কিছুদিন আগে করোনা মোকাবেলায় বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছিল। সে রেশ কাটতে না কাটতে দ্রুতই বাড়ছে দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা, সংক্রমণ ও শনাক্তের পরিমাণ। গত দুই মাসের তুলনায় মারাও যাচ্ছে বেশি। সংক্রমণ বৃদ্ধির ফলে রোগীর চাপ সামাল দিতে আবারো বেসামাল হাসপাতালগুলো। শুরু হয়েছে আইসিইউ সংকট। হাসপাতালে আবারো দেখা দিয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী সংকট। গণপরিসর, রেস্তোরাঁ, গণপরিবহনসহ সামাজিকভাবেও স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা ঢিলেঢালাভাবে চলছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধিপূর্বক চলমান অবস্থায় করোনা সংক্রমণ এড়াতে স্বাস্থ্যবিধির কঠোর প্রয়োগ জারির বিকল্প নেই।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশ পুনরায় লকডাউন এবং কোনো কোনো দেশ সরাসরি লকডাউনে না গেলেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জারি করেছে। ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সফল হচ্ছে তারা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লকডাউন দিলেও সুইডেন কখনো লকডাউন জারি করেনি। তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে সেখানে। দেশটিতে সবকিছু খোলা থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হচ্ছে সবাইকে। যেমন রেস্তোরাঁয় তিনজনের বেশি একসঙ্গে বসতে না দেয়া, গণপরিবহনে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা ও মাস্ক পরিধান করা অত্যাবশ্যক। তাছাড়া দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় যুক্তরাজ্যের টিকাদান কার্যক্রম জোরালোভাবে চালিয়ে যাওয়ার কৌশল অনুসরণ করছে অন্যান্য দেশ। তবে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর। এ লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করা হচ্ছে। আমাদের দেশেও টিকাদান কর্মসূচি চলছে। তাই স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন ও সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়টি যদি যথাযথভাবে পরিপালিত হয় তাহলে ভাইরাসটির সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

গত বছর ১০০ মানুষ সংক্রমিত হওয়ার আগেই সরকারের লকডাউনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে লকডাউনের অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় পূর্ণ লকডাউনে না গিয়ে আংশিক লকডাউনে যাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে শহর বা অঞ্চলভেদে সংক্রমণের মাত্রানুযায়ী আংশিক লকডাউন ঘোষণা করা যায়; সম্প্রতি নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ফ্রান্স ও পোল্যান্ডে যেমন আংশিকভাবে লাকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পোল্যান্ডে দোকানপাট, সাংস্কৃতিক এবং খেলাধুলার যাবতীয় ইভেন্ট তিন সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের সাধারণের জীবিকার বিষয়টি মাথায় রেখে লকডাউনে না গেলেও কিছু কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধ করার জন্য ১২ দফা সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিদ্যমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে টিকাদান, করোনা পরীক্ষা, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২০ সালে প্রায় সব দেশে যখন করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি, তখন ভাইরাসটি মোকাবেলায় দক্ষিণ কোরিয়া লকডাউন স্ট্র্যাটেজিতে না গিয়ে ফোর টি কৌশল অবলম্বন করে—টেস্ট, ট্র্যাকিং, ট্রেসিং ও ট্রিটমেন্ট। ২০১৫ সালের মার্স ভাইরাস থেকে তারা যে শিক্ষা গ্রহণ করে, মূলত তা-ই কাজে লাগায় কোরিয়ার সরকার। এর সংক্রমণের শুরুতে যে ব্যক্তিকে যথাক্রমে তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়, ওই তিন হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, স্টাফ, অন্যান্য রোগী অনেকেই এতে আক্রান্ত হয়েছিল। তাই তারা চিকিৎসক, নার্সদের সুরক্ষা নিশ্চিতের পাশাপাশি নিয়মিতভাবে ফোর টি কৌশল কাজে লাগায়। সাধারণ মানুষকে টিকা নিতে উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা যাতে টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ না পড়ে, নিশ্চিত করতে হবে তা-ও।

গত বছর মার্চ থেকে দেশে করোনা সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শীতের আবহাওয়ায় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। শীত শেষে উষ্ণ আবহাওয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণ আবার বাড়ছে। মহামারীর প্রথম বছর অনেক দেশে গরম আবহাওয়ায়ও এর সংক্রমণ বাড়তে দেখা গেছে। মৌসুমি রোগ হিসেবে কভিড-১৯-এর দেখা দেয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের ল্যাবরেটরির গবেষণায় দেখা গেছে ভাইরাসটি ঠাণ্ডা, শুকনো এবং যেখানে আল্ট্রাভায়োলেট রেডিয়েশন নিম্নপর্যায়ে, সেখানে বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। তারা স্বাস্থ্যবিধি পালন ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপের দিকে জোর দিয়েছে।

তাই আমাদের দেশেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় রেখে যেকোনো জনসমাগম সীমিত করাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ও অনুষ্ঠান সীমিত করা জরুরি। এ মুহূর্তে বিদেশ থেকে বা প্রবাসী যারা আসবেন, তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। বিবেচনায় রাখতে হবে আগামী ঈদের ছুটির বিষয়টিও। সর্বোপরি স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে আইন আরো জোরালোভাবে কার্যকর করতে হবে। অভিযোগ রয়েছে মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বারবার আহ্বান জানানোর পরও সাধারণ মানুষ তা মানছে না। এ অবস্থায় ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক কার্যক্রম পরিচালনা বৃদ্ধি করতে হবে। বিভিন্ন শপিংমল, রেস্তোরাঁ, খোলাবাজার, গণপরিবহনসহ বিভিন্ন গণপরিসরে মাস্ক ব্যবহার না করলে জরিমানা করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে সামাজিক দূরত্ব পরিপালনের বিষয়গুলো। সড়কে কিংবা পরিবহনে অধিকাংশ মানুষকে মাস্ক ছাড়াই চলাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম জোরালোভাবে চালিয়ে যেতে হবে। মানুষকে পুনরায় সতর্ক করাও জরুরি। টিকা দেয়ার ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে মৃত্যুঝুঁকি কমবে কিন্তু আর করোনা হবে না, এমনটি নয়। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সমন্বিতভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকরে মনোযোগী হতে হবে।