বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম বানিয়াচংয়ে ফজলে হাসান আবেদের জন্ম। তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এনজিও ব্র্যাক। সম্প্রতি তিনি প্রয়াত হয়েছেন। গত পাঁচ দশকে তিনি সেই হাঁটুভাঙা, তলাবিহীন বাংলাদেশকে টেনে তুলেছেন কত উঁচুতে, কত বড় করে দিয়েছেন আমাদের—মান-সম্মানে, ইজ্জতে আর অর্জনে।
আবেদের সবচেয়ে বড় আবেদনের জায়গা হচ্ছে, তিনি আমাদের গড়পড়তা বাঙালি স্বভাব অনেকাংশেই উতরে গেছেন। তিনি কথা বলতেন কম, কাজ করতেন বেশি। তত্ত্ব আর মতাদর্শগত বিভেদের বিপরীতে তিনি অ্যাকশনে বিশ্বাসী ছিলেন। জমিদার পরিবারে তার জন্ম। পূর্বপুরুষরা বেহিসাবি আর খরুচে হলেও অর্থবিত্তে তার ছিল ব্যাপক অনীহা। এত বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েও তার নিজস্ব কোনো বাড়ি ছিল না। আবার দরিদ্র মানুষদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে হালের ফ্যাশন হচ্ছে বেশ-ভূষণে তাদের মতো হওয়া। বিপরীতে আবেদ সারা জীবন কেতাদুরস্ত সাহেব হয়েই গেছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয়। তার কাছে কাজটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ‘চাষাভূষার’ সঙ্গে আত্মিক বন্ধন তৈরিতে তার কোনো সমস্যা হয়নি।
তিনি পড়াশোনা করেছেন বিদ্যাজগতের বনেদি বিষয়গুলোয়—পদার্থবিজ্ঞান, নৌ-স্থাপত্য কিংবা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং। অথচ সারা জীবন কাজ করেছেন ‘মানুষ’ নিয়ে, তাদের ‘উন্নয়ন’ নিয়ে। আবেদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি সবসময় হতভাগ্য আর মজলুমদের জন্য কাজ করতে পছন্দ করতেন। লন্ডনে পড়াশোনাকালীন তিনি সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া বন্ধুটির জন্য ভোটের প্রচারণা করতেন। হারবে জেনেও তাকেই ভোট দিতেন। এটাই হচ্ছে তার স্বভাব। বর্তমানে বাংলাদেশে আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য অমর্ত্য সেন বা কৌশিক বসুরা ভূয়সী প্রশংসা করে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারগুলো এ খাতগুলো নিয়ে কাজ করতে নারাজ ছিল। শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে এ দেশ এশিয়ার প্রায় সব দেশের চেয়ে কম বরাদ্দ রাখে। তাহলে এই জাদুর কাঠি এসেছে কোত্থেকে? সত্তর-আশির দশকে আবেদের উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তনে সাহায্য করেছিল, যার পরিণতিতে আমরা এমডিজিতে সাফল্য পেয়েছিলাম। অথচ রাষ্ট্র হিসেবে এ কৃতিত্ব তুলে ধরতে আমাদের এক ধরনের অনীহা কাজ করে।
আবেদ অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ করেন। যেকোনো সংগঠনকে অল্প কয়েক দিনেই ভেঙে ফেলতে অভ্যস্ত বাঙালি জাতির মাটিতেই গড়ে তোলেন বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকরী ও টেকসই উন্নয়ন সংগঠন। বলা হয়, প্রাচীনকাল থেকেই ভৌগোলিক কারণে এ অঞ্চলের গ্রামীণ সংগঠনগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। এখানে ব্যক্তিই হচ্ছে সর্বসেবা। আবেদ সেই বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোয় বঞ্চিতদের মধ্যেও বঞ্চিত নারী আর অবহেলিত এক জনগোষ্ঠী নিয়েই তৈরি করেন এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। যেটি ব্যক্তির ছায়ায় ঢাকা না পড়ে ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর সেই ‘পরশ্রীকাতর’ বাঙালি সমাজে সার্থকভাবে কোনো কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আরেকটি কঠিন কাজ। আবেদও তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। প্রথম দিকে তাদের বলা হয়েছিল সিআইএর এজেন্ট। পরবর্তীতে ‘পুঁজিবাদী চক্রান্ত’, ‘সুদখোর’
তকমা বা ফতোয়াবাজদের দৌরাত্ম্য পেছনে লেগেই ছিল।
এতসব সত্ত্বেও তিনি দমে যাননি। তার এই অদম্য শক্তির উৎস কী ছিল? আবেদ আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উত্সৃষ্ট এক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সৈনিক। মুক্তিযুদ্ধে আমরা শুধু একটি বিজয় চাইনি। চেয়েছিলাম যাবতীয় বঞ্চনা, অন্যায্যতা আর দারিদ্র্য থেকে মুক্তি। আমরা যখন একাত্তরকে বিজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছি, তখন সেখান থেকেই তিনি তার আসল যুদ্ধ শুরু করেন। এ যুদ্ধ তিনি আমৃত্যু করেছেন। তার যুদ্ধ ছিল দারিদ্র্য, অশিক্ষা, নারীর প্রতি বৈষম্য, স্বাস্থ্যহীনতা ও সব ধরনের অন্যায্যতার বিরুদ্ধে। সামগ্রিকভাবে তার এ যুদ্ধ ছিল একটি বিভাজিত, বিভ্রান্ত ও অবিকশিত সমাজের রূপান্তরের জন্য।
বাংলাদেশ হচ্ছে উন্নয়ন নিয়ে বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক ঊর্বর ক্ষেত্র। তবে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার অধিকাংশই হচ্ছে ভিনদেশী তত্ত্ব বা মতাদর্শ দ্বারা আরোপিত। বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন মডেল ছিল না। আবেদের ব্র্যাক সেখানে বিস্তর অবদান রেখেছে। ব্র্যাকের ‘চরম দরিদ্র মডেল’ নিয়ে কাজ করেছিলেন অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি ও তার সঙ্গীরা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামাজিক বিজ্ঞানের বিভাগগুলোয় এ রকম মডেলগুলো নিয়ে খুব কমই আগ্রহ দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে মরা প্রাণ। এটি বরং নতুন কিছু উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। অভিজিত্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবেই তাদের গবেষণা করে নোবেল পেয়েছেন। অথচ আমাদের তার উল্টোটাই করতে হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তার মডেল বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শিক্ষকতাকেই ইস্তফা দিয়েছেন। যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পশ্চিমা জ্ঞান নির্ভরতা কমাতে চাই, তবে ব্র্যাকসহ এসব দেশজ মডেল নিয়ে আরো গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।
‘চাকরিবিহীন প্রবৃদ্ধি’ আর ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের চাপে ভারাক্রান্ত এই জনগোষ্ঠীর জন্যও আবেদ স্মরণীয়। তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য তিনি হতে পারেন আদর্শ নায়ক। তিনি হচ্ছেন আমাদের সময়ের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা। শেল কোম্পানির—বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল কোম্পানি—প্রতিষ্ঠিত চাকরি আর ক্যারিয়ার ছেড়েই ক্ষান্ত হননি। তার উচ্চবিত্ত পারিবারিক আবহ আর জীবনযাত্রার সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোতে তিনি যাত্রা করেন। পাগলামির নেশা ধরে তাকে। এখনকার সময়ে এ রকম পাগলামি করতে গেলে আমরা আমাদের পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা সমাজের কথা ভেবে ১০ পা পিছিয়ে যাই। তিনি করেছেন থোড়াই কেয়ার।
সত্তরের দশকের হতাশাগ্রস্ত আর বিধ্বস্ত বাংলাদেশে এনজিওকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেয়া ছিল চরম মূর্খতার শামিল। উদ্যোক্তার প্রধান বৈশিষ্ট্যই ঝুঁকি নেয়া। ফজলে হাসান বরাবরই ঝুঁকি নিতেন। আর বারবার ব্যর্থ হতেন। তার ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, তার পড়াশোনা আর জীবনবৃত্তান্ত কোনোটিই এর অনুকূলে ছিল না। তবে তার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হচ্ছে, তিনি ভুল থেকে শিক্ষাটাকে খুব কাজে লাগাতেন। ব্র্যাকের গবেষণা প্রতিষ্ঠান তার জন্মলগ্ন থেকে সক্রিয়। প্রতিটি উদ্যোগকেই তারা পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে আরো বেশি কার্যকর করে তোলে। এটা তাদের উদ্যোগগুলোকে আরো বেশি বিস্তৃত করতেও বিপুল ভূমিকা রাখে। ফলে একটি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নতুন নতুন উদ্যোগ।
মুরগি পালনকে উদাহরণ হিসেবে নেয়া যাক। উপার্জনমূলক কাজ হিসেবে গ্রামীণ নারীদের মধ্যে এ উদ্যোগকে প্রসারিত করতে গিয়ে দেখা যায়, রোগবালাইয়ে মুরগি মারা যাচ্ছে। ফলে মুরগির টিকা দেয়া ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দেখাশোনার জন্য ব্র্যাক এমন একটি ‘ডাক্তার আপা’র দল তৈরি করে, যারা ব্র্যাকের বাইরেও এ দক্ষতা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা বা ডাক্তারদের জিনিসপত্র ঠিক রাখার জন্য ফ্রিজ বা কোল্ড স্টোরেজ দরকার। সেই যন্ত্রগুলো ঠিক রাখার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফ্রিজ মিস্ত্রিদের নিয়ে তৈরি করা হয় নতুন আরেকটা কর্মসংস্থান। সব শেষে দেখা যায়, মুরগির উন্নত মানের খাদ্যের অভাব। মুরগির শ্রেষ্ঠ খাবার হিসেবে ব্র্যাক ভুট্টা চাষকে দেশে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। এতে একদিকে কৃষক লাভবান হন, অন্যদিকে পোলট্রি শিল্পও বিকশিত হলো।
আবেদ হচ্ছেন মূলত আমাদের ‘উন্নয়ন বিজ্ঞান’-এর এডিসন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা নারী প্রগতি বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে তিনি শত শত এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। কতগুলো ব্যর্থ আর কতগুলো সফল হয়েছে। তার এসব উদ্যোগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ
সুফলভোগী হয়েছে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে অগণিত মানুষ। বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদানগুলো মানুষের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসতে যখনই রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, আবেদ তার উদ্যোগ নিয়ে সেখানে হাজির হয়েছেন এবং ভালোভাবেই সেখানে অবদান রাখছেন। আবার বেঁচে থাকার নিছক প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো যখন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন, তখনই তিনি মানুষের সৃজনশীল বিকাশ সাধনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এখন দক্ষতা বৃদ্ধি বা নেতৃত্ব তৈরি ইত্যাদি বিষয়েও ব্র্যাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এভাবে তিনি আসলে পুরো বাংলাদেশকে কেন্দ্র করেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, গার্মেন্ট বা স্বাস্থ্যসেবা, যেখানেই শূন্যতা দেখেছেন, সেখানেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি আসলে এনজিওর প্রথাগত ধারণাকেই পাল্টে দিয়েছেন। কোনো এনজিওর ছত্রচ্ছায়ায় এতগুলো স্বাবলম্বী কার্যকরী প্রতিষ্ঠান এত সফলভাবে কাজ করে যাওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
আবেদ ছিলেন পরিপূর্ণভাবে একজন আধুনিক মানুষের প্রতিকৃতি। ইউরোপীয় রেনেসাঁর উৎসজাত যে শিল্প-সাহিত্য, তিনি তার সব ধরনের রূপ-রস চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করেছেন লন্ডনে পড়াশোনাকালীন। আরেক রেনেসাঁ মানব রবীন্দ্রনাথ—গ্রামীণ নারী আর জীবন যার লেখনীতে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে—ছিলেন তার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। ফলে কোনো বিশেষ প্রতিদানের আশায় নয়, বরং ফজলে হাসান আবেদের এই কর্মযজ্ঞতা হচ্ছে সার্থক মানবজনমের অমোচনীয় পদচিহ্ন রেখে যাওয়া। তিনি হতে চেয়েছিলেন কবি। সেই পথে না হাঁটলেও তার একেকটি উদ্যোগ হয়ে ওঠে অবিস্মরণীয় কবিতার পঙিক্ত। সেইসব পঙিক্ততে নিহিত ছিল মানবমুক্তি। তিনি শুধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের সংগ্রামে জড়িত হয়েই থেমে যাননি, এ রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠার জন্য এককভাবে পাহাড়সম অবদান রেখেছেন। এভাবে তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের যুগের কিংবদন্তি। আমরা কি তার মতো কবিতার কথা বলে যেতে পারব? আমরা কি তার মতো স্বাধীনতার কথা বলে যেতে পারব? তার মহাপ্রয়াণে এই হোক আমাদের প্রধান জিজ্ঞাসা।
আতাউর রহমান মারুফ: শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










