বাংলাদেশের নীতি প্রণয়নের পরিসর বরাবরই কেতাবি ভাষা, পরিসংখ্যান নির্ভর বক্তব্য এবং পুরনো ধারার রাজনৈতিক বয়ানের ওপর নির্ভরশীল। এমন একটি পরিসরে দাঁড়িয়ে জাইমা রহমান যখন কথা বললেন, তখন এটিকে কেবল একটি নতুন কণ্ঠের সংযোজনই বলা যায় না; বরং এটি একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এই পরিবর্তনের মূলে থাকছে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হওয়া নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রেরণা। জাইমা রহমানের বক্তব্যে আমরা প্রজন্মের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে পাই।
বাংলাদেশের যে কোনো নীতি প্রণয়নের ফোরামে জাইমা রহমানের এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। তবে তার বক্তব্যে কখনোই তাকে 'প্রথমবার' মনে হয়নি। বরং নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সমকালীন বাস্তবতার সংযোগ ঘটিয়ে তিনি যেভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের দিকগুলো তুলে ধরেছেন, তা একইসাথে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা এবং প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করার ইঙ্গিতকে সুস্পষ্ট করে।
জাইমা রহমান যে প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারা কেবল আত্মমর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নেই নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে থাকা দীর্ঘকালের নীরব অসমতার বিরুদ্ধে সমানভাবে সরব। তিনি তার প্রজন্মের এই অনুভূতিকে প্রকৃতিগতভাবেই ধারণ করেন। আমরা তার বক্তব্যে সেই ছাপ দেখতে পেয়েছি। তিনি নারী উন্নয়নকে কেবল শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আইনি পরিসীমাতেই আবদ্ধ রাখেননি; বরং বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দীর্ঘকালের অবচেতন স্বাচ্ছন্দের দিকটিকে উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের নারীরা অবৈতনিক গৃহস্থালি এবং পরিচর্যার কাজের ৮৫ শতাংশ বহন করে থাকে, যার আর্থিক মূল্য জিডিপির প্রায় ১৯ শতাংশ। কিন্তু নারীর এই বিশাল অবদান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রায় অদৃশ্যই রয়ে গিয়েছে। সমাজের গভীরে প্রোথিত এই বৈষম্যকে আমাদের নারীরাও খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের নিয়তি হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। খুব অল্প বয়স থেকেই একটি মেয়েকে পরিবার এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে শেখানো হয়। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। খুব কম সংখ্যক ছেলেকেই শেখানো হয় যে, পরিবারের কাজে অংশগ্রহণ করা একটি যৌথ কর্তব্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কাঠামোগত রূপ নেয় এবং সামাজিক বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এর ফলে নারী উন্নয়নের অগ্রযাত্রা যে গতিতে এগোনোর কথা ছিল, তা অর্জিত হয়নি।
বাংলাদেশের নারীদের এই বাস্তবতাকে তুলে ধরে জাইমা রহমান নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নকে কেবল 'সামাজিক সহানুভূতি' নয়; বরং একটি 'জাতীয় ও অর্থনৈতিক আবশ্যকীয়তা' হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
খুব স্বাভাবিকভাবেই জাইমা রহমানের বক্তব্যে নারী উন্নয়নে তার পারিবারিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে। ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশের নারীদের অগ্রগতির ভিত্তি রচিত হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, নারীদের বাদ রেখে কোনো উন্নয়নই পূর্ণ হতে পারে না। তার সময়েই তৈরি পোশাক শিল্পের বিস্তারের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ নারী প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ পান। এর মাধ্যমে শুধু উপার্জনই নয়, বরং নারীর আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার পথও বিকশিত হয়। জিয়াউর রহমানের এই বিশ্বাসেরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠা।
জিয়াউর রহমানের গড়ে দেয়া এই ভিত্তিকে এগিয়ে নিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। শিক্ষা নারীদের কণ্ঠ দেয়, আত্মবিশ্বাস দেয় এবং পছন্দের অধিকার নিশ্চিত করে। তার নেতৃত্বে মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে মাধ্যমিক শিক্ষা, 'ফুড ফর এডুকেশন' ও 'ক্যাশ ফর এডুকেশন'-এর মতো কর্মসূচির বিস্তার ঘটে যা লক্ষ লক্ষ মেয়েকে স্কুলে ধরে রাখতে সাহায্য করে। বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে 'ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট' এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাধ্যমিক স্তরে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তার এই নীতি আন্তর্জাতিকভাবে একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
জাইমা রহমান জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার এসব নীতি ও পদক্ষেপকে আত্মপ্রচার হিসেবে নয়; বরং একটি মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে গৃহীত এসব উদ্যোগ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, নারীর ক্ষমতায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়; বরং রাষ্ট্রচিন্তার একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকতা, যার সঙ্গে আজকের প্রজন্মের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সংযোগ ঘটানো জরুরি। জাইমা রহমানের বক্তব্যের শক্তিশালী দিক হচ্ছে, নারীর ক্ষমতায়নকে শুধুমাত্র নারীদের দায়িত্ব হিসেবে সীমাবদ্ধ না করা। তিনি এক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট আহবান জানিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধু নীতি আর বিশ্বাস নয়; বরং আচরণ ও নীতির প্রয়োগই প্রকৃত সমতা গড়ে তোলে।
ভবিষ্যতমুখীতা জাইমা রহমানের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। তিনি স্পষ্ট করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে থাকা বাংলাদেশ নারীদের পেছনে রেখে এবং তাদের অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না করে সামনের দিকে এগোতে পারবে না। তার বক্তব্যে উন্নয়নকে কেবল অবকাঠামো বা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা হয়নি; বরং মানুষের সক্ষমতা নির্মাণ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণই কেবল উন্নয়নকে টেকসই করতে পারে। নারীদের শ্রম ও নীরব ত্যাগের ওপর ভর করে যে উন্নয়ন দাঁড়ায়, তাতে নারীদেরকে পূর্ণরূপে অংশীদার করতে পারলেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, ন্যায্য এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হতে পারবে।
ফারহান আরিফ: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল; রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেন্টার (বিএনআরসি)










