পেঁয়াজ আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য। আমাদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে পেঁয়াজ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। দেশে পেঁয়াজের প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি এ সুযোগে পেঁয়াজের বাজারেই সবচেয়ে বেশি অস্থিতিশীলতা দেখা যায়। বিশেষ করে নিকট অতীতেই পেঁয়াজের মূল্য রীতিমতো আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে। এর কারণ হিসেবে সে সময় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির বিষয়টি উঠে আসে। তখন ভারত পেঁয়াজ রফতানিতে সাময়িক সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।
খুব স্বাভাবিকভাবেই এ রকম পরিস্থিতির পর ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার কথা ভেবে সরকার পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে কৃষককে নানা ভর্তুকি দিতে থাকে। ফলে সম্প্রতি পেঁয়াজের স্থানীয় আবাদ, উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ ভালো থাকায় ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানিও কমেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বাড়ায় পেঁয়াজের দামও কমতির দিকে রয়েছে। আসন্ন রমজানেও বাজারে পেঁয়াজ সরবরাহে কোনো ঘাটতি হবে না ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের প্রতি জোর দিচ্ছেন। যদিও পেঁয়াজের ফসলোত্তর ক্ষতি অনেক বেশি হওয়ায় বর্তমানেও কিছু পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। তবে তা আগের তুলনায় কম।
পেঁয়াজ উৎপাদনে সাফল্য নিঃসন্দেহে আমাদের অনন্য এক অর্জন। এক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেলেও আমাদের দেশের বাজারে তার প্রভাব নেই। পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হওয়ায় এখন কৃষকরাই পেঁয়াজ আমদানি না করতে অনুরোধ করেন। এছাড়া কৃষি বিশেষজ্ঞরাও বলছেন আমদানি করা পেঁয়াজের চেয়ে দেশী পেঁয়াজের সংরক্ষণযোগ্যতা বেশি। যে কারণে দেশের পেঁয়াজ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। অন্যদিকে দেশী পেঁয়াজের স্বাদ, গন্ধের তুলনা হয় না। যেহেতু দেশে এখন উৎপাদন বেড়ে গেছে, সে হিসেবে কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই পেঁয়াজ আমদানি থেকে বিরত থাকা উচিত।
কৃষিক্ষেত্রে যেকোনো অর্জনই আমাদের আশাবাদী করে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ, সে হিসেবে শিল্পায়নের প্রসারের এ যুগেও কৃষিতে যখন উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসে, সেটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এ সাফল্যের হার ধরে রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে কোনো দুর্যোগজনিত কারণ, সংরক্ষণে অসুবিধা বা অন্য কোনো সমস্যার উদ্ভবের বিষয়টি মাথায় রেখেই আগামীর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে ২০১৯ সালে যে ভোগান্তির মুখোমুখি আমাদের হতে হয়েছে, সেটিকে একেবারেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। তাই এ সাফল্যের সময়েও সতর্ক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যদিকে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে পেঁয়াজের দামে যেন কারসাজি না হয়, রমজান মাসে বাজার যেন স্থিতিশীল থাকে, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় অপেক্ষাকৃত কম দামে হলেও যেন সব শ্রেণীর জনগণের কাছে পেঁয়াজ পৌঁছে দেয়া যায়, সেজন্য প্রয়োজনে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে হলেও পেঁয়াজ বিক্রি করা দরকার। উল্লেখ্য, আমদানিনির্ভরতার কারণে জোগানের অভাবে গত বছর টিসিবির কার্ডে পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করতে হয়েছিল। তাছাড়া ২০২০ সালে প্রথম সারির ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রির সুফল পাওয়া গেছে। পেঁয়াজ পচনশীল দ্রব্য হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন মজুদ করে রাখা যায় না। তাই এটির সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে হবে।
পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকদের পেঁয়াজ সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এর বাজারমূল্য। দাম কম হওয়ায় অতীতে ভারতীয় পেঁয়াজের চাহিদা বেশি ছিল বলা যায়। কিন্তু পেঁয়াজের মতো কৃষিপণ্য আমদানি না করে দেশের কৃষকদের উৎপাদিত পেঁয়াজ বেশি দামে কেনা হলে তার ফলাফল সুদূরপ্রসারী হবে। ন্যায্য দাম পেলে কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদনে আরো উৎসাহী হবেন। কৃষককে অবশ্যই উৎপাদন খরচ অনুযায়ী মূল্য দিতে হবে। পেঁয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানি করতে পারলে তা আমাদের অর্থনীতিতেও নতুন বাঁক এনে দেবে। কারণ আমদানিকারক দেশ থেকে রফতানিকারক দেশে উন্নীত হলে সেটি যেকোনো দেশের জন্যই ইতিবাচক।
ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি কমে এলেও এটি এখনই হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। তবে আমাদের সেদিকে এগোনো উচিত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিচ্ছেন। এতদিন ভারতের পেঁয়াজের কারণে বাজার স্থিতিশীল থাকত, এখন দেশী পেঁয়াজ বেশি উৎপাদনের ফলে বাজার স্থিতিশীল থাকছে, যা আমাদের দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ‘স্বদেশী পণ্য, কিনে হও ধন্য’ এমন উক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের এখনই বোধ হয় উপযুক্ত সময়। দেশের নদীর মাছ, মুরগি, দেশী খামারের গরু যেমন আমাদের জন্য উপাদেয়, ঠিক তেমনি রসনা বিলাসে দেশী পেঁয়াজেরও কদর উপলব্ধি করতে হবে। তাছাড়া দেশী পেঁয়াজের ঝাঁজও বেশি, এ স্বাদ ভারতের পেঁয়াজে পাওয়া যায় না। তাই মূল্য বেশি দিয়ে হলেও যদি দেশী পেঁয়াজ খাওয়া হয়, তাতে আখেরে আমাদের কৃষকই বেশি লাভবান হবেন।
মাত্র কয়েক বছর আগেই এ পেঁয়াজ জাতীয় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভারত হঠাৎ করে সাময়িক সময়ের জন্য রফতানি বন্ধ ঘোষণা করায় আমাদের তখন পেঁয়াজ উৎপাদন নিয়ে ভাবতে হয়েছে। সে সময় পেঁয়াজ উৎপাদন কম হওয়ার পেছনে ভালো বীজ না পাওয়ার কারণও দেখানো হয়েছিল। ফলে পরবর্তী সময়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি সার, বীজ ও কীটনাশক দিয়েছেন। যার ফলাফল বর্তমানে দেখা যাচ্ছে। এভাবে কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছেন, এটিও আমাদের জন্য স্বস্তিকর। কেননা কৃষকরা প্রশিক্ষণ এবং ভালো সার ও বীজের অভাবে উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারেন না—এমন অভিযোগ অতীতে উঠে এসেছিল।
যা-ই হোক, শীতকালীন ফসল এবং দেশে শীত কমে যাচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে পেঁয়াজের উৎপাদন নিয়ে যে শঙ্কা ছিল, সেটি পাশ কাটিয়ে আমরা এখন পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে এগোচ্ছি। এ অবস্থায় পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের প্রতি যে একক উৎস নির্ভরতা ছিল, তা উতরে যাওয়া কৃষি খাতে সাফল্যের উদাহরণই বটে। আমরা প্রত্যাশা করি, দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক।










