চলমান সময়ে বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি আলোচনা হলো এই অতি তাপপ্রবাহ। প্রায় এক মাস ধরে ঢাকাসহ দেশব্যাপী মানুষ অনুধাবন করল প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ। গত এক সপ্তাহ হলো, খানিক বৃষ্টির কারণে সামান্য পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। এ তাপপ্রবাহ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা এবং এর প্রভাবে স্কুল-কলেজ পর্যন্ত সরকার বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এ তাপপ্রবাহের কী কারণ, এর প্রভাবে কীভাবে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী—এমন হাজারো আলোচনা আমরা প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু এ ভয়াবহ তাপ থেকে আমাদের মুক্তি মিলছেই না।
বেশকিছু দিন ধরেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রির ওপরেই থাকছে কিন্তু তা অনুভব হচ্ছে ৪৩ বা ৪৪ ডিগ্রি বা তারও বেশি। আমরা আগে দেখতাম, বাংলাদেশের যে অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকে কিন্তু বর্তমান সময়ে তা পাল্টে গেছে। বইতে পড়েছিলাম নাটোরের লালপুর সবচেয়ে বেশি উষ্ণ কিন্তু এখন তা ছাড়িয়ে রাজশাহী, যশোর, চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলায় উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের সর্বত্র এ তাপপ্রবাহ জনজীবনকে স্থবির করে ফেলছে। সারা দেশে অসংখ্য মানুষও তাপপ্রবাহে মারা গেছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, কেন এ তাপপ্রবাহ?
বিশ্বকে উত্তপ্ত করার মতো হাজারো ঘটনা প্রতিদিন ঘটানো হচ্ছে বলেই জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এবং তার প্রভাবেই এ প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয় কিংবা দুর্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলো তাদের নির্বিচারে ভোগ ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। আজকে তাদের কারণেই আমাদের মতো দেশগুলোর ওপর প্রকৃতির নিদারুণ নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আমরা হারাচ্ছি আমাদের প্রাণ-প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে। উত্তর মেরুর বরফ যেমন এ প্রভাবে গলছে তেমনি সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বেড়ে আমাদের মতো দেশ পড়ছে হুমকির মুখে। এ বৈচিত্র্য হারিয়ে যাওয়ার কারণেই আজ পুরো পৃথিবীকে তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে। গত বছর বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলন হয়ে গেল দুবাইয়ে, কিন্তু এ উপসাগরীয় নগরীটিই জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী নগরীর একটি। এমনকি এ ধরনের সম্মেলনে যে পরিমাণ জ্বালানির ব্যবহার হয় তাও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে কম ভূমিকা রাখে না। অথচ এ সম্মেলনগুলোয় যে ঘোষণা আসে তার বাস্তবায়ন কখনই দেখা যায় না। কারণ উন্নত বিশ্ব তাদের অপরাধের দায় নিতে চায় না, এমনকি তারা কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি থাকে না। এসব সম্মেলন কেবলই মুনাফা ও পুঁজির কারসাজি। যে কারণে গত বছরের সম্মেলনে প্রধান ইস্যু লস অ্যান্ড ডেমেজ থাকলেও আমাদের মতো দেশ জলবায়ু ঝুঁকির সর্বোচ্চ প্রভাবে থাকার পরও তেমন কোনো ক্ষতিপূরণের আশ্বাস পাননি। আর যা দেয়ার প্রতিশ্রুতি তারা দিচ্ছে তার বাস্তবায়ন বিগত দিনেও দেখা যায়নি।
বিশ্বব্যাপী যে ভোগবাদী দর্শন চলছে তার প্রভাব পড়ছে প্রকৃতিসহ মানবজীবনের নানা অংশে। বৈশ্বিক যে পারমাণবিক বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে, তার প্রভাব বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে অন্যতম। এমনকি বিশ্বব্যাপী অধিক উৎপাদনের যে তত্ত্ব তাও ভোগবাদী দর্শন থেকেই উৎসারিত। যে কারণে আজকে বিশ্বকে একটি অমানবিক উৎপাদন যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় অ্যামাজন বন ধ্বংস কিংবা সুন্দরবন যে প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে তা একই সূত্রে গাঁথা। এ সূত্রকে ভাঙতে পারে কেবল সর্বজনীন, সর্বপ্রাণের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে সব প্রাণ ও প্রকৃতির মুক্তির সংগ্রাম নিহিত। আমাদের দেশেও এই একই পরিস্থিতি বিদ্যমান। এখানে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে প্রকৃতি ও পরিবেশকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। রাস্তা নির্মাণের কথা বলে বনভূমি ধ্বংস, নদী দখল, খাল ও জলাশয় দখল, হাওরের বুক চিরে ভয়ংকর রাস্তা, টিলা কেটে হোটেল নির্মাণ কিংবা আলতাদীঘি খননের নামে বনভূমির বিনাশ একই সূত্রে গাঁথা।
বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্র ও তার অধিপতিরা পরিবেশকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি বিষয় হিসেবে দেখে। মনে পড়ে, রাষ্ট্রের একজন কর্তাব্যক্তি পরিবেশবাদীদের সরাসরি বলেছিলেন, আমরা আগে নিজেদের উন্নয়ন করব, তারপর পরিবেশ নিয়ে ভাবব। তার যুক্তি ছিল, ইউরোপ-আমেরিকা আগে নিজেদের উন্নত করেছে এবং পরে পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করেছে। এটা যখন আমাদের মতো একটি উন্নয়নকামী দেশের নীতিনির্ধারকদের ভাবনা হয়, সেখানে একটি পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণকে কিংবা সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ যাতায়াত করাকে কিংবা একটি পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণকে তারা বড় উন্নয়ন হিসেবে দেখবে সেটাই স্বাভাবিক। আর সেই যুক্তিতে তাপপ্রবাহকেও তারা অত বড় সমস্যা মনেই করেন না। তাপপ্রবাহ না দেখলেও তার প্রভাব কিন্তু ভয়াবহ মাত্রায় চলছে। এই যে উন্নয়নকামী ও পরিবেশবিধ্বংসী রাষ্ট্রীয় কলাকৌশল তার প্রভাবেই আজকে আমাদের পরিবেশ, প্রাণ ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। আমাদের শীতে আর শীত দেখা যায় না, বর্ষায় দেখা মেলে না বৃষ্টির, হেমন্ত এসেই বলে যাই—এই হলো আমার ঋতুবৈচিত্র্য। এর ফলে আমাদের কৃষি, উৎপাদন ব্যবস্থাতেও এসেছে মারাত্মক পরিবর্তন।
আমাদের প্রাকৃতিক কৃষিকে দখল করে নিয়েছে রাসায়নিক কৃষিযন্ত্র। অধিক উৎপাদনের ভোগবাদী দর্শনের চাপে আমাদের কৃষকরা তাদের বীজের দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন করপোরেট ও কোম্পানির হাতে। আর রাসায়নিক সার, বিষের প্রভাবেও আমাদের পরিবেশকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে দীর্ঘসময় নিয়ে। আজকে আমাদের বনভূমিকে কেবল ধ্বংস করা হয়নি, তার বদলে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসকারী সামাজিক বনায়ন। যার কারণে প্রকৃতি আমাদের প্রতি সদয় না হয়ে, হয়েছে বিরূপ। শুধু বৃক্ষরাজির কারণে ঢাকা শহরে তেজগাঁওয়ের তুলনায় ধানমন্ডি কিংবা শাহবাগ এলাকার তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কম থাকে। কিন্তু আমরা দেখেছি গত বছর ধানমন্ডি সাত মসজিদের সড়ক বিভাজনের গাছগুলোকে কী নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। যার ফলে আমরা এ বছর দেখছি সেই রাস্তায় কোনো ছায়া নেই, তীব্র তাপ সেই রাস্তায় চলাচলকারী মানুষ অনুভব করছে। একই পরিস্থিতি চট্টগ্রাম কিংবা যশোরের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি। সারা দেশে যেন গাছ কাটার উৎসব শুরু হয়েছে এ সময়ে যখন তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে, গাছ হত্যা নিষিদ্ধ করতে হবে। এটাই তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে।
আমাদের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং এখানে উন্নত দেশগুলোর নেতিবাচক প্রভাব কিংবা জলবায়ু ঝুঁকির তালিকায় আমাদের অবস্থান কি তাও প্রসঙ্গক্রমে আলোচনায় চলে আসছে। আর আমাদের মতো একটি জলবায়ু ঝুঁকিতে অবস্থানকারী রাষ্ট্রের ওপর নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের জীবনেও তার প্রভাবে মাত্রাগত পার্থক্য লক্ষ করা যায়, শ্রেণীভেদে তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাবও ভিন্ন হয়। আমাদের দেশের শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের মানুষ কীভাবে এ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলা করছেন তা পরখ করে দেখাটা জরুরি। সারা দেশে যখন তীব্র তাপদাহ চলছে তখনো কিন্তু আমাদের শ্রমজীবী মানুষ কাজ থেকে রেহাই পাচ্ছে না, পাচ্ছে না নিজেদের সুরক্ষিত রাখার কোনো ব্যবস্থা। এ তাপপ্রবাহের কারণে হিট স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেছে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ আর তাদের মধ্যে শ্রমজীবীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
আমাদের কৃষক, ক্ষেতমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ যখন প্রচণ্ড বিরূপ তাপপ্রবাহে মাঠে কাজ করতে বাধ্য হয় তখন এ দেশের উচ্চবিত্ত অংশের কাছে এ তীব্রতার কোনো প্রভাব কি লক্ষ করা যায়? করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গরম থেকে বাঁচতে কোমল পানীয় কিংবা এসির বিজ্ঞাপনে ঝাঁপি খুলে বসে। এমনকি তাপপ্রবাহের মাত্রাতিরিক্ত আলোচনাতেও রয়েছে করপোরেট বাণিজ্যের কূটকৌশল। এ আলাপের মধ্যেও বিশাল বাণিজ্য লুকিয়ে রয়েছে। বেশি তাপপ্রবাহ মানে বেশি এসি বিক্রি। সেদিন একজন এসি ব্যবসায়ীর মুখ থেকে শুনলাম, তাদের এ বছরের টার্গেট বিক্রি এক মাসেই শেষ হয়ে গেছে। এসি চাইলেও সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ভোগবাদী ও পরিবেশবিধ্বংসী চিন্তা ও দর্শনের বাইরে এসে প্রাণ ও প্রকৃতিকেন্দ্রিক জীবন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল: সাধারণ সম্পাদক, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলন (পরিজা)