কেমব্রিজে প্রথম শরত্কালে অমর্ত্য সেন যদি একটা কিছুতেও অত্যন্ত কষ্ট পেয়ে থাকেন, তা হচ্ছে দ্রুত দিন ফুরিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, অত আগে সূর্যাস্তের শুরুটা। মধ্যাহ্নভোজের পর পরিষ্কার দিনের আলো দেখা দিত খুব কম। তিনি যতই চারপাশে মানুষের সান্নিধ্য বেশি বেশি উপভোগ করতেন, তার শহরে দিনের পরিষ্কার আলোয় দেখতেন খুব কম মানুষ। বেলা সাড়ে ৩টায় সূর্যাস্ত যে কারোর জন্য, বিশেষত ইন্দো-গাঙ্গেয় অববাহিকা (Indo-gangetic plain) থেকে আসা লোকদের জন্য এক অমানবসুলভ অভিজ্ঞতা (Beastly experience)। অথচ অবাক হওয়ার মতো নয় যে বহুকাল ধরে ব্রিটিশদের বদ্ধ ধারণা তারা এমন এক সাম্রাজ্যের অধিকারী, যেখানে সূর্য কখনো অস্ত যায় না।

দুই.

ইতালি সফরের পরিকল্পনা তার মনে ছিল ভারত ত্যাগ করার যথেষ্ট আগে। শান্তিনিকেতন ও কলকাতায় পড়াশোনার সময়টায় রেনেসাঁ চিত্রকর্ম দেখে অভিভূত হওয়ার পর থেকে সেই মোহটা কেবল বাড়তে থাকে এবং বছরের পর বছর তিনি ইতালীয় রেনেসাঁর ছবির পুনরুৎপাদিত বই কম মূল্যে সংগ্রহ করেছিলেন। প্রথম দিককার Giotto, Fra Angelico এবং পরবর্তী সময়ে Leonardo, Micheloangelo, Titian প্রমুখ শিল্পীর মহৎ শিল্পকর্ম দেখে কল্পনা করতে থাকেন একদিন ইতালিতে গিয়ে স্বচক্ষে তাদের বাস্তব কর্মধারা দেখবেন। সেই ইচ্ছাটা তার মনে আরেকবার উঁকি দিল যখন ১৯৫৩ সালে সেপ্টেম্বরে জাহাজে করে ব্রিটেন যাওয়ার পথে ইতালির উপকূল দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল।

অন্য একটা কারণেও ইতালিতে যাওয়ার এ দৃঢ়সংকল্প বিপুলভাবে বেগবান হয়েছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকতে তিনি ইতালির নব্য বাস্তববাদী (Neorealist) ছবি দেখেছিলেন, যা একটা ছবি কীভাবে অবহিত/যোগাযোগ করে সেটি সম্পর্কে তার উপলব্ধিতে রূপান্তর এনে দিয়েছিল। তাছাড়া কলকাতার কফি হাউজে বসে ইউরোপের রাজনীতির আলোচনা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়া বিভিন্ন বই থেকে জেনেছিলেন রেনেসাঁ আন্দোলন কীভাবে ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছিল তার বিবরণ। অথচ তিনি তখনো জানতেন না, ইতালির রেনেসাঁয় জড়িতদের ভালোভাবে জানতে শিগগিরই তার ইতালি আসা হবে।

তিন.

কিন্তু ইচ্ছা যে ঘোড়া নয়। ইংল্যান্ড থেকে নৈকট্যের কথা না হয় থাক, ইতালি দর্শনের পথে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে দাঁড়াল অর্থসংস্থান। কেমব্রিজের প্রথম বর্ষের জন্য বাবার বরাদ্দকৃত বাজেট ছিল ৬০০ পাউন্ড। এটা এক বছরের স্বাভাবিক খরচের জন্য পর্যাপ্ত কিন্তু এর বেশি না। অমর্ত্য সেন নিজেকে বোঝালেন, যেকোনো সন্তোষসাধনের নিমিত্ত তাকে কিছু স্বীকৃত খরচ কমাতে হতে পারে। এটা ঠিক যে শিক্ষামূলক আগ্রহ থেকে বিদেশ সফর হলে একটা ভালো অজুহাত হতে পারত কিন্তু তিনি যে তার প্রিয় শিল্পকর্ম, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্র এবং সুন্দর ইমারত (তালিকাভুক্ত ইমারতের প্রায় অর্ধেক ইতালিতে) দেখতে সহজ প্রেয়বাদসুলভ প্ররোচনা থেকে প্রলুব্ধ হয়েছিলেন। যাই হোক, এক বন্ধুর সূত্রে এবং সহায়তায় একটা সস্তা টিকিট পেয়ে মিলান, ভেনিস, ভেরোনা, ফ্লোরেন্স, পেরুজিয়া ও রোম নিয়ে ছয়টি শহর ঘোরাঘুরির ব্যবস্থা প্রায় পাকাপোক্ত হয়ে গেল। চার্টার্ড ফ্লাইটে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া এবং স্থানীয় পরিবহনসহ সাকল্যে খরচ ৫০ পাউন্ড। সুখবরের এখানেই শেষ নয়, যাওয়ার আগের মুহূর্তে জানতে পেরেছিলেন ট্রিনিটি তাকে সিনিয়র স্কলার নির্বাচিত করেছে।  স্বাভাবিকভাবেই, মিলানে যাওয়ার চার্টার্ড ফ্লাইটে উঠে নিজেকে প্রায় সম্পদশালী অনুভব করতে শুরু করলেন অমর্ত্য সেন (‘আনন্দধারা বহিছে  ভুবনে’)।

চার.

তার ইতালি সফর বিরাট সফলতার সঙ্গে সমাপ্ত হয়েছিল। সহযাত্রীরা খুবই প্রীতিকর ছিলেন এবং দলে ১৮ জন যুব নারী ও তিনজন পুরুষ নিয়েও কোনো অসুবিধা ঘটেনি। মাঝারি ধরনের হোটেলে আরামদায়ক থাকা ও চমত্কার খাবার এবং ঐশ্বরিক জাদুঘরগুলোয় সাদরে অভ্যর্থিত হওয়ার অপার আনন্দ অমর্ত্যের মনেপ্রাণে; ক্ষণিকের জন্য ভাবলেন কী বৈপরীত্য, ইতালির সুস্বাদু পেস্তার বিপরীতে বর্ণ ও স্বাদ বিচ্যুত ট্রিনিটির অতি সেদ্ধ বাঁধাকপি এবং ব্রাসেলসের স্প্রাউটস। যাই হোক, ওখানে তিনি সারা দিন বিভিন্ন জাদুঘর দর্শন এবং তার আশপাশের সুন্দর জায়গায় হাঁটাহাঁটি করে অফুরন্ত সময় ব্যয় করেছিলেন।

শুধু কি তাই? তিনি ইতালীয় জীবনের হইচই এবং মদ্যপানোৎসবপ্রিয়তার (noise and conviviality) মধ্যেও খুব আনন্দ পেয়েছিলেন, কারণ ওসব তার কাছে খুব উদ্যম-উদ্দীপক বলে মনে হয়েছিল। অথচ এর বিপরীতে কেমব্রিজের জীবন ছিল নিরাবেগ। এক রাতে, সম্ভবত পেরুগিয়ায়, অমর্ত্য সেনের জানালার নিচে রাস্তার উচ্চৈঃস্বরে তার ঘুম ভেঙে যায় কিন্তু তিনি বিরক্ত বোধ না করে বরং এর মধ্যে জীবনের লক্ষণ অনুভব করলেন। সকালে নাশতার টেবিলে একমাত্র তিনিই ইতালীয়দের শোরগোল নিয়ে নালিশ করেননি; ইতালীয়রা যে কতটা অদমনীয়, সম্ভবত সেটা দেখে তার ভালো লেগেছিল।

কেউ ইতালি যাবে অথচ শেক্সপিয়র মনে থাকবে না, তা কি কখনো হয়? অন্যান্য জিনিসের মতো অমর্ত্য সেনের ইতালি সফরে সঙ্গী ছিল ‘সম্পূর্ণ শেক্সপিয়রের’ একটা কপি। থাকবে না কেন, ইতালির প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিতে যে কলকাতায় পড়া শেক্সপিয়রের বই কম অবদান রাখেনি। ইতালিতে গিয়ে কিছু সময় ব্যয় করেছেন পড়া আর দেখার মধ্যে যোগসূত্রের সন্ধানে—যেমন জয়ী হওয়ার পর ওথেলো ভেনিসের কোন জায়গায় পৌঁছেছিল কিংবা ভেরোনায় প্রটেয়াস অন্য ভদ্রলোকের সঙ্গে ‘একটা এপ্রিলের দিনের অনিশ্চিত গৌরব’ সম্পর্কে কোথায় কথা বলেছিল ইত্যাদি। অমর্ত্য একবার ভেবেছিলেন ইতালি সফরের ধারণা-সংবলিত শেক্সপিয়রের ডায়েরিটা যদি লেখা হয়ে থাকে তাহলে সেটা পড়ে আসলে খুব ভালো করতেন। কিন্তু সম্ভবত শেক্সপিয়র কখনই ইতালি যাননি, পরবর্তী সময়ে শোনা এ খবর তাকে ভীষণভাবে হতাশ করেছিল।

অবশ্য আশার সংবাদও অপেক্ষা করছিল অন্য জায়গায়। চমত্কার ইতালি ভ্রমণ শেষ হওয়ার মুহূর্তে শুনলেন কেমব্রিজে গ্রীষ্মকালীন ছুটি সবে শুরু হয়েছে এবং তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আরো কিছুদিন থাকবেন। অন্যরা যে যার পথে গেল, তিনি বিদায় জানালেন এবং সবাই চিঠি চালাচালি করার প্রতিজ্ঞা করে থাকলেও কখনো তা কেউ করেননি। অমর্ত্য সেন একাই রোম থেকে উত্তরে ডোলোমিটস গিয়ে এক যুব হোস্টেলে থাকলেন; চলন্ত মোটরযান থামিয়ে কিংবা মাঝেমধ্যে ট্রেন বা বাসে ছাত্রদের নির্ধারিত ভাড়ায় এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করলেন।

ডোলোমিটসের পাদদেশে ট্রেনটোয় গিয়ে একজনের কাছে জানতে পেলেন পর্বতের ওপর নাকি একটা যুব হোস্টেল আছে, তবে উপরে যেতে দ্রুত হাঁটায় প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। কালবিলম্ব না করে অমর্ত্য সেন বোঁচকাবুঁচকি, বহনযোগ্য থলে (Rucksack) পিঠে বেঁধে পর্বত আরোহণে শক্তি তৈরি করে হাঁটা দিলেন। কিন্তু হায়, পর্বতের ওপর পৌঁছে দেখলেন যুব হোস্টেলটি তখনো নির্মাণাধীন এবং ওখানে বাথরুম, টয়লেট সবই ছিল কিন্তু সেগুলোয় ছিল না কোনো দরজা।

পাঁচ.

ইতালিতে হাত উঠিয়ে সংকেত দিয়ে গাড়ি থামিয়ে চলাচল করা যেত—তা ভাড়া দিয়ে কিংবা না দিয়ে হোক। একে বলে  হিচ-হাইকিং (Hitch-hiking) বা সংকেত সফর। এ সুযোগের সঙ্গে যুব হোস্টেলে রাতযাপন করে জায়গা দর্শন করার অভাবনীয় অভিজ্ঞতা তার মনে এমন এক গভীর প্রভাব ফেলল যে তিনি ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জার্মানিসহ ইউরোপের অন্যান্য জায়গা ঘুরে দেখার জন্য বারবার ভ্রমণে যেতে উৎসাহী হলেন। অবশ্য পরে এ সফরগুলো একটা একটা করে ঘটেছিল—কখনো বন্ধুসহ, কখনো বন্ধুবিহীন।

যেমন ১৯৫৫ সালে ইতালি সফরের পরের গ্রীষ্মে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা কিছু বন্ধুকে নিয়ে নরওয়ে ও সুইডেন সফরের প্রয়াস নিলেন। হারউইচ থেকে ফেরিতে করে নরওয়ের বারগেনে পৌঁছে হাতের ইশারায় গাড়ি থামিয়ে পথিমধ্যে পর্বত উপভোগ করাসহ দেশের অনেক কিছু দেখলেন। কিন্তু অসলোর পর যখন স্টকহোমে যাওয়ার জন্য সুইডেনে ঢুকলেন, হিচ- হাইকিংয়ের আনন্দ খুব দ্রুত কমে আসতে লাগল; জায়গাটা বৃষ্টিমুখর হয়ে উঠছিল, তখন গ্রীষ্মের শেষ প্রায় এবং প্রতীয়মান হয়েছিল বিলীয়মান গাড়িগুলোর থামার আগ্রহ খুব কম।

ছয়.

এ হিচ-হাইকিং করার সঙ্গী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা রেহমান সোবহান। অমর্ত্য সেন  একবার বললেন, রেহমান সোবহানের লম্বা দাড়ি তাদের দুজনকে সম্ভাব্য যাত্রী হিসেবে বিবেচনা করতে চালকদের নিরুৎসাহিত করছে। অতএব, রেহমানকে একটা রেজর ব্যবহার করার জন্য অমর্ত্য সেন শক্ত সুপারিশ করলেন কিন্তু রেহমান সে প্রস্তাব দৃঢ়তার সঙ্গে নাকচ করে দিলেন। কিছুক্ষণ পর রেহমান তার অবস্থানের সম্পূর্ণ যথার্থতা অনুভব করলেন যখন একটা গাড়ি তাদের দুজনকে অতিক্রম করে আবার পেছনে ফিরে এল। গাড়ির চালক তাদের উদ্দেশে বললেন, পেছনের সিটে বসা তার শিশু লম্বা দাড়ি (রেহমানের) কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিল বিধায় শিশুটির শখ পূরণে গাড়িটা পেছাতে হলো।

এর পরের ঘটনা রীতিমতো বিস্ময়ের। শেষমেশ গাড়ির মালিক তাদের দুজনকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন, এমনকি তাদের জন্য বাড়িতে ভালো একটা নৈশভোজের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। আর সাধারণত আড্ডায় যেমনটি হয়, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ জমে উঠল, এমনকি উপমহাদেশে খাবারের নিয়মাবলি ও নিষিদ্ধকরণও বাদ গেল না। এক পর্যায়ে হোস্ট জানতে চাইলেন এটা ঠিক কিনা যে তাদের মধ্যে একজন গোমাংস খান না এবং অন্যজন শূকর মাংস পরিহার করেন। রেহমান সোবহান বললেন, অমর্ত্য সেন নিয়ম-অন্ধ  (Rule-blind) আর তাই সে খাদ্যসংক্রান্ত কোনো বিধিনিষেধ মানতে চায় না, তবে হোস্ট একদম ঠিক কথা বলেছেন যে হিন্দু সাধারণত গোমাংস খায় না এবং মুসলিম শূকর মাংস থেকে দূরে থাকে। রেহমান চাইছিলেন যে বিশেষত স্বভাব-সম্পর্কিত নৃতত্ত্ব বিষয়ে (Anthropology of behavior) ভদ্রলোক আরো বেশি করে জানুক আর তাই বলে চললেন, ‘বিধিনিষেধগুলো অবশ্য কোনোভাবেই তুলনীয় নয়। যেহেতু হিন্দুদের কাছে গরু একটা পবিত্র প্রাণী, তাই তারা গোমাংস এড়িয়ে চলে আর আমরা মুসলমানরা শূকরের মাংস ফিরিয়ে দিই, কারণ আমরা মনে করি শূকর নোংরা।’

 যখন তারা কিছু সময় ব্যয় করছিলেন সেই সূক্ষ্ম পার্থক্যজনিত আলোচনায়, তখন রেহমান একজন মহান শিক্ষকের মতো তার শিক্ষণবিজ্ঞানসংক্রান্ত দক্ষতা (Pedagogic skills) কোনো কিছু করার আনন্দ দিয়ে অবারিত করেছিলেন। যা-ই হোক, হোস্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারা উভয়ে যখন উঠতে যাবেন, এমন সময় হোস্ট তার জ্ঞান বৃদ্ধিতে অবদান রাখার জন্য অমর্ত্য সেন ও রেহমান সোবহানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। তারপর যোগ করে বললেন, আগামী দিনগুলোয় তিনি এই সংলাপ চালিয়ে যেতে চান, কারণ তিনি জানতে খুবই আগ্রহী মুসলমানরা কেন শূকর পবিত্র বলে মনে করে না!

নৃবিজ্ঞান শিক্ষা দেয়ার পর এ রকমের বাজে ফল দেখে রেহমানকে খুব দুঃখিত মনে হয়েছিল। তবে অমর্ত্য তাকে সান্ত্বনা দিলেন এভাবে—তিনি (রেহমান) যদি অর্থনীতি খুব খুব শিখে থাকতেন তাহলে সেটা শেখাতে নিয়োগ পেতে পারতেন এবং তখন নৃবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক হিসেবে তাকে আর কাজ খুঁজতে হতো না।

অবশেষে রেহমান সোবহান ও অমর্ত্য সেন অনুভব করলেন, হিচ-হাইকিং বেশ সময় নিচ্ছিল; সুতরাং বাসে করে রেলস্টেশন এবং সেখান থেকে ট্রেনে চড়ে কোপেনহেগেন যাওয়া সমীচীন বলে তাদের মনে হয়েছিল। কোপেনহেগেনে তখন বৃষ্টি হচ্ছিল না, দৃশ্যমান হয়ে উঠল অধিকতর দিনের আলো।

সাত.

আলোকিত হতে লাগল অন্য দিকও। ইউরোপ সফরের অন্যতম একটি ঘটনাবহুল অভিজ্ঞতা অমর্ত্য সেনের জীবনে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকল। ১৯৫৮ সালে পোল্যান্ডের ওয়ারসো ইউনিভার্সিটিতে দুই সপ্তাহ অর্থনীতি পড়ানোর আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি বরং অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তখনো কেমব্রিজে ডক্টরাল থিসিস জমা দেননি, আর তাই তার ভাষায়, অযোগ্য থাকা সত্ত্বেও আমন্ত্রণটি পেয়েছিলেন। আয়োজকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের পক্ষে বৈদেশিক মুদ্রায় কোনো খরচ বহন করা সম্ভব না, তবে পোল্যান্ড পৌঁছলে পোল্যান্ডের মুদ্রাসহ আরামদায়ক অবস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। এ শর্ত সত্ত্বেও পোল্যান্ড দেখার এবং সেখানকার মনোজ্ঞ মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হাতছাড়া করতে তার মন চাইল না। শুধু তাই নয়, প্রস্তাবটি তার কাছে এতই আকর্ষণীয় মনে হলো যে এমনকি তার সে সময়ের একেবারে খালি পকেটেও ভ্রমণের ঝুঁকি নেয়া যায় বলে তিনি ভাবতে শুরু করলেন। অতএব, সময় নষ্ট না করে তিনি নিজেই লন্ডন টু ওয়ারসো একটা দীর্ঘ ট্রেন ভ্রমণের টিকিট কিনলেন—বার্লিনে ট্রেন পরিবর্তন সাপেক্ষে। প্রথমাংশে অর্থাৎ লন্ডন থেকে বার্লিন কোনো সমস্যা হয়নি কিন্তু বার্লিনে অনেক বিলম্বে ট্রেন পৌঁছার কারণে তিনি ওয়ারসোমুখী ট্রেনটি ধরতে ব্যর্থ হন বিধায় বার্লিনের বিরাট রেলস্টেশনে ২৪ ঘণ্টা কাটানোর ফ্যাসাদ এসে হাজির হয়। অথচ তখন এমনকি এক কাপ কফির জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ তার পকেটে ছিল না—বিশ্রামের জন্য কক্ষ আর বিছানা-বালিশ তো দূরে থাক। 

এ ক্ষুদ্র সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে বের করতে অমর্ত্য সেন যখন প্লাটফর্মে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে কোথা থেকে যেন এক ভারতীয় চেহারা উদিত হলো। আগন্তুক এগিয়ে এসে পরিচয়  দিল—শ্যামসুন্দর দে, কলকাতা থেকে বার্লিনে বিদ্যুৎ প্রকৌশল পড়ার জন্য এসেছে এবং এ মুহূর্তে তার মেয়ে বন্ধু রেলস্টেশনের সুবিধাদি ব্যবহার করতে চেয়েছিল বলে এখানটায় আছে। অন্যদিকে অমর্ত্য সেন কেন এখানে, এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকটা বেপরোয়া হয়েই শ্যামকে তেমন বিশ্বাসযোগ্য নয় গল্পটি বলতে হয়েছিল।

(কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ভাইরে ভাইরে) তারপর অদ্ভুদ ঘটনা ঘটতে লাগল। পূর্ব জার্মানিতে ঘোরাফেরা এবং পূর্ব বার্লিনে বিনা বাধায় চলাচলের জন্য শ্যাম দুটো পাসের ব্যবস্থা করে দিল অমর্ত্য সেনকে; শ্যাম ও তার জার্মান মেয়ে বন্ধু রাতে ডিনারে নিয়ে গেল এবং পরিশেষে শ্যাম যেখানে পড়ত সেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের একটা সুন্দর অতিথি কক্ষে সাময়িক বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিল। পরের দিন ওরা যখন ক্লাস করছিল, অমর্ত্য সেন পূর্ব বার্লিনের এক অংশ এবং পশ্চিম বার্লিনের একটা বড় অংশ ভালো করে দেখে নিলেন। এরপর বিকালের দিকে শ্যাম ও তার বন্ধু তাকে বিদায় জানানোর জন্য স্টেশন পর্যন্ত গেল। যেহেতু অমর্ত্য সেন তার ভ্রমণের দ্বিতীয় অংশে কোনো সমস্যায় পড়তে পারেন, এই ভেবে শ্যাম তার বুকপকেটে কিছু অর্থ গুঁজে দেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে দিল। ‘কিন্তু এই অর্থ তোমাকে কীভাবে পরিশোধ করব?’ অমর্ত্য জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে শ্যাম জানাল সে ১৪ দিন পর, অমর্ত্য সেনের ফিরতি যাত্রায়, বার্লিন স্টেশনে থাকবে এবং তখন দেখা যাবে কীভাবে পরিশোধ করা যায়।

অমর্ত্য সেনের ওয়ারসো ট্রিপ ভালোই চলছিল—ওখানকার ছাত্রদের সঙ্গে সাক্ষাৎ উপভোগ করলেন এবং খুব কাছাকাছি থাকা জায়গাগুলো দেখে নিলেন। এক পর্যায়ে এক বামপন্থী সহকর্মী অমর্ত্য সেনের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাকে নিয়ে বাথরুমে ঢুকলেন এবং সরকার নিয়ে তার সমালোচনা যেন কেউ শুনতে না পায় সেজন্য সব পানির ট্যাপ একসঙ্গে খুলে দিলেন।

ফিরে আসার পথে অমর্ত্য সেন শ্যামকে বার্লিন রেলস্টেশনের একটা বেঞ্চে বসে থাকতে দেখে তার  প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

এ ঘটনার প্রতিফলনে অমর্ত্যের কাছে দুটো বিষয় বের হয়—একটা হচ্ছে তিনি কত ভাগ্যবান। আবার এও বুঝতে পেরেছিলেন যে মানবদরদ ও সাহায্যের এ গুণগুলো কতখানি বিস্তৃত হতে পারে। কেউ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করা যদি শ্যামের মূল্যবোধের একটা দিক হয়, অন্য দিক হচ্ছে তার প্রাপ্ত মামুলি বৃত্তির অর্থ দিয়ে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিতজনকে বিশ্বাস করার প্রবণতা। ইমানুয়েল কান্ট হয়তো আমাদের সাবধান করে ঠিক কাজটিই করেছিলেন—মানবিকতার আঁকাবাঁকা কাঠ থেকে কোনো সোজা বস্তু আদৌ তৈরি হয় না (‘Out of the crooked timber of humanity, no straight thing was ever made’)। কিন্তু অমর্ত্য সেন মনে করেন, মানবিকতারও সোজা কাঠ থাকে; যা তার প্রশংসনীয় ভালোত্ব দিয়ে আমাদের অবাক করতে পারে। এখানে যেমন বিশ্বাসঘাতকতা, সহিংসতা, নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও দুর্ভিক্ষ আছে, তেমনি আছে উদারতা ও দয়া।

আট.

ইউরোপের যেসব জায়গা অমর্ত্য সেন দর্শন করেছেন, তার মধ্যে যেখানে বারবার ফিরে যেতে চেয়েছিলেন সেটা হলো প্যারিস—সেখানকার অপূর্ব সাংস্কৃতিক উপহার (তালিকার শীর্ষে লুভার মিউজিয়াম) এবং নিকটবর্তী জায়গার আনন্দ। শিগগিরই তার প্যারিস যাওয়া নিয়মিত হলো। কখনো কেমব্রিজের বন্ধুদের সঙ্গে প্যারিসে পা রাখতেন এবং বন্ধুরা তাকে এই বিমুগ্ধ নগরের চারদিকের খবারখবর—যেমন সস্তা হোটেল, ভালো খাবার, দর্শনীয় স্থান ইত্যাদি—রাখার জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে সাব্যস্ত করত। আর এ কাজগুলো করতে গিয়ে তিনি ভাবতেন, ‘আমার অর্থনীতি যদি ব্যর্থ হয়, তখন একটা ট্যুর কোম্পানি চালাতে সম্ভবত অসুবিধা হবে না।’

মুশকিল হলো, হিচ-হাইকিং করে তো আর ইংল্যান্ড থেকে প্যারিসে যাওয়া সহজ ছিল না, তাই তিনি খুঁজে বেশকিছু সস্তা রাস্তার সন্ধান পেয়েছিলেন। তবে প্যারিস যাওয়ার একটা পদ্ধতি অবশ্য তিনি খতিয়ে দেখেননি। আর সেটা হলো ব্রিটিশ ও ফরাসির অন্তর্নিহিত শক্তি ছাড়িয়ে যাওয়া অথবা তাদের সমকক্ষ হওয়া। সাঁতার কেটে ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার খবর নতুন নয়। ফরাসি আর ইংরেজ হরহামেশাই এ প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়। অবশ্য কিছু ভারতীয়ও এ শক্তি প্রদর্শনে মত্ত ছিল। একদিন অমর্ত্য সেনের কানে একটা ঘোষণা এল—কলকাতার এক ‘বীর বাঙালি’ কাজটি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। খুব উৎসাহ নিয়ে তিনি কাগজে সাঁতারুর প্রস্তুতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে লাগলেন—এমনকি প্রস্তুতি নিয়ে সময়ে সময়ে তার দেয়া বিবৃতিও মনোযোগ সহকারে আমলে নিতেন। তারপর এল সেই শুভদিন যখন সেই ভারতীয় ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার কেটে অতিক্রম করার কাজে অংশগ্রহণ করবেন। ভারতীয় বীর সাতারু কী রকম করছেন, সে খবর পাওয়ার জন্য পরের দিন সকালেই অমর্ত্য সেন খপ করে একটা কাগজ হাতে নিয়ে দেখলেন, ইংলিশ চ্যানেলের অর্ধেক গিয়ে তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। যখন উদ্ধারকারীরা প্রশ্ন করছিল তিনি খুব ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ বোধ করছেন কিনা, সাঁতারু সবাইকে জানালেন চ্যালেঞ্জ পরিত্যাগ করার কারণ ‘এগুলোর কোনোটাই না।’ তার পরিবর্তে তিনি ব্যাখ্যা দিলেন এ রকম—সাঁতার কাটতে কাটতে তিনি চিন্তা করছিলেন এগুলো করছেন কেন এবং সব শেষে এর ঠিক হেতু কী। অমর্ত্য সেন মনে মনে ভাবলেন, চ্যানেলের অর্ধেক গিয়ে ফিরে আসা এ বাঙালি নায়কের স্বাভাবিক অবস্থায় আসার বিজ্ঞপ্রসূত চিন্তা আশ্বাসদায়ক।

নয়.

একবার জার্মানির রাইন নদী বেয়ে প্রমোদ ভ্রমণের শখ জাগে অমর্ত্য সেনের। এক পর্যায়ে জার্মান থেকে একদল বুদ্ধিজীবী ধরনের (Highbrow) ছাত্র এসে পাশে বসে জানতে চাইল, তিনি কোত্থেকে এসেছেন। তার উত্তরে ইন্ডিয়া ও বেঙ্গল দুটোই উচ্চারিত হচ্ছিল শুনে, ওই দলের বিশেষ করে আগ্রহী একজন জানতে চাইল বেঙ্গলের প্রাচীন নাম কী। যেহেতু মাত্র কয়েক শতক আগ পর্যন্ত যুক্ত বাংলা জন্ম নেয়নি, তাই অমর্ত্য সেন বললেন ‘বঙ্গ’, যেটা যুক্ত বাংলার গুরুত্বপূর্ণ আগে এর বড় এক অংশ হিসেবে ছিল। এ জার্মান বন্ধুদের একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কঙ্গোর ঠিক পাশে বঙ্গ, আমার এ চিন্তা কি ঠিক?’ তাকে হতাশ করে অমর্ত্য সেন কাগজের ন্যাপকিনে বিশ্বের মানচিত্র এঁকে কঙ্গোসহ আফ্রিকা, বঙ্গসহ ইন্ডিয়ার অবস্থান এবং এর মাঝে থাকা দেশগুলো দেখালেন। দুই দেশের মধ্যে এমন বিস্তর দূরত্বের খবরে আঘাত পেয়ে জার্মান মেয়েদের একজন খুব উত্তেজিত হয়ে ঘোষণা দিল, ‘যে করে হোক ওদেরকে একত্রে পেতে হবে আমাদের।’

অমর্ত্য সেন বললেন, ‘সহজ নয়, কারণ ভূগোল বললেই পরিবর্তনযোগ্য নয়। দেশগুলো যেখানে আছে সেখানেই থাকে।’ তখন জোর দিয়ে মেয়েটি বলল, ‘তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ না, আমাদের পুরো পৃথিবী একত্রে পেতে হবে।’ পুনরুক্তি করে সে বলল, ‘আমরা সবাই একত্রিত হতে চাই। বুঝেছ?’ অমর্ত্য সেন যখন ওর কথার মর্ম অনুধাবনে তত্পর, তখন মেয়েটি তাকে সাহায্য করার জন্য আরেকটি চমত্কার বক্তব্য দিল, ‘আমরা সবাই প্রতিবেশী।’

‘যে কেউ যে কারো প্রতিবেশী হতে পারবে, এই তুমি বোঝাতে চাও?’ অমর্ত্য সেনের পাল্টা প্রশ্ন। ‘হ্যাঁ, কিন্তু এর জন্য কাজ করতে হবে’—এমন জোরে মেয়েটি সহমত দেখাল যেন হুড়মুড় করে সে এখনই বাধা অতিক্রম করে তাত্ক্ষণিক তার বৈশ্বিক কাজ শুরু করতে যাচ্ছে।

অপ্রত্যাশিত সংলাপটি নিয়ে ভাবতে ভাবতে অমর্ত্য সেন ছোট একটা কক্ষে ঘুমাতে গেলেন। অনুভব করলেন, কীভাবে জার্মানির যুদ্ধোত্তর তরুণ প্রজন্ম যুগ যুগ ধরে জেঁকে বসা জাতীয়তাবাদী চেতনার কাঠামো থেকে বের হতে শুরু করেছে। পঞ্চাশের দশকে শোনা মেয়েটির বক্তব্য যেন সম্মান পেল সিরিয়ান সংকট নিয়ে দেয়া এঞ্জেলা মারকেলের যুক্তিতে—‘আমাদের বৈশ্বিক প্রতিবেশীদের প্রতি যৌক্তিক প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে জার্মানির উচিত বেশিসংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় দেয়া।’

রাতে ভালো ঘুমের জন্য এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভোর সমাগত। পরিশ্রান্ত এবং উদ্দীপ্ত অমর্ত্য সেন অদ্ভুতভাবে আনন্দিতও।

 

আব্দুল বায়েস: অর্থনীতির অধ্যাপক; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক