আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমি কাজ করলাম সুদীর্ঘ ৩০ বছর। আমার বয়স তখন ৩১, যখন আমি ব্র্যাকে যোগ দিই। ব্র্যাক ছেড়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হই ২০০৫ সালে। কাজেই ১৯৭৯ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত আমি আবেদ ভাইয়ের সান্নিধ্যে কাজ করি। মাঝে অবশ্য দুই বছর ছিলাম না। এক বছর পড়তে গিয়েছিলাম ম্যানিলায় আর এক বছর পড়াতে গিয়েছিলাম আমেরিকায়। বলতে গেলে আমার সবচেয়ে উৎপাদনশীল বছরগুলো আমি ব্র্যাকে কাটিয়েছি। তাতে আমার কোনো খেদ, দুঃখ বা আফসোস নেই। কেননা আমার মনে হয় আমি আমার জীবনের পূর্ণতা পেয়েছি।

এ লেখাটার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এত বছর আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার কাজ করার যে অভিজ্ঞতা সে সম্বন্ধে স্মৃতিচারণ করা এবং মানুষ, কর্মী, নেতা ও ব্যবস্থাপক হিসেবে আমি তাকে কীভাবে দেখেছি, শুনেছি, জেনেছি, সেটা পাঠকদের কাছে তুলে ধরা।

আবেদ ভাইয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, দক্ষ নেতৃত্ব আর সুতীক্ষ চিন্তাভাবনারই ফসল আজকের এই বিশাল ব্র্যাক এবং এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো, যাকে মানুষ এখন একবাক্যে চেনে। তবে উনি একা তো আর সবকিছু করেননি। তিনি মানুষ চিনতেন এবং অনেক পারদর্শী, নিবেদিত ও নিষ্ঠাবানদের নিয়ে দল গঠন করেই কাজটি করেছেন।

আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। অনেক কথোপকথন, আলোচনা, বক্তব্যের আমি নীরব সাক্ষী। সব বলতে গেলে একটা বই লিখতে হবে। চেষ্টা করব মোক্ষম কতগুলো কথা আর অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বলতে।

প্রথমেই বলতে হয়, আবেদ ভাই একজন সাংগঠনিক ব্যক্তি ছিলেন। তার কাছে সংগঠন আগে। শয়নে, স্বপনে, নিদ্রায়, জাগরণে উনি ব্র্যাকের কথাই ভাবতেন। কীভাবে ব্র্যাক আরো বেশি মানুষের উপকারে লাগতে পারে, কীভাবে ব্র্যাক নিজস্ব আয় দিয়ে চলবে, কীভাবে ব্র্যাক আরো প্রসারিত হবে, এগুলো নিয়েই উনি চিন্তা করতেন, কাজ করতেন।

আবেদ ভাই প্রচারবিমুখ ছিলেন। সহজে সর্বসমক্ষে বক্তব্য রাখতে চাইতেন না। নিজের ও সংগঠনের প্রচার চাইতেন না। বলতেন, ‘কাজ করো, একদিন স্বীকৃতি আসবেই। সেজন্য ঢাকঢোল পেটানোর প্রয়োজন নেই।’

কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দেশে-বিদেশে পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য পাঠাতেন। এই নিমিত্তে কেউ যদি ছুটি চাইত, সেটা সাদরে অনুমোদন করতেন। আর কেউ যদি চাকরি ছেড়ে অন্যত্র যেতে অনুমতি চাইত, তাতেও বাধা দিতেন না। বলতেন, ‘একজন কর্মী যদি সংস্থায় না-ই থাকতে চায়, তাকে রেখে খুব একটা লাভ হয় না। তার কাজ করার অনুপ্রেরণা আর থাকে না।’

আবেদ ভাই একদিকে যেমন ছিলেন স্বপ্নদর্শী, দূরদর্শী, অন্যদিকে অসাধারণ ব্যবস্থাপকও ছিলেন। অনেক খুঁটিনাটি বিষয় খেয়াল করতেন। একবার মানিকগঞ্জে গরুর টিকাদান নিয়ে কথা হচ্ছে। আবেদ ভাই টিকাদান পদ্ধতিটা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর বললেন, এই টিকা দেয়াটা আমাদের মেয়ে কর্মীরাই করতে পারবে। অনেক পুরুষ কর্মীই বলল, ‘না ভাই, এ কাজটা মেয়েরা করতে পারবে না। গরু লাফালাফি করে, মেয়েদের দ্বারা সম্ভব না।’ উনি বললেন, ‘গরুটা যাতে স্থির থাকে, সেটা তো গ্রামের মানুষই ধরে রাখে। ইনজেকশনটা তো শুধু গরুর ঘাড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। মেয়েটা তো আর গরু ধরবে না। কাজেই মেয়েরা অবশ্যই পারবে এবং ছেলেদের চেয়ে ভালো করতে পারবে।’ সবাই বুঝল। সেই থেকে এ কাজটা মেয়েরা খুব সুচারুভাবেই করতে থাকল।

ব্র্যাকের অনেক কর্মকাণ্ডের উৎস কিন্তু ছিল গ্রামের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা। আবেদ ভাই তাদের ও কর্মীদের কাছ থেকে শুনতেন, অনেক প্রশ্ন করতেন এবং সেটা নিয়ে চিন্তা করে নতুন নতুন কর্মসূচির উদ্ভাবন করতেন। যেমন গ্রামের মায়েরাই বলেছিল, ‘আপনারা তো অনেক কিছু করলেন, আমাদের শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন না?’ সেখান থেকেই ১৯৮২ সালে ব্র্যাকের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু। গ্রামের মানুষই আবেদ ভাইকে বলেছিল, তাদের উৎপাদিত গরুর দুধ বাজারজাতের জন্য কিছু করা যায় কিনা। সেই থেকেই ব্র্যাক ডেইরির আরম্ভ। ব্র্যাকের মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচির ঋণগ্রহীতারা জানায় যে তাদের আরো বড় আকারের ঋণ দরকার। ব্র্যাক ব্যাংকের সৃষ্টি হয়।

ব্র্যাকের আড়ং বা ব্র্যাক ডেইরি প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদ ভাই যে যুক্তিটা দিতেন, সেটা হচ্ছে যে এগুলো যদিও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কিন্তু এদের মূল দায়িত্ব হবে উৎপাদকের স্বার্থ রক্ষা করা; তাদের সৃষ্ট পণ্যসামগ্রী বাজারজাত করা, তাদের ভালো ও নিরবচ্ছিন্ন আয় ও লাভের ব্যবস্থা করা।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আবেদ ভাইয়ের চিন্তা অনেক বছর ধরে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হয় ২০০১-এ। তার ১০ বছর আগেই আমাদের উনি বলেছিলেন, ‘আমাদের একটা বিশ্ববিদ্যালয় করতে হবে।’ আমরা শুনে অবাকই হয়েছিলাম। এও কি সম্ভব? সে সময় আবেদ ভাই প্রায়ই একটা গবেষণাপত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলতেন, ‘এই পৃথিবীতে অনেক সংস্থা তৈরি হয়, কিন্তু দীর্ঘ সময় টেকে না। একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই শত শত বছর ধরে টিকে আছে। ব্র্যাক বা আমরা হয়তো একদিন থাকব না। কিন্তু ব্র্যাকের বিশ্ববিদ্যালয় অনন্তকালের জন্য স্থায়ী হবে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝেই আমরা বেঁচে থাকব।’

এ বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে তিনি কতগুলা দিকনির্দেশনামূলক কথা বলে গেছেন । তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এখানে উল্লেখ করি:

১। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে পৃথিবীর একটি প্রথম শ্রেণীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

২। আমাদের গরিব জনগোষ্ঠীর সন্তানরাও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে এবং সুনাগরিক হবে।

৩। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শুধু লেকচার দিয়ে পড়ালে চলবে না। শিক্ষকদের প্রধান কাজ ও দায়িত্ব হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে জ্ঞানতত্ত্বমূলক কৌতূহল জাগ্রত করা। সেজন্য শিক্ষকদের ক্লাসে বিভিন্ন ধরনের শিখন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

৪। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাইকে মনে রাখতে হবে যে আমাদের আয়ের প্রধান জোগানদার হচ্ছে ছাত্রছাত্রী আর তাদের অভিভাবকরা। কাজেই তাদের কাছে আমাদের জবাবদিহিতা থাকতে হবে।

৫। আমাদের রেসিডেন্সিয়াল সেমিস্টার, ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান বৃদ্ধিতে, দক্ষতা অর্জনে, মুক্তচিন্তাশীল, স্বাবলম্বী ও বিশ্লেষণাত্মক হতে সহায়ক হবে।

কথাগুলো প্রণিধানযোগ্য। শুধু যে আমাদের জন্য তা-ই নয়। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই কথাগুলো প্রযোজ্য।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যাপারেও আবেদ ভাই অনুরূপ অনেক কথা বলে গেছেন। ব্র্যাক ব্যাংক একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ ব্যাংকের কাজ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ঋণ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সেবা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। নিম্ন আয়ের মানুষই ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান গ্রাহক হবে।

দুঃখজনক হলেও বাস্তব যে আবেদ ভাই আমাদের মাঝে আর নেই। কাজেই এখনকার যে নেতৃত্ব ব্র্যাক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক ব্যাংক, আড়ং ও ব্র্যাকের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন তাদের অবশ্যই এ কথাগুলো মাথায় রাখতে হবে। টাকাপয়সার চেয়েও মানুষ বড়, এটা সংস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে চিন্তা করা উচিত।

আমার কথাগুলো হয়তো আমি গুছিয়ে বলতে পারলাম না। কিছুটা বিক্ষিপ্ত, কিছু অনুল্লেখ্য, কিছু সংক্ষিপ্ত হয়ে গেল। পাঠক আমার চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান। কাজেই আমি নিশ্চিত, তারা এ লেখা থেকে যা বোঝার তা বুঝে নেবেন।

 

সালেহউদ্দীন আহমেদ: ব্র্যাকের সাবেক উপ নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সাবেক উপ-উপাচার্য