির চালিকাশক্তি পোশাক শিল্পের অগ্রযাত্রার পথ সুগম করতে পারি। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের অন্যতম প্রধান খাত পোশাক ও বস্ত্র শিল্প। সামষ্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ শিল্পের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া বাঞ্ছনীয়। জাতীয় উন্নয়নে রফতানি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে গত এক দশকে রফতানির প্রবৃদ্ধি অনেক আশাব্যঞ্জক। মাঝে কভিডের কারণে দুই বছরের সংকট না হলে রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেত। সে হিসাবে বাংলাদেশের রফতানি খাত এ পর্যন্ত যথেষ্ট ভালো করেছে। বাংলাদেশের রফতানি আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি যেসব খাতে রফতানি বেড়েছে, সেগুলোর দিকে যেমন নজর দিতে হবে; তেমনি এর পাশাপাশি সম্ভাবনাময় খাতগুলোর দিকেও সার্বিক পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।










