আলু স্বল্পমেয়াদি ফসল হলেও বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দেশে এমন উপজেলা পাওয়া যাবে না, যেখানে আলু চাষ হয় না। বিগত বছরগুলোয় অব্যাহত উৎপাদন সাফল্যে ২০২০ সালে ১০৯ মিলিয়ন টন আলু উৎপাদন করে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম স্থানে আছে। এই ঈর্ষণীয় সাফল্যের পেছনে কৃষকের নিরন্তর পরিশ্রম, সরকারের ইতিবাচক নীতি সহায়তা ও উৎপাদন অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। উৎপাদনে স্থায়িত্বশীলতা দিতে উৎপাদিত আলু দেশে ভোগের পাশাপাশি রফতানি সক্ষমতা বাড়ানো খুবই জরুরি। তবে বাংলাদেশ থেকে যথেষ্ট পরিমাণ আলু রফতানি হয় কিন্তু তা স্থিতিশীল বা ঊর্ধ্বমুখী নয়; রফতানির গতি-প্রকৃতি দেখলেই এটি সহজে বোঝা যায়। যেমন ২০০৯-১০ থেকে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত (২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ বছর বাদে) গড়ে আলু রফতানি থেকে আয় হয়েছে ১১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলার, প্রত্যাশার তুলনায় তা খুবই কম। বাংলাদেশ থেকে প্রায় সব আলু সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশে রফতানি হয়। বর্তমান রফতানি সক্ষমতা দেখে তা সহজেই বলা যায় যে আলুর রফতানি প্রতিবন্ধকতা দূর না করলে আলু উৎপাদনের সাফল্য ধরে রাখা দুরূহ কাজ হবে।

আলু রফতানির প্রথম বিবেচনা হলো আমাদের দেশের আলুর সম্ভাব্য ভোক্তা কারা। বলতে দ্বিধা নেই বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে যে আলু রফতানি হয়, তার সিংহভাগের ভোক্তা রফতানীকৃত দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশী এবং একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসম্পন্ন দেশ, যেমন ভারত, নেপাল, মিয়ানমারসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের আলুর গুণাগুণ এসব দেশের আলুর গুণাগুণ ও মানুষের খাদ্যাভ্যাস প্রায় কাছাকাছি। বাংলাদেশের আলুর শীর্ষ আমদানিকারক মালয়েশিয়া (প্রায় ৮০ শতাংশ), সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ।  ইউরোপের দেশ রাশিয়া ও বেলারুশ সাম্প্রতিক সময়ে দুই বছর বাংলাদেশের আলু আমদানি করেছে। কিছু কারিগরি কারণে বর্তমানে তা বন্ধ আছে বা স্বল্প পরিসরে হচ্ছে। আইটিসির সূত্রমতে, মালয়েশিয়ায় আলু রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, শীর্ষে অবস্থানকারী দেশ চীনের সঙ্গে ব্যবধান ৩৮-৪০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে শেয়ার বাড়াতে পারলে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে যাবে এবং তা অসম্ভবও নয়। শ্রীলংকা বা সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশের বাজার স্থান কীভাবে বাড়ানো যায় তা নিরূপণ করা দরকার। আমাদের সুবিধা হলো, আমাদের প্রচুর কর্মী সেসব দেশে কাজ করেন আবার সেসব অঞ্চলের জনগণ কালচারালি আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, অন্যদিকে ইউরোপের বাজার কিন্তু এ দেশগুলোর মতো নয়; কারণ ইউরোপের ভোক্তার চাহিদা সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ সেসব দেশের আলুর গুণগত চাহিদা এশীয় দেশগুলোর মতো নয়। বিদেশে ভোক্তার শ্রেণীভেদ রয়েছে, এশীয় বা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল বিশেষ করে উষ্ণ ও অবোষ্ণ এলাকার ভোক্তার চাহিদা শীতপ্রধান দেশের ভোক্তার চাহিদা ভিন্ন। তাদের কাছে আলুর নিজস্ব গুণগত মান এখানে বিবেচ্য বিষয়। যেমন শীতের দেশের মানুষের উচ্চ  (৩০ শতাংশ বেশি) শুষ্ক পদার্থ সমৃদ্ধ আলু, আর উষ্ণ ও অবোষ্ণ এলাকার ভোক্তার শুষ্ক পদার্থ কম হলেই চলে (২০-২৫%)। তাছাড়া শীতের মানুষের আলুতে অবস্থিত এল এসপারজিন নামের যৌগটির প্রতি কেজি আলুতে ৭৫০ ন্যানোগ্রাম বেশি উপস্থিতি একটি নেতিবাচক চাহিদা। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ থাকে খাদ্য পছন্দেও, তা যথাযথ অনুসরণও করে এবং রাষ্ট্রও তা নিশ্চিত করে। ফলে আমরা যা-ই ভাবি না কেন, বাংলাদেশের আলুর মূল ভোক্তা প্রবাসী বাংলাদেশী ও সমসংস্কৃতির দেশের প্রবাসীরা। দেশের মানুষ বিদেশে থাকলে দেশের প্রতি সীমাহীন মায়া থাকে, দেশীয় পণ্য খেতে ভালোবাসে, আবার তার সঙ্গে বসবাসরত অন্যান্য দেশের মানুষকেও সেদেশীয় পণ্য কিনতে উৎসাহিত করে। এটাই বিদেশে বাংলাদেশী আলুর চাহিদা স্থিতিশীল করতে বড় শক্তি ও ইতিবাচক দিক।

কৃষি মন্ত্রণালয় আলু রফতানি বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, এর অধীনে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে বর্তমান রফতানি তিন বছরের দ্বিগুণ করার একটি রোডম্যাপও প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৮-১০ লাখ টন আলু রফতানি করে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। তবে আলু রফতানির প্রধান চাহিদাগুলো সর্বাগ্রে চিহ্নিত করা অতিজরুরি। আলু রফতানির অন্যতম বিবেচনা হলো এর জাত এবং অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য। রফতানিকারকদের সমিতি ও বারি সমন্বিতভাবে একমত হয়েছে যে সানসাইন, প্রাডা, সান্তানা, কুইনঅ্যানি, কুম্বিকা, ডোনেটা, ডায়মন্ড, গ্রানোলা, মিউজিকা ও বারি আলু ৬২—এ ১০টি জাত রফতানি উপযোগী। তবে এখানেও কিছু মতপার্থক্য আছে, যেমন গত কিছুদিন আগে রফতানিকারক সমিতি দাবি করছে যে আলু রফতানির অন্যতম প্রতিবন্ধক হলো হার্ট নামের শারীরবৃত্তীয় সমস্যা এবং দেশের অতিজনপ্রিয় ও বারি উদ্ভাবিত জাত ডায়মন্ড হলোহার্ট-প্রবণ।

আলু সতেজ ও সেমিপেরিসেবল কৃষিপণ্য, পরিবহনে তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল ৮-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সজীব থাকে দীর্ঘদিন, ফলে পণ্য পরিবহনে এয়ারকার্গোর চেয়ে সমুদ্রপথে শুধু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই সস্তায় রফতানি করা যায়। রফতানির সফলতা নির্ভর করে পণ্যে উৎপাদন স্থান থেকে কাঙ্ক্ষিত দেশে পৌঁছানো পর্যন্ত যত কম ব্যয়ে পৌঁছে দেয়া। সেখানে আইনি বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেয়া সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে GAP অনুসরণ করে চাষ করে তা প্রত্যায়িত করতে হয়। আলু রফতানিতে আমাদের প্রতিযোগী দেশও আছে। এগুলো হলো ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, চীন, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ইত্যাদি। যেহেতু আলুর ভোক্তা আমাদের দেশীয় কমিউনিটি, ফলে দেশের বহুল প্রচলিত জাত বারি উদ্ভাবিত ডায়মন্ড ও কার্ডিনাল, বগুড়ার লাল আলু, জাম আলু ইত্যাদি জাতের চাহিদা বেশি। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত ডায়মন্ড।

বাংলাদেশ থেকে আলু রফতানিতে কিছু বাধা এরই মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন আলু রফতানির অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো আলুর শারীরবৃত্তীয় সমস্যা হলোহার্টের উপস্থিতি। রফতানিকারক সমিতি দাবি করছে বারি উদ্ভাবিত জাত ডায়মন্ড হলোহার্ট-প্রবণ। আলুর আকার বড় করা ও ফলন বাড়ানোর জন্য অনিয়ন্ত্রিত সেচ ও সার ব্যবহার এর প্রধান কারণ। বিবিএস সূত্রে জানা যায়, ডায়মন্ড জাতটি বাংলাদেশের মেগা ভ্যারাইটি, প্রায় সব ধরনের অংশীজনের কাছে চাহিদা আছে, জাতটি নিয়ে বারির বিভিন্ন বিজ্ঞানী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এমএস-পিএইচডি করেছেন। এ পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত কোনো উপাত্ত বা পাবলিকেশন পাওয়া যায়নি কিংবা মাঠ থেকেও বারিকে জানায়নি। ফলে কোনো বহুল প্রচলিত জাতকে কোনো বিশেষ অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল ঘোষণার আগে উপযুক্ত পদ্ধতিতে গবেষণা করে উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জনসমক্ষে বলা সমীচীন, তা না হলে একটি  ভুল বার্তা ছড়াতে পারে, এতে আলুর সার্বিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এ সমস্যা আছে, আলু উৎপাদন থেকে প্যাকিং পর্যন্ত যথাযথ ব্যবস্থাপনা করে হলোহার্টমুক্ত আলু রফতানি সম্ভব। যেমন আলু রোপণের ৩৫ দিন (টিউবারাইজেশন শুরু) থেকে মাটিতে যাতে পানির ঘাটতি না হয়, চাহিদার অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগ না করা হয়। এছাড়া আলু সংগ্রহের পর গ্রেডিং করার সময় অস্বাভাবিক আকৃতির আলু বাদ দিতে হবে। রফতানি করার আগে আলু কনটেইনারে ধৌত বা ওয়াশিং করতে হয়, সে সময় ওপরের ভেসে ওঠা আলু বাদ দিতে হবে এবং সর্বশেষে গ্রেডিং ও প্যাকিং করার আগে আলুকে কনভেয়ার বেল্টের ওপর স্পেকট্রাল ইমেজ স্কেনিং বা আলট্রা সাউন্ড সিস্টেমের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করালে আগে অশনাক্তকৃত হলোহার্ট আক্রান্ত আলু শনাক্ত করে তা বাতিল করা যায় এবং হলোহার্ট ফ্রি কনসাইমেন্ট বিদেশে রফতানি করা সম্ভব। প্রক্রিয়াটি সচল করতে অতিরিক্ত মেশিন দুটো স্থাপন করতে ৩০-৩৫ লাখ টাকা খরচ হবে কিন্তু যথাযথ চালু থাকলে রফতানির সমস্যাটি দূর করা যাবে।

তবে রফতানির ধারাবাহিক স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হলে একটি সংগঠিত সরবরাহ শিকল তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে, তাতে ফসল উৎপাদনের কাজটি অবশ্যই চুক্তিবদ্ধ বা উদ্যোক্তা চাষীর মাধ্যমে করতে হবে, তা না হলে ট্রেসিবিলিটির নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অনেক রফতানিকারক আছেন, যারা কনট্রাক্ট ফার্মিংয়ের বিপক্ষে, হয়তো তাদের এ সম্পর্কে নেতিবাচক অভিজ্ঞতা আছে, তার পরও চুক্তিবদ্ধতার বিকল্প নেই। তাছাড়া উত্তম কৃষিচর্চার নিশ্চয়তা রফতানির জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, তার জন্যও চুক্তিবদ্ধতা দরকার। এটি বাস্তবায়নে সমবায়ভিত্তিক চাষ প্রবর্তন করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে জাপান বা কোরিয়ার এগ্রিকালচার মডেলটি বাংলাদেশে অনুসরণ করতে পারি, সে মডেলে চুক্তির লেনদেনের কাজটি ব্যাংক সম্পাদন করে, আর কৃষক তার পণ্য স্থিরীকৃত মূল্যে উৎপাদনের সময় কিছু অংশ অগ্রিম পান, মৌসুম শেষে পণ্যের দাম সরাসরি তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যায়। এতে সবাই বিজয়ী থাকে।

বাংলাদেশে কৃষির উন্নয়ন অভূতপূর্ব, প্রতি বছর কোনো না কোনো ফসল উৎপাদনে রেকর্ড করছে। যেমন এ বছর পেঁয়াজ উৎপাদনে পৃথিবীতে বাংলাদেশ তৃতীয়; যাহোক আলু উৎপাদনে আমরা সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত এবং উদ্বৃত্ত পণ্য বিদেশে বিক্রয় করতে হবে। বিক্রয় করার জন্য উপযুক্ত বাজার দরকার, যেখানে উপযুক্ত মূল্যে বিক্রয় করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। বর্তমান বাজার মালয়েশিয়ায় প্রতিযোগিতা করে কীভাবে বাংলাদেশের শেয়ার বাড়ানো যায়, সংশ্লিষ্টদের সেদিকে নজর দেয়া দরকার। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব বাজারের বাংলাদেশের আলু বিক্রি করার সম্ভাবনা আছে, সেখানে রফতানির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। যেহেতু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সব আলু রফতানি হচ্ছে সেজন্য চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক প্যাক হাউজ স্থাপন করতে হবে, এতে রফতানিকারকরা সুবিধা বেশি পাবেন। এছাড়া বন্দরে আলু রফতানির ক্ষেত্রে জাহাজে কনটেইনার স্পেস অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। অন্য বন্দর দিয়ে রফতানির জন্য বন্দরভিত্তিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে খুলনার বন্দরটিও সচল থাকবে। রফতানি বৃদ্ধির জন্য আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের এখনই উপযুক্ত সময়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সক্ষমতা বাড়ানো অতিজরুরি।

 

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর