গত ৭ অক্টোবর হামাসের বর্বর গণহত্যা এবং পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে বিশ্ব অর্থ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় চারটি ভূরাজনৈতিক দৃশ্যকল্পের সূচনা করেছে। এমন ধরনের পরিস্থিতিতে যেকোনো আশাবাদই ভুল প্রপঞ্চ হিসেবে হাজির হতে পারে।
প্রথম দৃশ্যকল্প যদি কল্পনা করি, হয়তো যুদ্ধটা কেবল গাজাতেই সীমাবদ্ধ রইল, ছোটখাটো ঝামেলা ছাড়া প্রতিবেশী দেশে গড়াল না। প্রকৃতপক্ষে, বেশির ভাগ আঞ্চলিক শক্তিই চাচ্ছে যেকোনোভাবে উত্তেজনা যেন এড়ানো যায়। ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) গাজা অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে হামাসের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। এতে বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের সংখ্যাও বেড়েছে। অঞ্চলটিতে অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক স্ট্যাটাস ক্যু-ই টিকে থাকছে। সব মহল থেকে সমর্থন হারিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু হয়তো দায়িত্ব ছাড়বেন কিন্তু দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানে আস্থা রাখা ইসরায়েলি জনমতও সংকুচিত হয়ে পড়ল। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে কড়া অবস্থান বহাল রইল এবং সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়াও আটকে গেল। ইরান এ অঞ্চলে একটি অস্থিতিশীল শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
প্রথম এ দৃশ্যকল্পের অর্থনৈতিক এবং বাজারের প্রভাব হালকা। জ্বালানি তেলের দাম অল্প অল্প করে যেভাবে বাড়ছিল তা ব্যাহত হবে। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি উত্তোলন ও সরবরাহ তেমন কমবে না। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার অস্থিতিশীল ভূমিকার জন্য ইরানের তেল রফতানি আটকে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে এ রকম কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার সম্ভাবনাও কম। বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি এমনিতেই মন্দায় ধুঁকছে। এর ফলে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরো গভীর করবে।
এদিকে ইসরায়েল ভয়াবহ কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য মন্দার মুখোমুখি হতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে এবং যুদ্ধসৃষ্ট অনিশ্চয়তায় ইউরোপের অর্থনীতিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ব্যবসায় আস্থা ও খানা ব্যয় কমতে পারে। উৎপাদন হ্রাস, ব্যয় সংকোচন ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ায় ইউরোপীয় অর্থনীতিগুলো বর্তমানের শ্লথগতি থেকে হালকা মন্দার দিকে যেতে পারে।
দ্বিতীয় দৃশ্যকল্পে, গাজার যুদ্ধ শেষে আঞ্চলিক স্বাভাবিকীকরণ এবং শান্তির পথ প্রশস্ত হলো। অনেক বেশি বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ছাড়াই হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি অভিযান সফল হলো। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ কিংবা আরব বহুজাতিক কোয়ালিশনের মতো কোনো মধ্যপন্থী গ্রুপ গাজা উপত্যকার দায়িত্ব নিল। প্রায় সব মহলের সমর্থন হারিয়ে পদত্যাগ করল নেতানিয়াহু। মধ্য ডানপন্থী কিংবা মধ্য-বামপন্থী কোনো সরকার গঠন হলো, যারা ফিলিস্তিন সংকট সুরাহায় জোর দিল এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে এগোল।
নেতানিয়াহুর মতো করে ইসরায়েলের নতুন সরকার হয়তো ইরানে শাসকগোষ্ঠীর পতনের ব্যাপারে গোড়া অবস্থান নেবে না। এর ফলে হয়তো সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে তেহরান। এর বিনিময়ে একটি পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার ধকল কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবে তারা। আপাত এ স্থিতিশীলতায় ইরান তখন জরুরি প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে মনোনিবেশ করার ফুরসৎ পাবে। স্পষ্টতই, এমনতর দৃশ্যকল্পে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে খুব ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে।
তৃতীয় দৃশ্যকল্পে, পরিস্থিতি একটি আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিল, যাতে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও খুব সম্ভব ইরানও যোগ দিল। এটি বিভিন্ন উপায়ে ঘটতে পারে। হামাস নির্মূলের পরিণতির আশঙ্কায় গাজায় অভিযান থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিল ইরান। অথবা হিজবুল্লাহর কাছ থেকে সম্ভাব্য আক্রমণ আসার আগেই বড় আকারের হামলা চালিয়ে দিল ইসরায়েল। তারপর সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে যেসব ইরান সমর্থিত প্রক্সি যোদ্ধারা রয়েছে তারা মোক্ষম অস্ত্র পেল। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সমর্থিত বলয়কে অস্থিতিশীল করার সুযোগকে তারা লুফে নেবে।
যদি ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একটি পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইসরায়েল খুব সম্ভব মার্কিন লজিস্টিক সহায়তায় ইরানের পারমাণবিক এবং অন্যান্য স্থাপনার ওপর হামলা চালাবে। সর্বোপরি, হামাস ও হিজবুল্লাহকে অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণে ব্যাপক সম্পদ ব্যয় করা ইরান আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে পারমাণবিক সক্ষমতা কয়েক ধাপ বাড়িয়ে নিতে চাইবে।
ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে বোমা হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি তেল উত্তোলন ও রফতানি কয়েক মাসের জন্য ব্যাহত হবে। এতে জ্বালানি তেলের বাজারে ১৯৭০ দশকের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। বিশ্বব্যাপী স্থবিরতা (ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং নিম্ন প্রবৃদ্ধি) দেখা দেবে, পুঁজিবাজারে বিপর্যয় নামবে, বন্ড বাজারের ইল্ড কমবে। অনেকেই তখন স্বর্ণের মতো নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকবে। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীন ও ইউরোপে অর্থনৈতিক ধকলটা বেশি পড়বে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে জ্বালানির নিট রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বড় অংকের মুনাফায় ভর করে ভোক্তা পর্যায়ে ভর্তুকি দিতে পারবে।
চতুর্থ দৃশ্যকল্পে, সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল এবং ইরানে শাসকগোষ্ঠীর পতন হলো। যদি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ করেই বসে তাহলে তারা স্রেফ পারমাণবিক স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সামরিক ও বেসমারিক কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন স্থাপনায়ও আক্রমণ শানাবে এবং ইরানের নেতারা এর বাইরে থাকবেন না। শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়ার স্থলে সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির মতো মধ্যপন্থী কারো পেছনে দাঁড়াতে পারে ইরানের সাধারণ জনতা। নৈতিকতা-পুলিশের কড়া পদক্ষেপের কারণে গত বছর থেকেই ফুঁসে আছে তারা।
বিদ্যমান শাসকগোষ্ঠীর পতনের ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ খুলবে ইরানের। এতে হয়তো বিশ্ব একটি বৃহত্তর আর্থিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে পড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আসবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা করবে।
প্রতিটি দৃশ্যকল্প কতটা সম্ভাবনাময়? আমি মনে করি স্ট্যাটাস ক্যু বা স্থিতাবস্থা বিদ্যমান থাকবে তার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। সংঘাত-পরবর্তী সময়ে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতির সম্ভাবনা ১৫ শতাংশ। সংঘাত আঞ্চলিক পর্যায়ে ব্যাপৃত হওয়ার সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ। আঞ্চলিক সংকটের ইতিবাচক বা সুখময় সমাপনের সম্ভাবনা মাত্র ৫ শতাংশ।
সুখবর হচ্ছে, সংঘাতটি অঞ্চলব্যাপী যে ব্যাপৃত হবে না তার সম্ভাবনা ৬৫ শতাংশ। এতে অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকিও সীমিত কিংবা তা থাকবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। যা-ই হোক, খারাপ খবর হলো যে বাজারগুলো বর্তমানে একটি আঞ্চলিক সংঘাতের জন্য শুধু ৫ শতাংশ সম্ভাব্যতা দেখছে। যারা একটু বাস্তবসম্মত হিসাবনিকাশ করছে তাদের কাছে এ সম্ভাব্যতা ৩৫ শতাংশ।
বাজারের এ ধরনের আত্মতুষ্টি বিপজ্জনক। বৈশ্বিক প্রভাবের বিষয়টি আমলে নিলে তিনটি দৃশ্যকল্প মিলিয়ে ঝুঁকির সম্ভাবনা কিন্তু ৮৫ শতাংশ। সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পরিস্থিতিতে বাজার এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে শুধু হালকা ও স্বল্পমেয়াদি অভিঘাত পড়তে পারে। কিন্তু একটি অস্থিতিশীল স্ট্যাটাস ক্যু বহাল থাকলে তা যেকোনো পরিস্থিতিতে নতুন সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে।
আপাতত বাজারের প্রত্যাশা হয়তো সাময়িক ক্ষয়ক্ষতি। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেতেই তারা ভূরাজনৈতিক সংকটের ভুল মূল্যায়ন করেছে। এমনটা ফের ঘটলে আমাদের অবাক হওয়া যাবে না।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
নুরিয়েল রুবিনি: নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক; সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ফিনটেক-বিষয়ক কোম্পানি অ্যাটলাস ক্যাপিটাল টিমের মুখ্য অর্থনীতিবিদ
ভাষান্তর: নূশরাত জাহান সিনথিয়া










