ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ও বণিক বার্তাকে এ ধরনের অসাধারণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের জন্য শুরুতে ধন্যবাদ জানাই। আজকের সেশনের সম্মানিত প্যানেলিস্টদের প্রতিও রইল আমার শ্রদ্ধা। আজকের সেশনে উত্থাপিত বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আমি অল্প করে বলার চেষ্টা করব। আপনারা জানেন, বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। ফলে আমরা এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যা অতীতের অভিজ্ঞতার চেয়ে ভিন্ন। এ পরিবর্তন অবশ্যই নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়েও হাজির হচ্ছে। আমাদের নতুনভাবে সবকিছু করতে হবে।
এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি হচ্ছে, আমাদের বিদেশী সাহায্যনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে বাণিজ্যনির্ভর হওয়ার দিকে জোর দিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দাতা ও ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সাহায্যের শর্তগুলো খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পরে সময় থাকলে এ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করব। বাণিজ্যের কথা যদি বলি, আমাদের রফতানি বাজার আরো বিস্তৃত করা উচিত। কিন্তু বিস্তৃত রফতানি বাজারে প্রবেশের পথ বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শর্তগুলো কেবলই যদি অর্থনৈতিক হতো তাহলে সেগুলো বোঝাপড়া করে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া যেত। কিংবা সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা যেত। কিন্তু শর্তগুলো অর্থনীতির বাইরের অনেক প্যারামিটারের ওপর নির্ভর করছে, যা পরিমাপ করা কঠিন। এর স্বরূপ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট মতামত বা রায় দেয়া দুষ্কর। এমন একটি ইস্যু হচ্ছে গণতন্ত্র। অন্য যে কারোর মতো আমরা গণতন্ত্রকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আমরা আমাদের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছি। গণতন্ত্র মানে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মনে করতেন, এ অধিকার শুধু নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে সীমিত নয় বরং এর প্রয়োগ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপৃত। কিছুটা জটিল এ কনসেপ্ট বা ধারণা পরিমাপের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্যারামিটার নেই।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের ওপর নজর দিতে হবে। বেসরকারি খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। আর বেসরকারি খাত প্রসারিত হলে সরকার অধিক কর আহরণ করতে পারবে। এতে সরকারি ব্যয় নির্বাহ এবং কল্যাণমুখী বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব হবে। এ কারণে বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। সরকারকে বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ ও সম্পদের সঠিক ব্যবহারে সহায়তা করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও আরো দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
আমরা যখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে চলেছি তখন বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ছাড়ে ঋণ পাওয়ার সুযোগ হারিয়ে ফেলব। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এরই মধ্যে ছাড়ে ঋণ পাওয়ার সময়কাল বাড়াতে অনুরোধ করেছে। যা-ই হোক, ১৯৯৬ সালের শেষের দিক থেকে আমরা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ক্যাটাগরিতে ঋণ গ্রহণ সক্ষমতার দিক থেকে মিশ্র দেশে (ব্লেন্ড কান্ট্রি) পরিণত হয়েছি। বিশ্বব্যাংকের ক্যাটাগরিতেও আমাদের অবস্থান মিশ্র দেশের ক্যাটাগরিতে। আমরা মিশ্র দেশের ক্যাটাগরিতে অবস্থানের ফলে এ ঋণদাতাদের কাছ থেকে এখনো ছাড়ে ঋণ পাব। বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য ছাড়ে ঋণ নিতে না পারলে গড়পড়তা ব্যয় বেড়ে যায়। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) ঋণদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা দাবি করছে, এখন পর্যন্ত বিশ্ববাজারে ক্রিয়াশীল বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর সর্বোত্তম চর্চাগুলো অনুসরণ করবে। এ সংস্থা দুটো কো-ফাইন্যান্সিং ও প্যারালাল ফাইন্যান্সিংসহ বিভিন্নভাবে অর্থায়ন করে যাচ্ছে। আমি মনে করি, এআইআইবি ও এনডিবি এ নীতিই অনুসরণ করবে, যাতে বিনিয়োগকৃত অর্থের নিরাপত্তা থাকে ও ভালো সুদ পাওয়া যায়। অন্যান্য বহুপক্ষীয় ঋণদাতাদের মতো তারা যদি ঋণ দিতে না পারে তাহলে তাদের পোর্টফলিও সম্প্রসারণ হবে না।
এখানে লক্ষণীয় যে ঋণদাতা হিসেবে এআইআইবি ও এনডিবি উভয়ই অবকাঠামো বিনিয়োগে জোর দিচ্ছে। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাদের বড় আকারের ফারাক রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন এবং সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু অন্য ঋণদাতারা অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য জোর দিচ্ছে। তাদের যুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়নে যেসব বাধা রয়েছে তা দূর করা না গেলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে না। এ কারণে বিনিয়োগ হলেও সেখান থেকে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অবকাঠামো উন্নয়নে বাধাগুলো সরিয়ে ফেলা গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে চীন খুবই বুদ্ধিমান ও বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ রফতানি উদ্বৃত্ত থাকার কারণে চীন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চীন যাতে এ উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ করতে পারে সেজন্য তাদের বাজার প্রয়োজন। এটা তারা প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ করে কিংবা ঋণ দেয়ার মাধ্যমে করতে চায়।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু তার মানে কি এই যে যতটুকু চায় ততটুকু নেবে নাকি যে ঋণের অফার সামনে থাকে তা নেবে? এক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের টেকসই ঋণ কাঠামো (ডেট সাসটেইনেবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক) রয়েছে। কোনো দেশের ঋণ গ্রহণের সীমা নির্ধারণ করা হয় এ কাঠামোর মাধ্যমে। তারা সময়ে সময়ে এ কাঠামোর সংস্কার করে থাকে। অনেক দেশকে তারা সতর্ক করে দেয়, যেন তারা আরো বেশি ঋণ না নেয়। অধিক ঋণ সংশ্লিষ্ট দেশের স্বার্থে ভালো নাও হতে পারে।
গত তিন-চার বছরে ঋণ গ্রহণ সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে মাঝারি স্তরে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। আর বাংলাদেশের ঋণ গ্রহণের সীমাবদ্ধতা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। আমাদের সংকটের একটি হলো রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ও অন্যটি রফতানি আয়ের স্বল্পতা। তবে বাংলাদেশ যদি রফতানি ও রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারে তাহলে আমাদের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতাও বাড়বে। এ মুহূর্তে আমরা যে একেবারে তলানিতে অবস্থান করছি বিষয়টি এমন নয়। আবার এমন পরিস্থিতিতেও নেই যেখানে আমরা ঋণ বিপর্যয়ে (ডেট ডিস্ট্রেস) পড়তে পারি। ঋণ বিপর্যয় সীমার অনেক ওপরে রয়েছে বাংলাদেশ। যার কারণে আরো বেশি পরিমাণে ঋণ নিতে পারছে। কিছু লোক আছে যারা ঋণের সীমা নিয়ে, বৃহদংকের ঋণ পরিশোধ নিয়ে শোরগোল করছে। আমি এখানে যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি তা হলো বিনিয়োগ। যদি বিনিয়োগ ভালো হয় তাহলে গৃহীত ঋণ সহজে পরিশোধ করা যাবে। আমরা যদি অর্থায়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিই তাহলে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাও (ওইসিডি) এখন তাদের নীতিমালায় সংশোধন এনেছে। তারা সুদের হার বাড়িয়েছে, মেয়াদকাল কমিয়েছে এবং মধ্যম আয়ের দেশের জন্য বাট্টা বা ডিসকাউন্ট রেট বাড়িয়েছে। মধ্যম আয়ের দেশের জন্য ৫ শতাংশ ও নিম্ন আয়ের দেশের জন্য ১০ শতাংশ বাট্টা বা ডিসকাউন্ট নির্ধারণ করেছে। এ ঋণ গ্রহণের শর্তাবলি কঠিন হয়েছে এবং মেয়াদকাল দাঁড়িয়েছে ২০ বছরে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কঠিন হলেও বাংলাদেশ ঋণ নিতে পারবে। আমরা যদি রফতানি আয় ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করতে পারি তাহলে ঋণ গ্রহণ সীমা বাড়তে পারে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। সংকট নিরসনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রয়াসের প্রশংসা করি, সাধুবাদ জানাই। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে ত্বরিত অনেক পদক্ষেপ নেয়া আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা সংকট আমাদের জন্য বোঝা হিসেবে হাজির হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার যে অন্তত মানবিকভাবে রোহিঙ্গা ইস্যু মোকাবেলা করছে এটা সব মহলকে স্বীকৃতি দিতে হবে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান ইতিবাচক ছিল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিক নেতৃত্ব এখানে প্রশংসনীয়। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, নিজ দেশে ফেরার পরিবেশ সৃষ্টির আগ পর্যন্ত তারা যেন থাকার জায়গা পায়। এখানেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের পলিসিগত অবস্থানের বিচার করতে যাব না। কিন্তু তাদের প্রয়াসের ফলাফলের দিকে তাকালে কী দেখব? রোহিঙ্গা সংকট বেশ দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং তার চাপ আমরা অনুভব করছি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতিদের নিয়ে কথা উঠেছে। এখানে আমি সরকারের একটি বিশেষ অর্জনের কথা বলতে পারি। সবাই জানেন পার্বত্য চট্টগ্রামে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে টানাপড়েন ছিল। ১৯৯৬-এর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন শান্তিবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যদিও শান্তি একটি আপেক্ষিক বিষয়। শান্তির চাহিদা সতত পরিবর্তনশীল এবং তার পরিমাপকও পরিবর্তনশীল। কিন্তু শান্তি চুক্তির ভালো একটি প্রভাব হলো, ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির ফলে শান্তি বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র সমর্পণ করেছিল। একই সঙ্গে তারা চুক্তির নিয়মকানুন মেনে চলার অঙ্গীকার করে। এটা অবশ্যই উদযাপন করার মতোই ব্যাপার। তবে এ পুরো ঘটনাটির সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার বহির্বিশ্বের কোনো সহায়তা কিংবা হস্তক্ষেপ ছাড়াই এ বিরোধের নিষ্পত্তি করতে সমর্থ হয়েছিল।
আজকের প্যানেল আলোচনায় গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি আবশ্যক। তবে আমাদের বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জন ও বিকাশের দিকে জোর দিতে হবে বেশি। এমন জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যা দেশে বিরাজমান সংকট মোকাবেলায় সহায়ক হবে। বিশেষ করে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও গবেষণায়, যা এ সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভূমিকা রাখবে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দক্ষতাও সমানতালে বৃদ্ধি করতে হবে। যদি প্রযুক্তি এত অগ্রসর হয় যে যা ব্যবহারের সক্ষমতা আমাদের নেই তাহলে তা কাজে আসবে না। আবার প্রযুক্তি যদি অনেক সেকেলে হয় তা ব্যবহারেরও কোনো যৌক্তিকতা নেই।
আলোচনার একেবারে শেষের দিকে চলে এসেছি। এখানে আমি কয়েকটি বিষয় নিয়ে কিছুটা বলতে চাই। প্রথমেই টেকসই ঋণ কাঠামো নিয়ে কিছু বলা যাক। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের মাধ্যমে টেকসই ঋণ কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে চীন। আমি মনে করি চীনের এ কাঠামো বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) টেকসই ঋণ কাঠামোর চেয়ে আরো বেশি সুস্পষ্ট। তবে এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাঠামোটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। কিন্তু চীনের বিআরআই প্রকল্প প্রায় ২৮টি দেশের সমর্থন পেয়েছে। এখানে বিআরআইয়ের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো সেখানে প্রাপ্য ঋণের মেয়াদ ২০ বছর বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ সময়টা কিন্তু ঋণ গ্রহীতাদের কাজে আসবে। যদিও সেখানে ডিসকাউন্ট রেট বেঁধে দেয়া হয়নি। এটা সময়ে সময়ে পরিবর্তন হতে পারে। চীন থেকে গৃহীত ঋণের সমালোচনার জায়গা বলতে গিয়ে শুরুতে বলা হয় এটা ‘বাধ্যতামূলক’ নয়। অন্যভাবে বলতে গেলে ঋণটা ‘নমনীয়’। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ঋণ কাঠামোও তুলনামূলক নমনীয়। প্রত্যেকটি দেশের প্রেক্ষাপট ও পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় ঋণ প্রদান ও ঋণের শর্ত নির্ধারণ করা হয়। গ্রাহকের প্রয়োজন মাথায় রেখে ঋণের পরিমান ও অন্যান্য শর্ত নির্ধারণ করে থাকে তারা। অন্যদিকে চীনের বিআরআই প্রকল্পের মূল কাজের জায়গা হলো পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন, যা মানুষ ও পণ্য স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয়। চীনের গৃহীত রূপকল্পের এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
২০৩০ সালকে সামনে রেখে টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা (এসডিজি) নেয়া হয়েছে। পনের বছর (২০১৬ সাল থেকে শুরু) মেয়াদি এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে বিশ্ব। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিষয়টি জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন নরওয়ের সাবেক এক প্রধানমন্ত্রী (গ্রো হরলেম ব্রুন্ডল্যান্ড, নরওয়ের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক)। ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড কমিশন অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর চেয়ার ছিলেন ব্রুন্ডল্যান্ড। তার নেতৃত্বে ‘আওয়ার কমন ফিউচার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছিল যেখানে টেকসই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদের পর্যাপ্ত জোগান রেখে বর্তমানের চাহিদা পূরণ করা উচিত। অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজের এসডিজি সম্পর্কিত পর্যালোচনা মতে, এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য ও ১৬৯টি নির্দেশক রয়েছে, যেগুলোকে আলাদাভাবে চিন্তা করলে কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। কিন্তু একত্রিত করে ভাবলে এটির একটি পরিপূর্ণ অর্থ দাঁড়ায় এবং বোঝা যায় প্রতিটি দেশের নির্দিষ্ট প্রয়োজন বিবেচনায় লক্ষ্যগুলো নির্ধারিত হয়েছে। পাঁচ-ছয় বছর আগে আয়োজিত একটি সেমিনারে সব উন্নয়নশীল দেশের জন্য কয়েকটি এজেন্ডায় অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামো, কানেক্টিভিটি বা সংযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। আমরা যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন এজেন্ডা দেখি তাহলে এগুলোই দেখতে পাব। এসব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নকারী হাতে গোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশ। সুতরাং বলা যায়, আমরা সঠিক পথেই রয়েছি।
ড. মসিউর রহমান: প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা
[দৈনিক বণিক বার্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের যৌথ আয়োজনে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম দিনে (৫ মে, ২০২৪) রাখা আলোচনায়]
ভাষান্তর: সাবিদিন ইব্রাহিম ও দিদারুল হক










