পানি জীবের অপরিহার্য উপাদান। পানি ছাড়া জীব বাঁচতে পারে না। তবে সে পানি বিশুদ্ধ ও নিরাপদ হতে হবে। আমরা জানি, এক ফোঁটা নোংরা পানিতে পাঁচ কোটিরও বেশি জীবাণু থাকতে পারে। এতে অনেক সময় পানিই মরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জীবনধারণের জন্য প্রত্যেক জীব খাদ্য গ্রহণ করে। জীব যেসব বস্তু আহার হিসেবে গ্রহণ করে তাকে আহার্য সামগ্রী বলে। কিন্তু সব আহার্য সামগ্রীই আবার খাদ্য নয়। অর্থাৎ যেসব আহার্য সামগ্রী গ্রহণ করলে জীবের বৃদ্ধি, তাপশক্তি উৎপাদন, ক্ষয়পূরণ, পুষ্টিসাধন ও রোগ প্রতিরোধ করে তাকেই খাদ্য বলে। পুষ্টিবিদের মতে খাদ্যের পুষ্টি উপাদান ছয়টি। যথা শর্করা, আমিষ, চর্বি (স্নেহ), ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি। একদিকে যেমন পানি একটি খাদ্য উপাদান, তেমনি পানি একটি উৎকৃষ্ট দ্রাবক ও পরিবাহক। যেকোনো ফসল বপন/রোপণ কার্যক্রম হতে শুরু করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, সরবরাহ, গ্রহণ/আহার এবং তৎপরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়, যা প্রতিটি জীবের বেলায় প্রযোজ্য। এছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাপনের বিভিন্ন কার্যক্রমে পানি অতিগুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একজন মানুষ খাবার গ্রহণ ছাড়া তিন সপ্তাহ এবং পানি পান ছাড়া তিনদিন বাঁচতে পারে না। জীবদেহের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে পানির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি মানবদেহের ওজনের ৫৫-৬০ শতাংশ পানি। তবে মানবভেদে পানির পরিমাণ কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। আবার উদ্ভিদের শতকরা ৭৫ ভাগের বেশি পানি। ওই পানির ১-৩ শতাংশ বিপাকীয়, বাকি ৯৯-৯৭ শতাংশ প্রস্বেদনকাজে ব্যবহার হয়। উদ্ভিদেরও শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া পানি ছাড়া সম্পন্ন হয় না। মানব ও উদ্ভিদ কোষের প্রয়োজনীয় অনেক পদার্থ শোষিত হওয়ার আগে পানিতে প্রস্তুত ও দ্রবীভূত হতে হয়। কোষ হতে কোষান্তরে খাদ্য এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান স্থানান্তরে পানি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এখানে উভয় ক্ষেত্রে পানি দ্রাবক ও পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। তাই এক কথায় পানি জীবের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। 

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (Food and Agricultural Organization-FAO) উদ্যোগে ১৯৮১ সালের ১৬ অক্টোবর হতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের এফএও সদস্য ১৫০টির অধিক দেশে প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রতি বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৬ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয় এবং এফএওর যৌথ উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদা ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবস পালনের প্রস্তুতি চলছে। বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর র‌্যালি, সেমিনার, সিম্পজিয়াম, কারিগরি সেসনসহ জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এবারে দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—‘Water is life, water is food. Leave no one behind.’ যার বাংলা ভাবানুবাদ ‘পানি জীবন, পানিই খাদ্য। কেউ থাকবে না পিছিয়ে।’ বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৩-এর প্রতিপাদ্যে সুস্পষ্টভাবে তিনটি উদ্দেশ্যকে নির্ধারণ এবং কেউ যাতে উদ্দেশ্যগুলো থেকে বাদ না পড়ে, তাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

পৃথিবীর বিশাল পানিসম্পদের প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ স্বাদু বা মিঠা ও ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ লবণ পানি। তাই সব পানি ব্যবহার উপযোগী নয়। বাংলাদেশে মোট পানিসম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ৪০৪ বিসিএম (বিলিয়ন কিউবিকমিটার)। এর মধ্যে ভূ-উপরিস্থ (নদ-নদী ১ হাজার ১০ বিসিএম ও বৃষ্টিপাত ৩৪০ বিসিএম) ১ হাজার ৩৫০ বিসিএম ও ভূগর্ভস্থ ৫৪ বিসিএম। ওই পানিসম্পদের ৮৭ শতাংশ কৃষি খাত (কৃষি, মৎস্য, পশুপালন), ১০ শতাংশ গৃহস্থালি এবং ৩ শতাংশ শিল্প-কারখানায় ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ মৌসুমি জলবায়ুর দেশ। ফলে প্রতি বছর বন্যা ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মৌসুমভিত্তিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। দেশে নভেম্বর হতে এপ্রিল পর্যন্ত বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ ও বন্যার পানি প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে শুধু মার্চ হতে এপ্রিল পর্যন্ত সেচ মৌসুমের মোটের ৩৫ শতাংশ চাহিদা। ওই মাসগুলোয় সেচ মৌসুম চলমান থাকে এবং আর্দ্র জলবায়ু, শুষ্কতা ও অধিক তাপমাত্রা প্রবাহিত হয়। সর্বশেষ কৃষিশুমারি-২০১৯ অনুযায়ী, দেশের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১৮৬ লাখ ৮১ হাজার একর। অন্যদিকে ২০০৮ হতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আবাদি জমি কমেছে ৪ লাখ ১৬ হাজার একর। এ সময়কালে আউশ ফসল চাষের জমি কিছুটা কমছে। তবে আমন, বোরো, গম, ভুট্টা ও পাট চাষের জমি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। অন্যদিকে দেশে মোট মাছ চাষে জমির পরিমাণ ১২ লাখ ১২ হাজার একরের মধ্যে পুকুরে মাছ চাষ ৬ লাখ ৮১ হাজার একর। দেশে গরু, ছাগল, মহিষ ও হাঁস-মুরগির সংখ্যা বাড়ছে (বিবিএস)। এদিকে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শস্য উৎপাদন, খাবার, গৃহস্থালি শিল্পোৎপাদন, মৎস্য ও পশুপালনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে পানির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ক্রমবর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার দেশে ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমি হতে খাদ্যনিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয় দুর্বার গতিতে কাজ করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে দেশে সেচকাজে ৫০-৬০ শতাংশ পানি অপচয় হচ্ছে। সেচকাজে প্রায় ৭৩ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। অনুরূপভাবে গৃহস্থালি ও শিল্প-কারখানাও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সেচ, গৃহস্থালি ও শিল্পে আধুনিক টেকসই ও লাগসই (বারিড পাইপ, এডব্লিউডি, ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচ, পানির আয়তনিক ব্যবহার, পানির ব্যবহার হ্রাস, পুনর্ব্যবহার, পুনর্নবীকরণ ও পুনরুদ্ধার) প্রযুক্তি বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। তাই কৃষিকাজে পানির যথাযথ ব্যবহারে ‘More Crop Per Drop’ স্লোগানে সেচ প্রদান করা হলে অপচয় রোধ ও উৎপাদন খরচ উভয়ই কমে যাবে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদ উত্তোলন ৪০-৫০ শতাংশ হ্রাস পাবে। অন্যদিকে সারা দেশে জলাধার সৃষ্টি, খাল-নালা ও নদ-নদী খনন বা পুনঃখননের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণও বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, স্বল্প সেচ ও জীবনকালের জাত উদ্ভাবন এবং সর্বোপরি পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির নিম্নগামিতা হ্রাস ও মরুময়তা রোধ হবে। বর্তমানে দেশে বছরে সেচকাজে প্রায় ৫৫ বিসিএম ও গৃহস্থালিকাজে (দৈনন্দিন চাহিদা জনপ্রতি ১৫০ লিটার, ব্র্যাক সেন্টার, বিআইজিডি) প্রায় ৯ বিসিএম এবং জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের ইউরোস্টেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু আরএমজিতে ১ দশমিক ৫ বিসিএম পানি ব্যবহার হচ্ছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশ নিরাপদ ও সুপেয় পানি পাচ্ছে (যায়যায়দিন, ২১.০৯.২০২১)। তবে বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষের জন্য কোনো না কোনো পানির উৎস রয়েছে। কিন্তু এ পানির সবটাই পানযোগ্য নয়। দেশে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে পানিতে বিভিন্ন প্রকার হেভি মেটাল পরিলক্ষিত হওয়ায় বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দিচ্ছে। তাই খাদ্য হিসেবে প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি। বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ নিরাপদ পানি ও প্রায় ৩৬০ কোটি স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা হতে বঞ্চিত রয়েছে। ফলে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি এখনো বিশ্বের অনেক মানুষের কাছে দুর্লভ। জলবায়ুবিষয়ক জাতিসংঘের প্যানেলের গবেষণায় জানা যায়, প্রতি ডিগ্রি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে প্রায় ২০ শতাংশ বিশুদ্ধ পানি কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৪০ শতাংশ এলাকায় পানি সংকট দেখা দেবে। অন্যদিকে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝিতে কয়েকটি উন্নয়নশীল অঞ্চলে জোগানের তুলনায় পানির চাহিদাও ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। চলমান চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে কৃষি খাতের যন্ত্রপাতি জিপিএস ও সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহারে নিখুঁত প্রোগ্রামিং মাধ্যমে স্বনিয়ন্ত্রিতভাবে মনুষ্যবিহীন ২৪ ঘণ্টা পরিচালিত হবে। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা যেকোনো ডিভাইস ব্যবহার করে দূরবর্তী অবস্থান থেকে নিরীক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ফলে কৃষকের মাঠ ও কর্মস্থলের সংযোগ হ্রাস এবং শ্রম ব্যয় কমে যাবে। ফলে কৃষি খাতের নবজাগরণ ঘটবে। বর্তমান সরকার শতবর্ষী ব-দ্বীপ পরিকল্পনার (ডেল্টা প্ল্যান) আলোকে দেশকে ছয়টি হটস্পটে বিভক্ত ও ছয়টি নির্দিষ্ট অভীষ্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানিসম্পদকে সমন্বিত দক্ষ ব্যবহারের বিশুদ্ধ, নিরাপদ, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যা দেশের পানিসম্পদ কৃষি, মৎস্য ও পশুপালনের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, তার নিরাপত্তা বিধানে আধুনিক লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেশ অগ্রসর হবে। আবার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) মূল লক্ষ্য ১৭টি। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি শতভাগ নাগরিকের জন্য নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে, যার বাস্তবায়ন প্রতিটি দেশের জন্য করণীয়। এ অবস্থায় বর্ণিত প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ পালন হচ্ছে ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৩’। 

মো. জিয়াউল হক: সাবেক সদস্য পরিচালক 

(ক্ষুদ্র সেচ) বিএডিসি