নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নাগরিকের অন্যতম মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত বাংলাদেশের সংবিধানে। এ অধিকার নিশ্চিতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দুঃখজনকভাবে সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এমন এক অবস্থায় দেশে মঙ্গলবার পালিত হলো জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। এ দিবস উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভায় দেয়া সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে আবারো নিরাপদ খাদ্যের আবশ্যকতার কথা উঠে এসেছে। চলমান করোনা মহামারীতে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পরিপ্রেক্ষিতেও নিরাপদ খাদ্যের লভ্যতা নিশ্চিতের বিষয়টি জরুরি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনিরাপদ ও ভেজাল খাদ্য পরিভোগে মানুষের নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতা বৃদ্ধির প্রবণতা উঠে এসেছে জনস্বাস্থ্যবিদদের গবেষণায়। এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অনিরাপদ খাদ্য জনস্বাস্থ্যের বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বৈকি।
বাস্তবতা হলো, দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক সংস্থার সক্ষমতা বাড়িয়েছে সরকার। পুরনো আইন সংশোধনের পাশাপাশি নতুন আইন ও নতুন সংস্থা করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব সংস্থা মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি তদারকিও করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের অপরাধে আইন অনুযায়ী তাত্ক্ষণিক অভিযানের ভিত্তিতে আর্থিক জরিমানামূলক শাস্তি দিচ্ছে। এর পরও থেমে নেই মানহীন খাদ্যপণ্য উৎপাদন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় এখনো নিম্নমানের খাদ্যপণ্য ধরা পড়ার খবর মিলছে, যা নকল, ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য রীতিমতো আশঙ্কাজনক। নিরাপদ খাদ্যের ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ট্রান্সফ্যাট। ট্রান্সফ্যাটঘটিত হূদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অনেক দেশে পুষ্টিবর্জিত খাদ্যের এ উপাদান কতটুকু থাকতে পারবে, তার মাত্রা বেঁধে দিয়ে নীতিমালা আছে। ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী চর্বি, তেল সব ধরনের খাদ্যপণ্যে মোট ফ্যাটের ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট থাকা যাবে না। অথচ খাদ্যপণ্যে উচ্চমাত্রার ট্রান্সফ্যাট ব্যবহার করছে দেশী-বিদেশী কোম্পানি। বেকারি, শিঙাড়া-সমুচা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চানাচুর, চিপস, বার্গারের মতো মুখরোচক খাবারে ব্যবহূত অতিমাত্রার ট্রান্সফ্যাট মানুষের অকালমৃত্যুর কারণ হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে নীতিমালা করার দাবি জানিয়ে আসছে ভোক্তা অধিকার সংগঠনসহ সচেতন মহল। কিন্তু এ-সংক্রান্ত নীতিমালা এখনো লাল ফিতায় আটকে আছে। নিরাপদ খাদ্যের অন্যতম শর্ত ট্রান্সফ্যাটমুক্ত খাবার। তাই এ-সংক্রান্ত নীতিমালা দ্রুত অনুমোদন ও কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি।
কেবল জনস্বাস্থ্য নয়, নতুন প্রজন্মের উৎপাদনশীলতার দিক থেকেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার গুরুত্ব রয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ সরকার। কিন্তু মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম জনশক্তির বিকল্প নেই। আর তার জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় যেখানে পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য গ্রহণের মাত্রা বাড়ছে, সেখানে আমাদের দেশের মানুষ ক্রমে নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ফলে তারা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদনশীলতা হ্রাসের তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি তাই নিরাপদ খাদ্য জোগাতে বিনিয়োগ, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে কাজ করার মতো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলো জোরদারের সুপারিশ করেছে। এটি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশে নিরাপদ খাদ্য আইনসহ আরো কিছু পরিপূরক আইন আছে। রয়েছে সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানও। তবু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায়নি। শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠান থাকলে হয় নয় না, আইনের প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা দরকার। বর্তমানে একাধিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিরাপদ খাদ্যের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় সমন্বয়ের অভাব লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকেই আরো শক্তিশালী করা যেতে পারে। পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিএসটিআইয়ের গবেষণা ও তদারকি আরো বাড়াতে হবে। দেশে খাদ্যপণ্যের বাজার যেভাবে বিকশিত হচ্ছে, সেভাবে বিএসটিআইয়ের সক্ষমতা বাড়ছে না। সচেতনতার অভাবে খাদ্যদূষণ রোধ করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে প্রচারণা ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে, যেমনটি করেছে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। মানহীন ও ভেজাল খাদ্য রোধে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ বিশ্বে সুবিদিত। সংস্থাটির নীতি ও কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এখানে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে হবে।
নিরাপদ খাদ্যের ইস্যুটি পুরো খাদ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত। এক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা করার সুযোগ নেই। নাগরিকের চাহিদামতো নিরাপদ খাদ্যের লভ্যতা নিশ্চিত করতে হলে খাদ্য ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ যেকোনো মূল্যে নিরাপদ করতে হবে। এজন্য দরকার খাদ্য ব্যবস্থায় অংশীজনদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার উন্নয়ন এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। মাঝেমধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা ছাড়া দেশে অনিরাপদ খাদ্য রোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি দৃশ্যমান নয়। এর সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রি বন্ধে সরকারকে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। এর বিকল্প নেই।










