১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনের হত্যাযজ্ঞ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের একটি নিষ্ঠুরতম, নৃশংসতম বিভীষিকাময় ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। ১৫ আগস্টের সূর্য ওঠার আগেই স্বাধীনতার শত্রুরা জাতির জনক স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। ১৫ আগস্টের এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আমরা একদিকে যেমন হারিয়েছি একজন মহান নেতাকে, অবসান হয়েছে একটি সংগ্রামী জীবনের, তেমনি অন্যদিকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছিল দেশের অর্থনীতিকে। দেশ স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে দেখতে পেলেন বাংলার জনপদের জনবসতির যে ক্ষতি ও ধ্বংসসাধন করা হয়েছে, তা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়েও কোনো দেশের শত্রুপক্ষ করেনি, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর এতটা পরিকল্পিত আঘাত আসেনি। পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামের ঘরবাড়ি, স্কুলঘর, হাটবাজারগুলো জ্বালিয়ে দেয়। পুড়িয়ে ফেলে ব্যাংকের টাকা এবং শূন্য করে ফেলে সরকারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল, পুড়িয়ে দেয় খাদ্যগুদাম, কৃষি ব্যবস্থা ভেঙে ফেলে, ধ্বংস করে দেয় পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা। এক কথায় নিষ্ঠুর ঔপনিবেশিক শোষণের অবসানে ৩০ লাখ শহীদের আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেল, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি বলতে কিছুই ছিল না, তা ধবংসের শেষ সীমাতেই এসে পৌঁছেছিল। দেশের এই অর্থনৈতিক দুরবস্থায় দায়িত্ব গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু নজর দেন পুনর্গঠনের কাজে। রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশকে একটি অর্থনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হন। মাত্র সাড়ে তিন বছর সময়কালে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সরকার যে কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে, তা উল্লেখ করে শেষ করার মতো নয়। তবে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা পাওয়ার জন্য কিছু তথ্যভিত্তিক উদাহরণ উল্লেখ করা হলো। কৃষির দিকে যদি দৃষ্টি দেয়া যায়, লক্ষ করা যাবে ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে ১৫ লাখ একর থেকে ৩৬ লাখ একর জমি উচ্চ উৎপাদনশীল খাদ্য উৎপাদনের আওতায় আনা, ৪ লাখ ২৫ হাজার টন সার সরবরাহ, ১২ হাজার টন কীটনাশক ওষুধ সরবরাহ, ৩৫ হাজার পাম্প স্থাপন, ২ হাজার ৪০০ গভীর নলকূপ ও ৪ হাজার অগভীর নলকূপ খনন ওই বছরের লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কৃষি ক্ষেত্রে সেচ ব্যবস্থায় নেয়া হয়েছিল উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সব অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করে মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু সরকার সাড়ে ৯ লাখ একর অতিরিক্ত জমি অর্থাৎ ৩৬ শতাংশের বেশি জমি সেচের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৭৫ সালে ১৮ এপ্রিল ফারাক্কাসংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বঙ্গবন্ধুর জোরালো ভূমিকার কারণেই বাংলাদেশ ৪৪ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার শর্ত যুক্ত হয়েছিল। ফারাক্কাসংক্রান্ত এর চেয়ে ভালো বন্দোবস্ত পরবর্তীকালের কোনো প্রশাসনই উপহার দিতে পারেনি। কৃষি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর এই উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের কারণে ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে পূর্ববতী বছরের উৎপাদনের তুলনায় আমন ফসলের উৎপাদন বেড়েছিল ২০ শতাংশ এবং আউশ ফসলের উৎপাদন বেড়েছিল ২৩ শতাংশ। সর্বোপরি ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ১২ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে বিরল।
শিল্প ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর গৃহীত পদক্ষেপগুলোর উল্লেখযোগ্য ছিল ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৭টি ভারী শিল্প সংস্কার, ২৩৭টি ভারী শিল্পে ১৫ হাজার শ্রমিক নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, কারখানাগুলোর উৎপাদনের জন্য ৩৪ কোটি টাকার কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিক প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য ২৮ কোটি টাকা ব্যয় ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ পদক্ষেপের কারণে সব বাধা অপসারণ করে শিল্প ক্ষেত্রে উৎপাদনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ ১৯৬৯-৭০ সালের উৎপাদন মাত্রার তুলনায় ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে অর্জিত উৎপাদন মাত্রা কাপড়ের ক্ষেত্রে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ, তরল ওষুধাদির ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ, নৌযানের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ, ইলেকট্রিক ফ্যানের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ, মোটরগাড়ি, ট্রাক ও বাস যুক্তকরণের ক্ষেত্রে ৩৯৪ শতাংশ এবং সাইকেলের ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ বেড়েছে। ১৯৬৯-৭০ সালের স্টিল ইনগট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৯৯৩ টন। ১৯৭৩-৭৪ সালে তা হয়েছে ৫৮ হাজার ২৫৩ টন। কাঁচা রবারের উৎপাদন ১৯৬৯-৭০ সালে ছিল মাত্র ১২ হাজার পাউন্ড, ১৯৭৩-৭৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার পাউন্ডে। ১৯৭২-৭৩ সালে চিনির উৎপাদন ছিল ১৯ হাজার টন। ১৯৭৩-৭৪ সালে এই উৎপাদন বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার টন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সব কলকারখানা যেখানে ধ্বংসপ্রাপ্ত, সেইসব কলকারখানা পুনর্গঠন করে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থার উৎপাদনে ফিরে যাওয়া ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। শিল্প ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল ১৯৭৩-৭৪ সালে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৫৩ শতাংশ, যা বাংলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় প্রবৃদ্ধি।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দিকে দৃষ্টি দিলে লক্ষ করা যায়, বঙ্গবন্ধু এমন একটি অবস্থায় দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন, যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এক আনার বৈদেশিক মুদ্রা ও গোল্ড রিজার্ভ ছিল না। বরং পাকিস্তানিদের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যাত্রা করতে হয়েছিল। এমন অবস্থা থেকে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ব্যাংক আমানত ১২৫ কোটি টাকারও বেশি হয়েছিল। ৫০, ১০ ও ৫ টাকার পাকিস্তানি মুদ্রার প্রচলন প্রত্যাহার করে বাংলাদেশের নোট চালু করতে সমর্থ হয়েছিলেন। দেশ স্টালিং এলাকার সদস্য হয়েছিল। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে অ্যাকাউন্ট বা জমা খোলা হয়েছিল এবং সে জমায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ মাত্রা আশাতিরিক্ত হারে বেড়েছিল। দেশকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্য করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাকিস্তানি বিরোধিতা সত্ত্বেও স্বাধীনতা লাভের এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাংকের সদস্য করানো হয়েছিল।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে গ্রহণ করা হয়েছিল ব্যাপক পদক্ষেপ। রেললাইন স্থাপন, রেল ইঞ্জিন আমদানি ও মেরামত, রেলবগি আমদানি, বাস আমদানি, প্রয়োজনীয়সংখ্যক খাদ্যশস্য বহনকারী ট্রাক, কার্গো ইঞ্জিন এবং অয়েল ট্যাংক ও লরি আমদানি করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে দেশে পাকা ব্রিজ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ হয়েছিল ২৩০টি। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জন্য সাতটি সমুদ্রগামী জাহাজ সংগ্রহ করা হয়েছিল, যা নিয়ে করপোরেশনের বহন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ১০ হাজার ২৮৩ টন। স্বাধীনতা লাভের দেড় বছরের মাথায় সরকার আকাশপথে পরিবহনের জন্য বিমান সংস্থার জন্য ছয়টি এফ-২৭ বিমান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু প্রথম যেদিন টেলিফোনের রিসিভার হাতে তুলেছিলেন, সেদিন ঢাকা জেলা থেকে মাত্র তিনটি জেলার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল, অন্যান্য জেলা ছিল বিচ্ছিন্ন। এমন অবস্থা থেকে সারা দেশে টেলিযোগাযোগের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করা হয় এবং মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গৃহীত পদক্ষেপের উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, ১৯৭১ সালে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫৪৭ মেগাওয়াট। সেই অবস্থা থেকে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছর শেষে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে আসে ৬৬৭ মেগাওয়াটে। বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা তত্কালীন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রফতানির গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু সরকার রফতানির পরিমাণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। মাত্র সাড়ে তিন বছরে বিশ্বের ১১৬টি দেশ থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রফতানি বাণিজ্য উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপের কারণে ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে দেশে রফতানির পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ কোটি ডলার। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু সরকারের সাফল্যের মধ্যে আরো উল্লেখযোগ্য ছিল প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন, ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার, সময়োপযোগী বাজেট প্রণয়ন, কর কাঠামো নির্ধারণ ইত্যাদি।
সর্বোপরি একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিমাপক হচ্ছে জিডিপি বা জাতীয় আয়। চলতি বাজারমূল্যে ১৯৭৩-৭৪ সালে দেশের জিডিপি ছিল ৭ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলস্বরূপ সেটি বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৭৪-৭৫ সালে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। সহজ কথায় বলতে গেলে, দেশ যেন বঙ্গবন্ধুর আজীবনের স্বপ্ন সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল, ঘাতকদের নির্মম বুলেটের আঘাত সে স্বপ্ন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরবর্তীকালে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় এতটাই ব্যর্থ ছিলেন যে অর্থনীতির সূচক পরিমাপক জিডিপি বা জাতীয় আয় দুই বছরের মাথায় বৃদ্ধি না পেয়ে বরং হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এক কথায় বলতে গেলে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে ঘাতকরা শুধু জাতির পিতাকে হত্যা করেনি, তারা স্তব্ধ করে দিয়েছিল দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে।
মো. শাহাদাৎ হোসেন এফসিএ: সাবেক সহসভাপতি
দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ










