১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে আসে ব্রিটিশ শাসন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের সেই শাসনের অবসান ঘটলেও নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের পূর্ববাংলা বাঁধা পড়ে গিয়েছিল নতুন এক ঔপনিবেশিক শাসনের নাগপাশে। যেখানে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুসারে পূর্ববাংলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে। সেখানে স্বাধীনতা দূরের কথা, পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পূর্ববাংলা বঞ্চিত হয়েছিল ন্যূনতম স্বায়ত্তশাসনের অধিকার থেকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে দীর্ঘ সময় কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান না করে জনতার মুখোমুখি হওয়াকে এড়িয়ে গেছে।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম
সংবিধান প্রবর্তিত হওয়ার পর সারা পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি প্রবল
হয়ে উঠলেও নির্বাচন তথা জনতার আদালতে হাজির হওয়াকে ঠেকানোর সর্বশেষ উপায় হিসেবে পাকিস্তানের
ক্ষমতাসীন অবাঙালি গোষ্ঠী বেছে নিয়েছিল সামরিক শাসনকে। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে আবির্ভূত
সেনাশাসক জেনারেল আইয়ুব খানের প্রত্যক্ষ বা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের ধারাই অব্যাহত ছিল
অখণ্ড পাকিস্তানের শেষ দিন পর্যন্ত। কেন্দ্র কর্তৃক পূর্ববাংলার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, অর্থনৈতিক শোষণ এবং
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ছিল অব্যাহত। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দুই প্রদেশের মধ্যে শিল্প-কারখানা স্থাপন, চাকরিতে নিয়োগসহ
বিভিন্ন ক্ষেত্রে গড়ে তুলেছিল ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য। ১৯৫৯-৬০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের
জনগণের মাথাপিছু গড় আয় ছিল পূর্ববাংলার গড় আয়ের চেয়ে ৩২% বেশি। ১৯৫০-৫১ থেকে ১৯৫৪-৫৫
সাল পর্যন্ত ৬০% জনগণ অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ২০% বরাদ্দ
করা হতো। অব্যাহত অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে পূর্ববাংলার মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ১৯৬৬
সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কনভেনশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
তার ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এ প্রস্তাবকে তিনি বাঙালির বাঁচার দাবি বলে আখ্যায়িত
করেন। ১৮ বছর ধরে অব্যাহত রাজনৈতিক নিড়ীপন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং সাংস্কৃতিক
আগ্রাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্তির লক্ষ্যে রচিত ছয় দফার মূল বিষয়বস্তু
হচ্ছে :
প্রথম দফা: লাহোর প্রস্তাবের অনুসরণে গণতান্ত্রিক সরকারভিত্তিক পাকিস্তান ফেডারেল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত
হবে। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্যগুলোর সংসদ প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবে।
দ্বিতীয় দফা: শুধু বিদেশ নীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ফেডারেল সরকারের দায়িত্বে থাকবে। বাকি সব বিষয়
অঙ্গরাজ্যগুলোর এখতিয়ারভুক্ত হবে।
তৃতীয় দফা: যদি এমন ব্যবস্থা উদ্ভাবন ও প্রবর্তন করা যায়, যাতে দেশের এক অংশ থেকে অন্য
অংশে অর্থাত্ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে বা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব
পাকিস্তানে পুঁজি পাচার রোধ করা যাবে, তবে সারা দেশের জন্য একই মুদ্রা
থাকবে। অন্যথায় (পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য) দুটি আলাদা মুদ্রার ব্যবস্থা
করা হবে।
চতুর্থ দফা: কর নির্ধারণ ও আদায় অঙ্গরাজ্যগুলোর এখতিয়ারে থাকবে। ফেডারেল সরকারকে নির্ধারিত অর্থ
দেয়া হবে।
পঞ্চম দফা: অঙ্গরাজ্য দুটি আলাদা বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য
ও বৈদেশিক সাহায্য নিয়ন্ত্রণ করবে।
ষষ্ঠ দফা: অঙ্গরাজ্যগুলো সব আধাসামরিক বাহিনী গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করবে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে (কাজী খলীকুজ্জামান
আহমদ—ছয় দফা ও শেখ মুজিব)। প্রাসঙ্গিকতার নিরিখে
কিছু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বিষয়বস্তু সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ করা হলেও ছয় দফার ঐতিহাসিক
প্রেক্ষাপট বা বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ এ লেখার মুখ্য কোনো উদ্দেশ্য নয়। ১৯৬৬ সালে বাস্তব
অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন অর্থাত্ বয়সে যারা বেশ প্রবীণ তারা ছয় দফার যৌক্তিকতা
উপলব্ধি করতে পেরেছেন। কিন্তু বর্তমানে যারা বয়সে তরুণ ১৯৬৬ সালে জন্মই হয়নি, তারা ইতিহাস পড়ে
ছয় দফা সম্পর্কে জানতে পারলেও তত্কালে পূর্ববাংলায় বিদ্যমান যে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে
ছয় দফা দাবি প্রস্তাব করা হয়েছিল তার একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ এবং যৌক্তিকতা তুলে ধরাই
এ লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য। ছয় দফার প্রথম দফায় পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকারের জন্য সেই
প্রাথমিক দাবির কথাই তুলে ধরা হয়, যার প্রতি প্রায় সবাই ছিলেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দ্বিতীয় দফায় দুটি বিষয়ে (প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র) ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রের
কথা বলা হয়, যা সংবিধানের একটি মৌলনীতি হিসেবে আগেই গৃহীত যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানের আওতায় কেন্দ্র
ও প্রদেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতাবণ্টন-সংক্রান্ত একটি দাবির পুনরুক্তি। তৃতীয় দফায় আগে থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পুঁজি
পাচার রোধের দাবি তুলে ধরা হয়। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, দেশের অর্থনৈতিক
ব্যবস্থায় মুদ্রা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। বিনিময়ের মাধ্যম, পণ্যের মূল্যমান, পরিমাপক এবং সঞ্চয়
প্রভৃতি ক্ষেত্রে রয়েছে মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পরিমিত পরিমাণ মুদ্রার চেয়ে অতিরিক্ত
মুদ্রা যেমন দেশের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি প্রয়োজনের চেয়ে কম মুদ্রা বা মুদ্রার সংকটও অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ।
১৯৬৬ সালে পৃথকভাবে কোন প্রদেশে কত মুদ্রা ছিল সেটি জানা না গেলেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার
পূর্ববর্তী সময়ে পাকিস্তানের মুদ্রার প্রবাহ ছিল ৮১৫ দশমিক ৭০ কোটি রুপি, যার মধ্যে পশ্চিম
পাকিস্তনে ছিল ৫১৭ দশমিক ৩০ কোটি রুপি এবং পূর্ববাংলায় ছিল মাত্র ২৯৮ দশমিক ৪০ কোটি
রুপি। মোট জনসংখ্যা যেখানে পূর্ববাংলায় ছিল ৫৬ শতাংশ, সেখানে মুদ্রা সরবরাহের
পরিমাণ মাত্র ৩৭ শতাংশ, যা অবশ্যই অপ্রতুল। মুদ্রা সরবরাহ অসম পরিমাণের এ তথ্য থেকে এটি সহজেই অনুমান করা
যায়, পূর্ববাংলা থেকে কীভাবে পুঁজি পাচার হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। চতুর্থ দফায় কর
নির্ধারণ ও আদায় অঙ্গরাজ্যের এখতিয়ারে রাখার দাবি করা হয়। এ দফার পেছনের তথ্য বিশ্লেষণে
লক্ষ্য করা যায়, পাকিস্তানের বাজেটের চাহিদা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আদায়ের শতকরা ৭৫ ভাগের জোগানদার (জয়বাংলা—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাপ্তাহিক মুখপত্র ২ জুন, ১৯৭১) পূর্ববাংলা হওয়া সত্ত্বেও
১৯৬৪-৬৫ সাল পর্যন্ত তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ব্যয় করা
হয় ৬ হাজার ১৩৯ কোটি রুপি এবং পূর্ববাংলার জন্য ব্যয় করা হয় ২ হাজার ১৫৯ কোটি রুপি (জয়বাংলা ১৮ জুন ১৯৭১), যা মোট বরাদ্দের
মাত্র ২৬ শতাংশ। বাজেটের অর্থের জোগানের সঙ্গে অর্থের বরাদ্দের তুলনামূলক বিশ্লেষণে
এটি স্পষ্ট লক্ষণীয় যে করের অর্থের ব্যবহারে পূর্ববাংলা কতখানি বঞ্চিত এবং অবহেলিত
ছিল। পঞ্চম দফায় বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে অঙ্গরাজ্য
দুটি কর্তৃক আলাদা বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করার দাবি। এ দাবির প্রাসঙ্গিকতা
বিশ্লেষণে উল্লেখ্য, ১৯৪৮-৪৯ থেকে ১৯৬৪-৬৫ সাল পর্যন্ত পূর্ববাংলা থেকে রফতানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার
৬৫৯ দশমিক ১০ কোটি রুপি এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রফতানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৭২
দশমিক ১০ কোটি রুপি অর্থাত্ মোট রফতানির ৫৭ শতাংশ ছিল পূর্ববাংলা থেকে এবং ৪৩ শতাংশ
ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অথচ ওই সময়ে পূর্ববাংলার জন্য আমদানি করা হয়েছিল ১ হাজার
২২৮ দশমিক ৫০ কোটি টাকার পণ্য এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য আমদানি করা হয়েছিল ২ হাজার
৭৬০ দশমিক ২০ কোটি টাকার পণ্য। মোট আমদানির মাত্র ৩১ শতাংশ ছিল পূর্ববাংলার জন্য এবং
৬৯ শতাংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। এক কথায় পূর্ববাংলার রফতানি থেকে অর্জিত অর্থ
ব্যয় করা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পণ্য আমদানির কাজে। ষষ্ঠ দফায় নিরাপত্তাবিষয়ক
পূর্ববাংলার জন্য নিজস্ব আধাসামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন করার দাবি। ছয় দফা দাবির
বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে এটি পরিষ্কারভাবেই উপলব্ধি করা যায়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায়
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের কারণেই পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদের বিপুল পাচার
ঘটেছিল। সে কারণেই ছয় দফা কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার
আঞ্চলিকীকরণ (ড. কামাল হোসেন—মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল, পৃষ্ঠা ১৯)। ছয় দফাকে
আইয়ুব খান ও তার পশ্চিম পাকিস্তানি সহযোগীরা পূর্ববাংলার স্বাধীনতা প্রস্তাব এবং দেশকে
ধবংস করার চূড়ান্ত হিসেবে চিহ্নিত করে ১৯৬৬ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে
করেছিল অন্তরীণ। নিরাপত্তা আইনে আটক করেছিল আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকেও।
প্রতিবাদে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগের ডাকে ঢাকায় মানুষের ঢল নামে। পুলিশের গুলিতে
৪১ ব্যক্তি প্রাণ হারান এবং আরো শত শত লোককে জেলে নেয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা বাংলার
মানুষের কাছে গৃহীত হয়েছিল তাদের মুক্তির সনদ রূপে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ববাংলার
আশি ভাগের বেশি ভোটার রায় দিয়েছিল ছয় দফার পক্ষে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল একদিকে
যেমন ছয় দফার প্রতি পূর্ববাংলার মানুষের সমর্থন, তেমনি অপরদিকে দেশের স্বাধীনতাকে
ত্বরান্বিত করার এক হাতিয়ার। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা একদিকে যেমন বাঙালির
মুক্তির সনদ, তেমনি অপরদিকে স্বাধীনতা অর্জনের এক অনন্য দলিল।
মো. শাহাদাত্ হোসেন, এফসিএ
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, আইসিএবি
সিনিয়র পার্টনার
ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স










