সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ব্যাংকিং খাতের অতি প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কিছু সংস্কারের প্রস্তাব করেছেন। যদিও সুনির্দিষ্ট পন্থা সম্পর্কে তেমন একটা বলা হয়নি, তবু আশা করা হয়েছে একটি ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা হবে।

সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কার দীর্ঘদিন থেকে উপেক্ষিত হয়ে আসছে। আমাদের দেশের বর্ধিষ্ণু খেলাপি ঋণ (এনপিএল) সম্পর্কে অনেক কিছু বলা ও লেখা হয়েছে। এনপিএল কমানো যায়নি। মনে হচ্ছে আলোচ্য ইস্যু নীতিনির্ধারক ও প্রস্তাবিত সংস্কারের কেন্দ্রীয় মনোযোগের বিষয় হিসেবে রয়ে যাবে।

অবশ্য আমাদের এ মানসিকতা এড়ানো উচিত হবে না যে খেলাপি ঋণ কেবল আমাদের দুর্বল সুশাসন কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার ফল। 

রাজনৈতিক প্রভাব, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি সবই আমাদের ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অবনমন ঘটিয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অধিক সাধারণ ও বৃহৎ পরিসরে কেলেঙ্কারি ও লুটপাট হয়ে আসছে। উল্লেখ্য, হলমার্ক-সোনালী ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

আলোচ্য অর্থ কেলেঙ্কারির পেছনে মূল কারণ ছিল দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চর্চা ও যথাযথ অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি। এমনকি এ ঘটনায় যারা দায়ী ছিল, তাদের যথাযথভাবে বিচারের আওতায় আনা হয়নি। এটি আমাদের সুশাসন কাঠামোয় প্রোথিত সার্বিক জবাবদিহির ঘাটতির নির্দেশক।

রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ দেয়া দুর্ভাগ্যজনক কিন্তু দেশে এটি সাধারণ চর্চা। এটি কেবল ক্ষুদ্র একটি মহল বা একটি খাতে ঋণের কেন্দ্রীভবন ঘটাতে পারে। ফলে ঝুঁকি বাড়বে এবং একচেটিয়াপনা উৎসাহিত হবে। ব্যাংকিং কমিশন যদি স্বাধীন না হয় এবং এসব রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত হতে না পারে, তাহলে অর্থবহ সংস্কারের সুযোগ কমই রয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে যেহেতু বেশকিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, মনে হচ্ছে ব্যাংক কমিশন একাই সবকিছু সমাধান করতে পারবে না। সুশাসন সমস্যার সমাধানে ব্যক্তি খাতের অংশীজনরাও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যাংকগুলোকে তাদের ঝুঁকি প্রশমনে যত্নশীল হতে হবে এবং ঋণ ছাড়ের আগে পর্যাপ্ত ডিউ ডিলিজেন্স বজায় রাখতে হবে।

বর্ধিষ্ণু পরিপালন শর্ত পূরণ এবং আর্থিক অপরাধ ও সংকটের জটিল প্রকৃতির জন্য সামনের বছরগুলোয় পর্ষদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনার সামর্থ্য ও জ্ঞান বাড়াতে হবে। বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করায় আমাদের জন্য এটি বিশেষভাবে প্রয়োজন।

যে কেউ লক্ষ করবেন, আমরা যেভাবে ব্যাংক পরিচালনা করি, তাতে বড় ধরনের সংযোগহীনতা (ডিসকানেক্ট) বিদ্যমান। আমাদের এখানে অ-আনুপাতিক সংখ্যক রিটেইল শাখা রয়েছে। আপেক্ষিকভাবে ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ব্যাংকের শাখার কেন্দ্রীভবন অন্যতম সর্বোচ্চ।  

আমাদের অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা উচিত এটি জরুরি কিনা কিংবা রিটেইল শাখাগুলো অদক্ষতার প্রধান উৎস কিনা, বিশেষত যেহেতু এসব শাখা দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ কিছু এলাকায় অবস্থিত।

সর্বোপরি প্রযুক্তির শক্তি সম্ভবত বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং খাতকে ব্যাহত করবে এবং সেদিক থেকে বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। গত বিশ বছরে নাটকীয়ভাবে বাংলাদেশে মোবাইল সেবার অভিনব মাত্রায় গ্রাহক বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে এর গ্রাহকভিত্তি অধিকতর বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। &dquote;&dquote;

২০১৩ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রতি এক লাখ ব্যক্তির বিপরীতে মোবাইল মানি এজেন্ট ১৮৫ দশমিক ৫৬ থেকে ৬৬৬ দশমিক ৭৬ বেড়েছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মুনাফাযোগ্যতা কমে গিয়ে রিটেইল শাখাগুলো অপ্রয়োজনীয় বোঝায় পরিণত হবে।

অধিকন্তু, যথেষ্ট সন্দেহ আছে যে অধিক ব্যাংক মৌলিকভাবে বাজার চাহিদা দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে কিনা। গত দশক কিংবা তারও অধিক সময়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগই রাজনৈতিক প্রণোদনা ও সম্পৃক্ততায় অনুমোদন পেয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কাজেই এটি বিস্ময়ের নয় যে এসব ব্যাংক উচ্চখেলাপি ঋণ ও লোকসানের বোঝায় জর্জরিত হতে পারে।

দুর্বল সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা ব্যাংকগুলোর মুনাফা মার্জিনে হুমকি তুলে ধরে। ঋণের (সম্পদ) মেয়াদ আমানত পরিশোধের মেয়াদের চেয়ে (এক থেকে তিন বছর) অনেক বেশি, যেটি ১২ বছর পর্যন্ত হতে পারে। সময়ের এ ব্যবধান-অমিল বাজার, তারল্য ঝুঁকিসহ ব্যাংকগুলোয় অসংখ্য ঝুঁকি উন্মোচন করে।

ব্যাংকিং খাতে প্রডাক্ট অফারিং আরেকটি ক্ষেত্র, যেখানে লক্ষণীয় উন্নতির সুযোগ আছে। বন্ড ও ইকুইটি মার্কেট এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ঘাটতিতে সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতের মাত্রাতিরিক্তভাবে ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার একটি প্রবণতা বিরাজমান।

যদিও বাজেটে নিত্যনতুন আর্থিক উপকরণ (ফিন্যান্সিয়াল ইনস্ট্রুমেন্ট) সৃষ্টির ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, তবে তা খুব একটা সহজ হবে না। বিনিয়োগকারীরা উচ্চসুদ আশা করেন এবং তারা করপোরেট বন্ডের চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজের সঙ্গে বেশি পরিচিত। 

এভাবে এক্ষেত্রে এক ধরনের সচেতনতা ঘাটতি আছে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা বন্ড মার্কেটে বিনিয়োগে অনিচ্ছুক। ইস্যু করার উচ্চব্যয় এবং পুঁজিবাজারের অন্য প্রতিবন্ধকগুলো বন্ড বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরুৎসাহিত করে। আমরা আমাদের বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ঘটাতে পারব কিনা, তা নির্ভর করবে বন্ডের তারল্য, প্রয়োজনীয় জামানতীকরণ এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণগুলোর (ইনস্ট্রুমেন্ট) সিকিউরিটাইজেশনের ওপর। 

একটি জোরালো বন্ড মার্কেট প্রতিষ্ঠার পথনকশায় অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, বন্ড ইস্যু করার ব্যয় কমানোর প্রচেষ্টা এবং ইস্যুকারী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

আমাদের ব্যাংকগুলো প্রডাক্ট অফারিংয়ের ক্ষেত্রেও সুদ উপার্জনকারী উপকরণগুলোর ওপর বেশি মনোযোগ দেয়, যার সঙ্গে উচ্চমাত্রার ঋণ ঝুঁকি ও স্থিতিপত্র ঝুঁকি যুক্ত থাকে। ব্যাংকগুলো আয়মুক্ত পণ্যভিত্তিক মডেলে স্থানান্তর হলে এক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকির উন্মোচন কমে আসতে পারে। এ ধরনের ব্যাংকিং পণ্যের উদাহরণ হতে পারে এটিএম ফি, হিসাব যাচাই ফি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা সেবা, পুঁজিবাজারসংক্রান্ত পণ্যগুলো এবং অন্য পরামর্শমূলক পণ্য সেবা।

এ রূপান্তর সফল করতে হলে নিজস্ব গ্রাহকসেবা ও সুনাম তৈরিতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই গ্রাহক আস্থা অর্জন এবং ব্র্যান্ড আনুগত্য তৈরিতে সচেষ্ট হতে হবে। নতুন ও কার্যকর প্রযুক্তিগত প্লাটফর্মগুলোয় অধিক বিনিয়োগ আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামনে এগিয়ে নেবে।

ব্যাংকিং খাতে সংস্কার পদক্ষেপের ক্ষেত্রে মানবসম্পদে বিনিয়োগও অন্যতম প্রধান উপাদান। ব্যাংকগুলোর মানবসম্পদ বিভাগগুলোকে তাদের লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে গুণভিত্তিক ও নৈতিক হওয়া উচিত। এটি কর্মীদের কর্তৃক পরিপালন নজরদারি এড়ানো, অত্যধিক ঝুঁকি নেয়ার আচরণ এবং স্বজনতোষণ কমাতে পারে।

প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে আমাদের ব্যাংকিং খ