উন্নত দেশগুলোয় উন্নয়নশীল অথবা অনুন্নত দেশগুলো থেকে অভিবাসী শ্রমিকরা জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান। বৈশ্বিক মানদণ্ডে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের এ প্রথা বহুকাল চলে আসছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বৈধ পথে যাওয়ার পাশাপাশি অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে সেটি দুঃখজনক। মূলত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দ্রুত আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন এবং দেশে কর্মসংস্থানের ঘাটতির ফলে বিদেশে যাওয়ার এ প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে বৈধ পথে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করার মানসিকতা থাকছে না। এ সুযোগে তৈরি হয়েছে দালাল চক্র, তারা প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ গমনে ইচ্ছুক তরুণদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়ে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আর যারাই সমুদ্রপথে পাড়ি দিচ্ছেন তারা একসময় ভূমধ্যসাগরে হাবুডুবু খেতে থাকেন। অনেকেই ক্ষুধা আর পিপাসার যন্ত্রণায় মারা যান। এমনকি বৈরী আবহাওয়ায় মাঝ সমুদ্রেই সলিল সমাধি ঘটে। আবার অবৈধভাবে বিদেশে গেলে প্রবাসে গিয়েও কাজ খুঁজতে হয়। এছাড়া যেকোনোভাবে কাজে নিয়োজিত হয়ে গেলেও বৈধতা না থাকায় সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার বাংলাদেশকে এসব অবৈধ অভিবাসীকে ফিরিয়ে নিতে বলে। ফলে বৈধভাবে বিদেশে না যাওয়ার ক্ষেত্রে যে অধৈর্য প্রদর্শন করা হয়, এর বিপরীতে অবৈধভাবে বিদেশে গেলে তার ফল মোটেও ভালো হয় না। শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতেই দেশে ফিরে আসতে হয়।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়া অভিবাসী বাংলাদেশীর সংখ্যা অস্বাভাবিক বাড়ছে। দুঃসাহসিক এ যাত্রায় শুধু চলতি বছরই ১৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশী ইতালি পৌঁছেছেন, যেখানে ২০২১ সালে গেছেন ৭ হাজার ৮৩৮ জন। সে হিসেবে আগের বছরের তুলনায় ইউরোপের দেশটিতে সমুদ্রপথে বাংলাদেশী যাওয়ার হার প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।  

ইতালি ইউরোপ মহাদেশের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশটিতে অভিবাসীদের কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। উন্নত জীবনযাপন এবং প্রতিষ্ঠিত জীবনলাভের আশায় প্রবাসে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশীদের পছন্দের তালিকায় ইতালি সবসময়ই শীর্ষে অবস্থান করে। ইতালিতে আগে থেকেই বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের অভিজাত জীবন দেখে বিদেশে গেলে দ্রুত বড়লোক হওয়া যাবে এ আশায় বাংলাদেশীরা যেকোনো উপায়েই হোক দেশটিতে যেতে চান। দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নিরাশ হয়ে বিদেশে যাওয়াকেই অনেকে গন্তব্য ধরে নেন। নিজের পরিবার অথবা স্বজনের ক্ষেত্রে কেউ আগেই বিদেশে অবস্থান করে ভালো উপার্জন করলে সেটিকেই জীবনের স্বপ্ন ধরে নিয়ে বিদেশ গমনকেই জীবনের লক্ষ্য ধরে নেয়া হয়। একবার বিদেশে যেতে পারলে জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, এ আশায় বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ মানুষ ইতালিতে পাড়ি জমাচ্ছেন। যারা বৈধভাবে যাচ্ছেন, তারা সেখানে গিয়ে ভালো কিছু করতে পারলেও অবৈধভাবে ইতালিতে যাওয়া প্রবাসীদের অনেকের ভাগ্যেই সম্মানজনক কর্মসংস্থান জুটছে না। ফলে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে এবং বৈধ প্রবাসীদের জন্যও এটি বিড়ম্বনার বিষয়।

শুধু ইতালি নয়, ইউরোপের সেনজেনভুক্ত ২৬টি দেশেই অবৈধ বাংলাদেশী রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আবার কয়েক বছর ধরে পশ্চিম বলকান অঞ্চলের দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জঙ্গল দিয়ে বাংলাদেশীদের ইউরোপযাত্রার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। মানে যেকোনো উপায়ে বিদেশে যেতে পারলেই ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে

এমন বিশ্বাসে বাংলাদেশীরা বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন।

অথচ বাংলাদেশের তুলনায় সিরিয়া, ইরানসহ আফ্রিকার দেশগুলো থেকে ইতালি যাত্রা অনেক সহজ। এমনকি আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকেও ইতালিতে যাওয়া তুলনামূলক সহজ। অথচ এসব দেশের নাগরিকরাও সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ায় বাংলাদেশীদের চেয়ে পিছিয়ে। আবার সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালিতে অভিবাসী হওয়াদের শীর্ষে মাথাপিছু আয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে থাকা ভারতীয়দের নাম নেই তালিকায়। যদিও বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিবেশী দেশটির জনসংখ্যা আট গুণেরও বেশি। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকেও ইতালিতে অভিবাসী হওয়া জনগণের সংখ্যা অর্ধেকেরও কম।

তাহলে কেন বাংলাদেশের মানুষ ইতালিতে যেতে এত আগ্রহ দেখাচ্ছেন? বাস্তবিকভাবে আমাদের দেশে অর্থনৈতিক উন্নতির কথা বলা হলেও প্রকারান্তরে কর্মসংস্থান সে অর্থে বাড়েনি। তাই জীবিকার তাগিদেই বাংলাদেশীরা ইতালিতে যেতে চান বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন। এজন্য তরুণ সমাজকে বিদেশবিমুখ করতে দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিকল্প নেই। ক্ষেত্রবিশেষে এটাও দেখা যায়, দেশে যে কাজকে অসম্মানজনক মনে করা হয়, বিদেশে সে কাজ বাংলাদেশীরা ঠিকই অনায়াসে করছে। এক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রয়োজনও রয়েছে। কারণ কাজকে কাজ হিসেবে সম্মান করলে যেকোনো বৈধ কাজই জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হতে পারে। এমন মনোভাব রাখলে দেশের কর্মসংস্থানের প্রতিই তরুণদের আস্থা তৈরি হবে। আর প্রবাসে যদি যেতেই হয়, তাহলে বৈধ পথে যাওয়াই সমর্থনযোগ্য। এতে দেশের সুনাম যেমন অক্ষুণ্ন থাকে, তেমনি বিদেশ থেকে শূন্য হাতে ফিরে না আসার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। এজন্য সরকারিভাবে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর যেমন বিকল্প নেই, তেমনি জনগণের সচেতনতাও প্রয়োজন। কার্যত অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার বিষয়টি স্বেচ্ছায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ারই নামান্তর। তাছাড়া যেহেতু সমুদ্রপথে সরাসরি ইতালি যাওয়া সম্ভবও হয় না, সেক্ষেত্রে লিবিয়া উপকূলকে ব্যবহার করে ইতালিতে বেশি যাওয়া হয়। ফলে অবৈধভাবে লিবিয়ায় প্রবেশ করায় দেশটির ডিটেনশন সেন্টারগুলোয় শত শত বাংলাদেশী আটক থাকার ঘটনা এর আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে।

বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে যেকোনো ঘটনাই এখন আলোর মুখ দেখে। তাই ইতালিতে যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগরে মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশীরা বিপদে পড়ছেন, এমন তথ্য দেশটির সরকারের হাতে প্রমাণসহ উত্থাপিত হলে তারা বাংলাদেশকে সতর্ক করে এবং দেশটিতে থাকা অবৈধ অভিবাসীদের ফিরিয়ে নিতে বলে। এটি কার্যত আন্তর্জাতিক বলয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিরও বিষয়। তাই অবৈধ পথে ইতালি না গিয়ে বৈধ পথে দেশটিতে গিয়ে প্রবাসীরা দেশের জন্য রেমিট্যান্স প্রেরণ করুক সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। এতে প্রবাসীদের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না এবং ইতালির সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে। বৈধভাবে শ্রমবাজার অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ইতালির সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় থাকুক সেটিই আমাদের কাম্য। এক্ষেত্রে ইতালি যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশী নাগরিকদের সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবও প্রয়োজন।