বিশ্ববাজারে সারের দাম নিম্নমুখী। ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপির দাম ক্ষেত্রভেদে ২৪-৬২ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এ সময়ই সরকার সারে অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে নয় মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার কৃষক পর্যায়ে দাম বাড়াল। এবারে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এ দাম বৃদ্ধির কারণে বছরে সারের পেছনে ভর্তুকি ব্যয় বাবদ সরকারের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যে টাকাটা আসবে কৃষকের পকেট থেকে। সারা দেশে বোরো মৌসুমের ধান চাষ চলছে, যা চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় মৌসুম এবং এ মৌসুমের উৎপাদনের ওপর দেশে সারা বছরের চালের বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। বেশির ভাগ স্থানেই বোরো ফসল ধান গঠনের পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে খুব বেশি সারের ব্যবহার নেই। ফলে এ মৌসুমে কৃষকের ওপর চাপ না বাড়লেও ভু্ট্টা, সবজিসহ মাঠে অন্য যেসব ফসল রয়েছে সেখানে খরচের চাপ বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে আসার সময়ে দেশে সারের দাম বৃদ্ধির পদক্ষেপ কাম্য নয়। এতে কৃষির উৎপাদনে ও মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়বে।
দেশে যত সার আমদানি হয় তার বড় অংশ আমদানি করে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাকিটা করে শিল্প মন্ত্রণালয়। কৃষি মন্ত্রণালয় বা এর অধীনস্থ সংস্থার সার আমদানিতে অর্থ মন্ত্রণালয় সোনালী ব্যাংককে ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংককে ৮ হাজার কোটি টাকার ক্রেডিট গ্যারান্টি দিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ কৃষি মন্ত্রণালয় কোনো ধরনের অর্থ না দিয়েও এ দুই ব্যাংকের মাধ্যমে ২৪ হাজার কোটি টাকার সার আমদানি করতে পারবে। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়লেও এই গ্যারান্টির দ্বিগুণের বেশি অর্থের সার আমদানি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ব্যাংকগুলো কৃষি মন্ত্রণালয়কে এলসি খুলে দিলেও নিজেদের ব্যবস্থায় মূল্য পরিশোধ করতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার নিয়ে সারের মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। মূলত ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির চাপ এড়ানো ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ভর্তুকি কমানোর শর্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সারের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম কমে এলেও দেশে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে সার আমদানিতে বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। কারণ এক বছরের ব্যবধানে ডলারের দর বেড়েছে ২৫ শতাংশ। সরকার বিনিময় হারের এ বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ কৃষকদের থেকে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর চাপ রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকি বাবদ অর্থ মন্ত্রণালয় ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে। এক সপ্তাহ আগেও কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক সচিবালয়ে সার নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দাবি করেন, সারের দাম বাড়ানো হবে না। আসন্ন অর্থবছরেও (২০২৩-২৪) সারের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের নির্দেশনায় কৃষি মন্ত্রণালয় সারের মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এতে বলা হয়, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং গুণগত ব্যবহার নিশ্চিতে সারের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হলো। অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যই বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে এক কেজি ইউরিয়ায় ৭৪ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে আসা এবং বর্তমানে দেশে দাম বাড়ানোর পর সরকারের ভর্তুকি নেমে এসেছে কেজিতে ২১ টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম কমে যাওয়া এবং কৃষক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর কারণে টিএসপিতে ভর্তুকির পরিমাণ ৫০ থেকে কমে ২৩ টাকা, এমওপি ৪১ থেকে কমে ৪০ টাকা ও ডিএপিতে ৭৯ থেকে কমে ৪৯ টাকায় নেমেছে। এ অবস্থায় সারের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয় না।
সন্দেহ নেই, সারের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। যেহেতু কৃষকদের ব্যয় বাড়বে। বোরোসহ সামনে যে ফসলের মৌসুম রয়েছে সেগুলোরও ব্যয় বাড়বে। ফলে সারের বাড়তি মূল্যে প্রভাব পড়বেই। এক্ষেত্রে কৃষক ফসল উৎপাদনে যেন সার কম না পান তা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে সারের সংকট হলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেটা কৃষক এবং ভোক্তার জন্য দুর্ভাবনার কারণ বেশি হবে। দেশে বার্ষিক চাহিদার বিপরীতে মোট উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশের বেশি আসে এ মৌসুমে। বোরো উৎপাদনের ওপর সারা বছরের চালের বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। কৃষক ও কৃষি গবেষকরা জানান, বেশির ভাগ স্থানেই ধান পাকতে শুরু করেছে। এ সময়ে খুব বেশি সারের ব্যবহার নেই। ফলে এ মৌসুমে কৃষকের ওপর চাপ না বাড়লেও ভুট্টা, সবজিসহ অন্যান্য ফসলে খরচের চাপ বাড়বে। এ মুহূর্তে সারের দাম বাড়ানোর প্রভাব না পড়লেও পরবর্তী সব মৌসুমেই এ বাড়তি খরচ কৃষকের ঘাড়ে চাপবে, যা কৃষককে উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করতে পারে। কৃষক যেন পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে সারা বিশ্বে খাদ্যপণ্যের বাজার খুব চড়া। খাদ্য উৎপাদন অনেক কারণে বিঘ্নিত হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্যের সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হয়েছে। সংকট দেখা দিয়েছে এবং খাদ্যের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে সরকার এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, এক ইঞ্চি জমিও যেন পতিত না থাকে। অর্থাৎ জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, অধিক ফসল ফলানো—এর অনেকটাই বিঘ্নিত হবে। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত ছিল উপকরণের দাম না বাড়ানো। এতে উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে। এতে দুই ধরনের প্রভাব পড়ে। প্রথমত, বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যায়; কিন্তু কৃষক লাভবান হন না। এতে কৃষক উৎপাদনে উৎসাহ হারাবেন। দ্বিতীয়ত, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার বাড়াতে সরকার যে আহ্বান জানাচ্ছে, তা বিঘ্নিত হতে পারে। কারণ জমি চাষে খরচ যখন বেড়ে যায়, কৃষক তখন সব জমি চাষাবাদ করেন না। এতেও উৎপাদনের ওপর একটি বিরূপ প্রভাব পড়বে। যা বাজারে উত্তাপ ছড়াবে এবং পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেবে। দাম না বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে দাম কমার সঙ্গে সরকার সমন্বয় করে নিতে পারে। বাজেটে সরকারের উচিত কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানো। প্রয়োজনে কৃষকদের নগদ সহায়তা দিতে হবে।
বাজেটে সারে বরাদ্দ রাখা ভর্তুকি থেকে ব্যয় বেশি হওয়ার শঙ্কা থেকে এ দাম বৃদ্ধি বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু সরকার এমন সময়ে সারের দাম বাড়িয়েছে যখন বিশ্ববাজারে প্রতিটির দামই নিম্নমুখী। ফলে সরকারের ভর্তুকি এমনিতেই কমে আসবে। যে চার ধরনের সারের দাম বাড়ানো হয়েছে, এর চাহিদা ৫০ লাখ ৫০ হাজার টন। ফলে আগামী অর্থবছরে শুধু এ চার রকমের সার কিনতে কৃষককে বাড়তি গুনতে হবে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। ডিজেল, কেরোসিন, বিদ্যুৎ ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই বেড়ে গেছে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ। খেত প্রস্তুত থেকে শুরু করে সেচ দেয়া, মাড়াই করা, ফসল ঘরে তোলা, শ্রমিকের মজুরি সব ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচের বোঝা টানতে হচ্ছে গত আগস্ট থেকে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রকৃতির বিরূপ আচরণ ও লোডশেডিং। চাষীর এমন ত্রিশঙ্কু অবস্থার মধ্যেই গত অক্টোবরে সব বীজের দাম বেড়ে যায় ৩০ শতাংশ। গত জানুয়ারিতে কৃষিতে বিদ্যুৎ ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা ১৬ পয়সা থেকে বেড়ে ৭ টাকা ৩৭ পয়সা হয়। গত আগস্টে ইউরিয়া সারের দাম ৬ টাকা বাড়িয়ে দেয় সরকার। একই মাসে ডিজেলের দাম এক লাফে বাড়ে ৩৪ টাকা। নয় মাসের মাথায় আবারো সারের দাম বাড়ানো মোটেই যৌক্তিক হয়নি। বৈশ্বিক খাদ্য সংকট চলাকালে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হলে সবার আগে আমাদের পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দাম বাড়লে অনেক কৃষক উৎপাদন খরচ কমাতে আগের চেয়ে কম সার ব্যবহার করবেন। এতে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।










