অনুবাদ অধ্যয়নের পথিকৃৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) অন্য ভাষায় অনুবাদকৃত ‘গীতাঞ্জলির’ জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তারপর ১৯১৩ সাল থেকে ভারতে অনুবাদের আদ্যোপান্ত নিয়ে বেশ জোরেশোরে আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাতৃভাষার মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশগম্যতা লাভের জন্য বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়। বলে রাখি, কেবল অনুবাদের জন্য। বাংলাদেশ সচরাচর এর ব্যতিক্রম ছিল, আছে এবং হয়তো থাকবে। তবে আপাতত একটা প্রচেষ্টার কথা না বললেই নয় ।

খুব সম্ভবত ২০১৬ সালে দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন নামে এক বই লিখেছিলেন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান ক্লাউস শোইয়াব। সম্প্রতি সাড়াজাগানো বইটির বাংলা অনুবাদ— লেখকের ভাষায় ভাবান্তর— পাঠকের হাতে পৌঁছে দিলেন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (প্রথমা প্রকাশন ২০২২)। পরিচয়ে তিনি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য এবং বর্তমানে এর মুখ্য উপদেষ্টা। সুন্দর প্রচ্ছদ আর ছাপায় দ্যুতিমান এ বই তিনি অনুবাদ করে বাজারে আনলেন তার আশিতম জন্মদিনে। আর তাই শুভেচ্ছা নেবেন  দুদিক থেকেই এক, মনে হচ্ছে তিনি ‘আশিতে আসিও না’ বলতে বারণ করছেন এবং দুই, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত এমন একটা বিষয় সাধারণ পাঠকের সামনে আনলেন যা প্রতিনিয়ত আমাদের পরিচালিত করছে লাঙল থেকে ট্রাক্টর, বগকাঁচি থেকে হলার মেশিন, শিল্প ও সেবায় যন্ত্রের যন্ত্রণা, তারবাহী থেকে তারবিহীন তথ্য বিনিময় ইত্যাদি। বলতে দ্বিধা নেই, এ বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা অপ্রতুল এবং অসম্পূর্ণ। পরিবর্তনের  চালিকাশক্তি এবং এদের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে আমাদের সবার সম্যক জ্ঞান থাকা অবশ্যই জরুরি। 

বিদেশী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই নিজের ভাষায় অনুবাদ করে উন্নয়নের উঁচু শিখরে পৌঁছেছে অনেক দেশ যেমন জাপান। তবে আগেও বলেছি, বাংলাদেশে এ ধরনের প্রচেষ্টার ঘাটতি প্রকট। বিশেষত, বিজ্ঞান বা সামাজিক বিজ্ঞানের মানসম্মত বইয়ের মানসম্মত অনুবাদ একেবারে নেই বললেও চলে। যে সমাজে ধরেই নেয়া হয় যে জীবন-জীবিকার জন্য চাই ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা, সে সমাজে অনুবাদ গ্রন্থের অভাব যাওয়ার নয়। যাই হোক, ফরাসউদ্দিনের এই অনুবাদ আশা করি অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।

চতুর্থ বা বর্তমান শিল্প বিপ্লবের আগের বিভিন্ন ধাপ অবশ্য সংজ্ঞায়িত থাকলে ভালো হয়। পাঠকের মনে থাকার কথা যে প্রথম শিল্প বিপ্লব উৎপাদন যান্ত্রিকীকরণে পানি আর বাষ্পশক্তি ব্যবহার করেছিল, দ্বিতীয়টি বিপুল পরিমাণে উৎপাদনের লক্ষ্যে ব্যবহার করেছিল বিদ্যুত্শক্তি আর তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে দেখা গিয়েছিল উৎপাদন স্বয়ংক্রিয় করার জন্য ইলেকট্রনিকস এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ভূমিকা। চলমান চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের শুরুটা গেল শতাব্দীর মধ্য থেকে এবং তৃতীয় ধাপের ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল রেভল্যুশন নামে পরিচিত হয়ে আসছে যার প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রযুক্তির সংমিশ্রণে শারীরিক, সংখ্যা এবং জীববিজ্ঞানসংক্রান্ত ক্ষেত্রের পার্থক্য রেখা অস্পষ্ট করে তোলা। আবার এটা  যে শুধু তৃতীয় বিপ্লবের সম্প্রসারণ তা নয়, বস্তুত  বেগ, ব্যাপ্তি এবং পদ্ধতির প্রভাব নিয়ে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন চতুর্থ বিপ্লবের আগমন এবং যেটার চলমান প্রধান সাফল্যের দ্রুততার ঐতিহাসিক নজির নেই। অতীতের শিল্প বিপ্লবের তুলনায় বর্তমানটির বিকাশ এক্সপনেন্সিয়াল, রৈখিক নয়। তার ওপর দেখার মতো যে এটা সব দেশে সব শিল্পকে তছনছ করে দিচ্ছে এবং পরিবর্তনের প্রশস্ততা ও গভীরতা পুরো উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা এবং শাসনের রূপান্তরের বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে। অনুবাদকের কথায়, ‘আমাদের অজান্তেই আমরা এমন যুগে প্রবেশ করেছি, আর তা এমন নীরবে যে বুঝতেই পারিনি যুগান্তরের এ তাত্পর্যকে। এমন অভূতপূর্ব রূপান্তর মানবজাতি এর আগে আর কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। শুধু অর্থনীতিই নয়; জগৎ ও জীবনের সবকিছু মানুষের চিন্তাভাবনা, দর্শন, রাজনীতি, শিল্প ও সংস্কৃতি সবকিছুর ওপরই এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে...... তৈরি হয়ে গেছে ন্যানোপদার্থ যা লোহা থেকে ২০০ গুণ শক্ত অথচ মাপে মানুষের চুলের ১০ লাখ ভাগের ১ ভাগ মাত্র।’

‘প্রভাব-প্রতিপত্তি’ শিরোনামে তৃতীয় অধ্যায়ে মূলত বিশ্ব অর্থনীতিতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাঞ্চল্যকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন বইটির লেখক আশাবাদী ক্লাউস শোইয়াব ‘এটি এত ব্যাপক ও বহুমাত্রিক হবে যে একটি পরিবর্তনকে পরবর্তীটি থেকে আলাদা করে ভাবা যাবে না।’ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রবৃদ্ধির ওপর ইতিবাচক প্রভাব রাখছে এবং এই বিপ্লব নিয়ে আশাবাদের তিনটি কারণ প্রথমত,  বিশ্বের ২০০ কোটি মানুষের অপূরণকৃত প্রয়োজন বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ এবং অতিরিক্ত চাহিদা ও জোগানের সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব; দ্বিতীয়ত, নেতিবাচক বাহ্যিকময়টা শনাক্ত করার শক্তি বৃদ্ধি এবং তৃতীয়, ডিজিটাল সক্ষমতা সৃষ্টিতে সবার আগ্রহ।

প্রযুক্তির প্রসারে চাকরির সুযোগ হ্রাস পাবে— এ কথা অনেকটা চিরসত্যের মতো কথা এবং নতুন প্রযুক্তি বিপ্লবটি আগের শিল্প বিপ্লবের তুলনায় বেশি ঝড়ের সূচনা করবে। তবে প্রযুক্তি উদ্ভাবন সবসময়েই কিছুটা চাকরি লুপ্ত করে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে আবার নতুন স্থানে নতুন ধরণনর কাজের মাধ্যমে সেগুলো প্রতিস্থাপন করে যেমন কৃষি।

বইটিতে আশার আলো যেমন আছে, তেমনি আছে উদ্বেগ। হুবহু তুলে ধরা হলো এমন দুটো ক্ষেত্র—

স্মার্ট সেন্সর এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। এই উদ্ভাবনধর্মী, সংযুক্ত সেন্সরগুলো জমিতে প্রাপ্ত তথ্য (পাতা-সংক্রান্ত, ভেজিটেশন ইন্ডেক্স, ক্লোরোফিল, হাইগ্রোমেট্রি, তাপমাত্রা, পানির প্রাপ্যতা, বিকিরণ) সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে যোগাযোগ করে। এর উদ্দেশ্য হলো বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে স্মার্টফোন দিয়ে সঠিক সময়ে পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান করে ফলাফল, সময় এবং অর্থের দিক দিয়ে জমি পরিচালনাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কার্যকর করা। খামারে এ সেন্সরগুলো ব্যবহার করে শস্যের অবস্থা বোঝা যাবে এবং সঠিক সময়ে ইনপুট এবং চিকিৎসা পরামর্শ পাওয়া যাবে। এমনকি সেচের পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব।

খাদ্য শিল্পে আরো বেশি বেশি সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা এবং পূর্ণ ডকুমেন্টেশন প্রয়োজন। এ নতুন প্রযুক্তিটি ট্র্যাকিং সিস্টেম হিসেবে এবং মানুষ ও পণ্যের ডাটা সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হয়।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ইম্যাজিনেশন এইজের সূচনা করে।

গবেষকরা ধারণা করেন, চতুর্থ বিপ্লব লিঙ্গবৈষম্যকে প্রভাবিত করবে। ভবিষ্যতে যেসব পেশার অটোমেশন দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা কম তার মধ্যে অন্যতম হলো ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত (ম্যানেজারিয়াল) পেশা। এ ধরনের কাজের জন্য অবশ্যই জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকতে হবে। নেতৃত্ব, কর্মদক্ষতা, মানবিক গুণের দিক দিয়ে নারীরা পুরুষদের চেয়ে এগিয়ে থাকার প্রমাণ থাকলেও নারীদের অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ-সুবিধা ও অংশগ্রহণ, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জটিলতা, আগের তুলনায় ঘন ঘন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা, বাঁধাধরা সামাজিক রীতি এসবই বৈষম্য তৈরি করতে পারে। আবার প্রায়োগিক বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণে নারীদের আগ্রহ এবং সুযোগ কম থাকায় অটোমেশনের ফলে নারীদের চাকরির ক্ষেত্র আরো কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। সার্বিকভাবে নারীদের জন্য ইন্ডাস্ট্রি  চতুর্থ বিপ্লবের শিল্পের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা আরো কঠিন হয়ে যেতে পারে।

মোট কথা, বইটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে ফরাসউদ্দিন আমার মতো একজন সাধারণ পাঠকের কাছে অবলীলায় অর্পণ করেছেন একটা বিশ্ববিখ্যাত বই। বইটির অন্যতম আকর্ষণ এর প্রাঞ্জল ভাষা, প্রাসঙ্গিক উপমা এবং শব্দশৈলী। আশা করি, অন্তত আমার কাছে, ‘অবশ্য পাঠ্য’ এ বইটি পাঠ করে পাঠক লাভবান হবেন। ফরাসউদ্দিনের মতো অন্যরাও এগিয়ে আসুক কবি মধুসূদনের মর্মবেদনা ঘোচাতে—

 “হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;-

তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,

পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি।’’

 

আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক

বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক