গত কয়েক দিনে মিয়ানমারের নিক্ষেপ করা বেশ কয়েকটি মর্টার শেল বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে পড়েছে। বাংলাদেশের আকাশসীমায় বারবার ঢুকে পড়ছে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার ও বিমান। এরই মধ্যে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের দিন কাটছে চরম আতঙ্কে। সীমান্তজুড়ে বিরাজ করছে থমথমে অবস্থা। সেখানে সীমিত করা হয়েছে লোক চলাচল। পরিবারগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ক্রমেই এর বিস্তৃতি বাড়ছে। সীমান্তে নতুন সেনাসমাবেশ, দৃশ্যত উসকানিমূলক গুলিবর্ষণের ঘটনার সঙ্গে প্রাথমিকভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে অকার্যকর করা এবং মিয়ানমার থেকে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করার কৌশলের যোগসূত্র নাকচ করা যাবে না। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির অবসানে বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে তার বহুমুখী কূটনীতি আরো বাড়াতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই মিয়ানমারের বর্বরতা ও উগ্রবাদের বিপরীতে বাংলাদেশ মানবিকতা দেখিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সংকট মোকাবেলার চেষ্টা করছে। এর পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বদলে নতুন করে এসব উসকানি গ্রহণযোগ্য নয়। মিয়ানমারকে এখনই থামাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা উচিত।

রোহিঙ্গা সংকটের শুরুর দিকেও মিয়ানমার বেশ কয়েকবার সীমান্তে উসকানি দিয়েছে। বাংলাদেশ ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। এখন আবার তারা বাংলাদেশের ভেতরে মর্টার শেল এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুড়ছে। এ পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। পরিস্থিতি দেখে এখন পর্যন্ত যা বোঝা যাচ্ছে তা হলো, মিয়ানমারের গোলা নিক্ষেপ ও অন্যান্য তৎপরতার লক্ষ্য বাংলাদেশ নয়। সীমান্তরক্ষীসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য হলো, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযান চালাচ্ছে দেশটির বিদ্রোহী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে। উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ বিষয়টি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ। এ সংঘাতে বাংলাদেশ জড়িয়ে পড়তে পারে না। তবে এ প্রশ্নও সংগত যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধাবস্থার খেসারত কেন বাংলাদেশকে দিতে হবে? হতে পারে, এটি মিয়ানমারের একটি ফাঁদ। তারা বাংলাদেশকে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার জন্য উসকানি দিচ্ছে। জড়িয়ে পড়লেই মিয়ানমারে বসবাসরত বাকি রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে পারে। হতে পারে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেটাই চাচ্ছে। তারা এ ধরনের কোনো ফাঁদ পেতে থাকলে এবং তাতে বাংলাদেশ পা দিলে সেটা নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে। তাই এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বারবার বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান এবং সমাধানের জন্য বক্তব্য তুলে ধরেছেন। অনেক দেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিলেও ভূরাজনীতির কারণে অনেক দেশ এ ব্যাপারে বিরত থেকেছে। এর মধ্যে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বিজিপির ব্যাপক সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মর্টার শেল নিক্ষেপের ঘটনায় সীমান্তরেখায় জড়ো হচ্ছে লাখো রোহিঙ্গা। সীমান্তে মিয়ানমারের মর্টার শেল নিক্ষেপ, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা, যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি—এটাকে আগ্রাসন হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আন্তরিক ভূমিকাও জরুরি। বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় এখন চীন ও ভারতকে গুরুত্বের মধ্যে নিতে হবে। দেশ দুটিকে কাজে লাগাতে পারলে মিয়ানমারের অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মর্টার শেল নিক্ষেপের বিষয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে মিয়ানমারের এসব কর্মকাণ্ড যে বন্ধুত্বের নিদর্শন নয় সেটি দেশটির রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে চলমান স্থলযুদ্ধ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সীমান্তে টহল বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বৃদ্ধি করেছে। বিজিবি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাতের ওপর নজর রাখছে ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ সব সময় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। পাশাপাশি অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতদের অবহিত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। এসব উদ্যোগ আরো জোরালো করা প্রয়োজন।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাংলাদেশ কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। এরপরও বাংলাদেশ পাঁচ বছর ধরে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট ধীরে ধীরে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে উঠছে। চলমান এ ধরনের উসকানিমূলক ঘটনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি নষ্ট করে, যা কারো কাম্য নয়। মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটাই কূটনীতির অংশ হওয়া উচিত। এমনিতেই বাংলাদেশ ১১ লাখের বেশি মিয়ানমারের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, যা আমাদের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফেরত তো নিচ্ছেই না, উল্টো বাংলাদেশ সীমান্তে তাদের নিক্ষেপ করা মর্টার শেল ও গোলা এসে পড়ছে। মিয়ানমারের এ তৎপরতা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক জটিল আকার ধারণ করবে। তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কূটনৈতিক পন্থায় এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। সেটি যেমন মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে হতে পারে, তেমনি জাতিসংঘের কাছে সহায়তা চাওয়ার মাধ্যমেও হতে পারে। মধ্যস্থতার জন্য বৃহৎ শক্তিগুলোর কাছে সহায়তাও চাইতে পারে বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা প্রয়োজন। আমরা আশা করব, ভবিষ্যতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করবে এবং তাদের নিক্ষেপ করা মর্টার শেল বা গোলা যাতে বাংলাদেশ সীমান্তে এসে না পড়ে, সে বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রাখবে।

মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক দেশগুলোকে আরো আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালাতে হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে আসিয়ান, চীন, রাশিয়া ও জাতিসংঘকে মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণ সংঘাত বন্ধে এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত যেন আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে দেখা না দেয় সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে মিয়ানমার আমাদের উসকানি দিতে চায়, বাংলাদেশ এর জবাবে কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে সহিষ্ণুতা প্রদর্শন ও সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক বাহিনীর বাড়াবাড়ির কারণে শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরেই নয়, বরং গোটা অঞ্চলের শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত দ্রুত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।