বাংলাদেশের কয়েকটি পুঁজিপতিগোষ্ঠী বেশ কয়েক বছর ধরে সরকারের কাছে জোর তদবির করে চলেছেন তাদেরকে দেশের ব্যাংকঋণ নিয়ে বিদেশে বিনিয়োগ করার অনুমতি দেয়ার জন্য। এটা অন্যায় আবদার হলেও যেহেতু সরকারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তাই অদূরভবিষ্যতে তাদেরকে এ রকম অনুমতি দেয়া হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এরই মধ্যে কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীকে নাকি বিদেশে বিনিয়োগ করার জন্য সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমতি দিয়েছে আবার কয়েকটি গ্রুপকে অনুমতি দেয়া হয়নি। কী কারণে একেক গ্রুপের প্রতি একেক রকম আচরণ করা হচ্ছে, তা আমার জানা নেই। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় যেকোনো পুঁজিপতিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে ঋণ নিয়ে বৈধভাবে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া বড় ধরনের ভুল। পুঁজি পাচারকে ‘সরকারি লাইসেন্স’ দেয়ার শামিল হবে ব্যাপারটি। 

একটি গোষ্ঠী দেশ থেকে পুঁজি পাচার করে প্রয়োজনীয় বিদেশী মুদ্রা বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ দেখিয়ে নিজেদের জন্য এবং তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যার জন্য ওসব দেশে অভিবাসন বা নাগরিকত্ব পাওয়ায় সফল হয়েছে। তাদের প্রায় সবারই বিদেশে ঘরবাড়ি-ব্যবসাপাতি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো এ দেশ থেকে বৈধভাবে বিদেশে পুঁজি নিয়ে বিনিয়োগের কোনো আইনসম্মত ব্যবস্থা চালু করা হয়নি।  বাংলাদেশে লাভজনক ব্যবসা বা শিল্প উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ ফুরিয়ে গেছে কিংবা সীমিত হয়ে গেছে বলার অবকাশ নেই। তাহলে তারা কেন দেশের ব্যাংকগুলোর আমানতের অর্থ বিদেশে নিয়ে যেতে চাইছেন? ব্যাংকের আমানত প্রবাহের অব্যাহত ঢলের প্রধান উৎস দেশের ১ কোটি ২০ লাখ প্রবাসী শ্রমজীবীর বৈধ-অবৈধ চ্যানেলে পাঠানো ক্রমবর্ধমান রেমিট্যান্স। 

বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগ কয়েক বছর ধরে জিডিপির ২৩-২৪ শতাংশে ঘোরাঘুরি করছে। সরকারের সযতন প্রয়াস সত্ত্বেও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ আর বাড়ানো যাচ্ছে না। ব্যাংকগুলোয় উদ্বৃত্ত তারল্য সমস্যা লেগেই রয়েছে। অক্টোবরের শেষে ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ব্যাংকিং খাতে। মোট বিনিয়োগের যে গতিশীলতা এখন দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারকে বাড়িয়ে চলেছে, সেটা প্রধানত প্রবাসীদের গ্রামীণ বিনিয়োগ এবং সরকারি খাতের বিনিয়োগের উল্লম্ফনের কারণেই ঘটছে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের তুলনামূলক এই স্থবিরতার জন্য ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের পক্ষ থেকে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারকে দায়ী করা হতো বরাবরই, কিন্তু এখন যেহেতু ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, তাই দেশে বিনিয়োগ না করার অজুহাত খোঁড়া হয়ে পড়েছে (১৬ নভেম্বর ২০২০ তারিখের দৈনিক বণিক বার্তার খবরে জানা যাচ্ছে, বেশকিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আরো কম হারে সুদের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন!)। 

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচার সমস্যা নভেল করোনাভাইরাস মহামারী আঘাত হানার আগে ক্রমে বিপজ্জনক স্তরে চলে যাচ্ছিল কয়েক বছর ধরে। মার্কিন গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির হিসাবমতে, এক দশক ধরে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৭-৯ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছিল ২০১৮ সাল পর্যন্ত। এই পাচারকৃত পুঁজির একটি অংশ ছিল ব্যাংকঋণ। আমদানি বাণিজ্যের ওভার ইনভয়েসিং, রফতানি বাণিজ্যের আন্ডার ইনভয়েসিং এবং রফতানি আয় দেশে ফেরত না এনে বিদেশে রেখে দেয়া পুঁজি পাচারের প্রধান তিনটা প্রক্রিয়া হলেও প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্সের একটা বিশাল অংশ হুন্ডি ব্যবস্থায় দেশে পাঠানোর কারণে দেশ থেকে বিদেশে হুন্ডি প্রক্রিয়ায় অর্থ পাচার করা একেবারেই সহজ হয়ে গিয়েছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এখন মহামারীর কারণে হুন্ডি প্রক্রিয়া ঝিমিয়ে পড়ায় পাঁচ মাস ধরে বৈধ চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স আসায় রেকর্ড প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে (অর্থমন্ত্রী অবশ্য সরকারের ঘোষিত ২ শতাংশ প্রণোদনাকে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির মূল কারণ দাবি করে চলেছেন)।

ভুললে চলবে না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর প্রতিবেদন ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮-এর গবেষণা মোতাবেক ২০১২ সাল থেকে ২০১৭—এই পাঁচ বছরে অতিধনী বা ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির দিক দিয়ে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলে সারা বিশ্বে এক নম্বর স্থানটি দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশ। ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের জিডিপি এবং জিএনআইয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধি এই ধনকুবেরদের দেশে-বিদেশের সম্পদের প্রবল স্ফীতি ঘটানোর অর্থই হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলের সিংহভাগ দেশের ধনাঢ্য গোষ্ঠীগুলোর কাছে গিয়ে জমা হয়ে যাওয়া। সোজা কথায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ন্যায্য হিস্যা থেকে দেশের শ্রমজীবী জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে।

দেশের আয় ও সম্পদের এমন পুঞ্জীভবন ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ নিকৃষ্ট নজির হিসেবে সারা বিশ্বের জনগণের কাছে তুলে ধরছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারটি মূল নীতির মধ্যে ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র আবার পুনঃস্থাপিত হয়েছে। ২০১১ সালে সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার সে রায়কে সংবিধানে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা সত্ত্বেও সরকার এখনো ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে’ চলছে। ‘স্বজনতোষী পুঁজিবাদ’ (ক্রোনি ক্যাপিটালিজম) আজও নীতিপ্রণেতাদের ধ্যান-জ্ঞান হিসেবে ‘হলি রিটের’ মর্যাদায় বহাল রয়ে গেছে। সরকারের কিছু মন্ত্রী সাম্প্রতিক বক্তব্যে দাবি করে চলেছেন যে বাংলাদেশ সরকারের নীতি পরিচালিত হয়ে চলেছে ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতির’ দর্শন অনুসারে। এমন বক্তব্যের মাধ্যমে যে তারা দেশের সংবিধানকে অবমাননা করছেন, ওই বোধটুকু তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। তারা ভুলে যাচ্ছেন যে ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে আবারো ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’!  

ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছেই দেশের খেলাপি ব্যাংকঋণের ৮০ শতাংশেরও বেশি আটকে রয়েছে। বাংলাদেশের এই ‘রবার ব্যারন’ ব্যাংকঋণ লুটেরারা জাতির শত্রু। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে বাংলাকে উপনিবেশে পরিণত করার পর কোম্পানির কর্মকর্তা, সেনাপতি ও সিপাহীরা ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে এ দেশ থেকে যে বিপুল পুঁজি জাহাজের পর জাহাজে ভরে ব্রিটেনে পাচার করেছিল, সেটাকেই এখন ঐতিহাসিকরা ‘দ্য বেঙ্গল লুট’ নামে অভিহিত করেছেন। বলা হচ্ছে, ওই জাহাজগুলো লন্ডন বন্দরে লুটের পণ্য খালাস করতে তিন মাসের একটি জাহাজ-জট সৃষ্টি করেছিল। ১৭৫৭-১৮৫৮ পর্বের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এবং ১৮৫৮-১৯৪৭ পর্বের সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের পর ১৯৪৭-৭১ পর্বের পাকিস্তানি পুঁজি লুটেরারা আরো ২৪ বছর পুঁজি পাচারের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে ‘আন্তর্জাতিক তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুলি’ উপাধিতে ভূষিত হতে হয়েছিল। গত ৪৯ বছরে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের কয়েকশ রবার ব্যারন বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখ কোটি টাকারও বেশি পুঁজি লুণ্ঠনের ও পুঁজি পাচারের প্রধান হোতা। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী কর্তৃক প্রকাশিত ঋণখেলাপিদের তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে, বেশ কয়েকজন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বা ব্যাংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা সেখানে বসবাস করছেন। কেউ কেউ বিদেশে তারা ঘরবাড়ি-ব্যবসাপাতি কিনে অভিবাসন বা নাগরিকত্ব নিয়ে ফেলেছে। তাদের কারো কারো স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা বিদেশে বসবাস করছেন, তারা নিজেরাও মাসে-দুই মাসে বা আরো ঘন ঘন নিয়মিত রুটিন হিসেবে বিদেশে যাওয়া-দেশে আসা চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ আদায় করার জন্য কখনো সরকার সত্যি সত্যিই চাপ দিলে তারা রাতারাতি দেশ থেকে চলে যাবে। 

বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় অনেক ব্যবসায়ী-শিল্পপতি যে শ্রীলংকা, নেপাল, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, উগান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, তানজানিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে কলকারখানা ও ব্যবসাপাতি স্থাপন করেছেন, সে খবর আমাদের জানা। তারা এ দেশ থেকে কীভাবে পুঁজি বিদেশে নিয়ে গেলেন, বৈধভাবে তো এ দেশ থেকে বিদেশে পুুঁজি নিয়ে বিনিয়োগ করা যায় না? কানাডার টরন্টো নগরীর ‘বেগম পাড়ায়’ যারা বাড়িঘর কিনেছেন কিংবা মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির সুযোগ নিয়ে মালয়েশিয়ায় নাগরিকত্ব লাভ করেছেন, তারা এই কোটি কোটি টাকা নিশ্চয়ই বৈধপথে বিদেশে নিয়ে যাননি! তাদের ‘আলাদিনের চেরাগের’ সন্ধান এখনো করছে না কেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)? বাংলাদেশের ফরেন মিনিস্ট্রি কিংবা দূতাবাস বা হাইকমিশনকে পত্র দিয়ে পুঁজি পাচারকারীর তথ্য সংগ্রহের যে প্রয়াস দুদক শুরু করেছে, সেটি কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দুদকের নিজস্ব তদন্ত টিম এবং/অথবা গবেষণা টিম সরাসরি এসব দেশে প্রেরণ করে এই পুঁজি পাচারকারীদের সুলুক সন্ধানে বাধা কোথায়? আবারো বলছি, নভেল করোনাভাইরাস মহামারী অর্থনীতিকে বর্তমানে একটা বিপর্যয়ের গিরিখাদে নিক্ষেপ করেছে, যেখান থেকে মুক্তি পেতে জাতিকে আগামী কয়েক বছর কঠোর সাধনা চালিয়ে যেতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে আবার দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার স্বার্থে জাতিকে দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করতে হবে।


ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়