নবলব্ধ স্বাধীনতার সূর্যস্নাত নতুন রাষ্ট্রগুলো গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে নিজেদের একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত করে। শীতল যুদ্ধের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তাদের অনুষঙ্গী সহযোগে গঠিত দুই বলয় থেকে পৃথক অস্তিত্বের বলিষ্ঠ ঘোষণা দেয়া হয়েছিল; সম্মিলিতভাবে গোষ্ঠীস্বার্থ অর্জন এবং সংঘর্ষ এড়িয়ে বিশ্ব শান্তি স্থাপনে ভূমিকা পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে এ নবগঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (‌ন্যাম) ছিল অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো নিয়ে গঠিত মুখ্যত একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যের অনুসারী। বিরোধী দুই গ্রুপ রাজনৈতিক দিকে জোটনিরপেক্ষ। গত শতকের শেষ দশকে শীতল যুদ্ধের নাটকীয় পরিসমাপ্তিতে তার প্রয়োজন ফুরাল। ২০০৯ সালের ‘‌ন্যাম’ শীর্ষ সম্মেলনেই এটা বিশেষভাবে প্রতিভাত হলো। সে সালেই ব্রিকসের প্রতিষ্ঠা। 

বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে ২০০১ সালে উন্নত বিশ্বের জি৭-এর বাইরে সম্ভাবনাময় উন্নয়নশীল দেশগুলো নিয়ে একটি মুখ্যত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গ্রুপ গঠনের প্রয়োজন অনুভূত হলো। চারটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া ও চীন তাদের দেশের নামের আদ্যক্ষরের সমন্বয়ে BRIC নামানুসারে এ গ্রুপের উন্মেষ সূচিত করল। ২০০৯ সালের ১৬ জুন রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম শীর্ষ সম্মেলন। অর্থনৈতিক শক্তিতে ও ব্যাপ্তিতে ওই সব দেশের সঙ্গে তুলনীয়ভাবে শক্তিশালী না হলেও সম্ভাবনাময় এবং অপরিহার্য আফ্রিকা মহাদেশকে প্রারম্ভিক প্রতিনিধিত্ব করার জন্যই পরবর্তী বছরই অন্তর্ভুক্ত হলো সাউথ আফ্রিকা। দেশটির নামের আদ্যক্ষর ‘‌S’ সমন্বিত হয়ে সংস্থার নামকরণ হলো ‘‌BRICS’ (ব্রিকস)।

মুখ্যত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক করোনা মহামারীর কারণে ব্রিকসের কার্যক্রম পরবর্তীকালে তেমন জোরদার হয়নি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বে সে উৎসাহ, কৌতূহল, উদ্দীপনা ও অনুসন্ধিৎসা সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে সাংঘর্ষিত মেরুকরণের সম্ভাবনা এবং অধুনা বিশ্বে মার্কিন বলয় ও ডলারের আধিপত্য এবং পশ্চিমা (মার্কিন বলয়) নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক জাঁতাকল থেকে মুক্তি লাভের অভিলাষ এ উৎসাহ সঞ্চারে জুগিয়েছে ইন্ধন। জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এই ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনকে আমি তাই একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য এবং প্রভাববিস্তারী ঘটনা বলে অভিহিত করব। বাংলাদেশী হিসেবে আমি আনন্দিত ও সন্তুষ্ট যে বাংলাদেশ এ সম্মেলনে যোগদানে আমন্ত্রিত হয়েছিল এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে অংশগ্রহণ করে সম্মেলনে এবং আনুষঙ্গিক আলোচনায় এক অতীব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। 

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা, কাঠামো সংগঠন এবং প্রবৃদ্ধি যদিও এ সংস্থার মুখ্য উদ্দেশ্য ও সুপরিকল্পিত লক্ষ্য। এ সংস্থার যে একটি বিশ্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও সুসংহত স্বার্থরক্ষার নিজস্ব ও নিরপেক্ষ প্রচেষ্টা আছে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে থাকবে তা অনস্বীকার্য। 

পঞ্চদশ এ সম্মেলনের আহ্বায়ক দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সর্বাধিক ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী দেশ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্মেলনে প্রারম্ভিক সাক্ষাতের পর বলেন, ‘বর্তমানে বন্ধু এবং ব্রিকসের সহযোগী হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি উন্নততর এবং সমতাভিত্তিক পৃথিবী গড়ে তোলার অন্বেষায়।’ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও একই সুরে বলেন, ‘আমরা আজ এক ঐতিহাসিক সূচনালগ্নে গভীরতর বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, সাধারণ স্বার্থ সংরক্ষণ ও দক্ষিণীয় জোটবদ্ধতার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দক্ষিণীয় জোটের ভূমিকা বর্ধনে অঙ্গীকারবদ্ধ।’ তবে এটা অবধারিত সত্য যে এ দক্ষিণীয় জোট কোনো সাংঘর্ষিক বা সামরিক প্রতিযোগিতায় জড়াবে না এবং সম্ভবও নয়। যুক্তরাষ্ট্রও বলেছে যে এ সংস্থাকে তারা ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে এটাকে ‘‌‍বিভিন্ন জাতীয় রাষ্ট্রের সম্মিলন হিসেবেই দেখছে, যেখানে রয়েছে তাদের বন্ধু ও প্রতিযোগীরা।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথাযথভাবেই একে বর্ণনা করেছেন—এ হচ্ছে দক্ষিণী জোটের ‘‌বাতিঘর’।

ব্রিকসকে দ্রুত সম্প্রসারণ করে সত্যিকারার্থে ‘‌দক্ষিণী জোট’ গঠনের প্রবল ইচ্ছা চীন ও রাশিয়ার ছিল। তবে এ সম্মেলনে মাত্র ছয়টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা হচ্ছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ইরান, মিসর, আর্জেন্টিনা ও ইথিওপিয়া। আগস্টের প্রারম্ভে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেদি প্যান্ডর অবশ্য প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে তারা আশা করছেন যে আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, বাহরাইন, বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, মিসর, ইথিওপিয়া ও হন্ডুরাস নতুন সদস্য হবে। অবশ্য প্রথমে ২২-২৩টি দেশের কথা শোনা গিয়েছিল এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিস্তিন, সেনেগাল ও নাইজেরিয়া। সম্ভবত যেসব দেশ জাতিসংঘে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণবিরোধী প্রস্তাবের সমর্থনে ছিল না সেসব দেশ এবং যেসব দেশের সঙ্গে চীনের জোরালো অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা রয়েছে তাদের প্রাধান্য দিয়ে একটা ব্যালান্স করার চেষ্টা ছিল। তাছাড়া অবশ্যই ছিল তেলসমৃদ্ধ ধনী দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তি। চীন তো বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির সমর্থনে প্রকাশ্য মতামত দিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ব্রিকসের সদস্য বাড়াতে ভারতের অনীহা ছিল। পরিশেষে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক কারণে এবং কোনো এক বিশেষ মতাবলম্বীদের প্রাধান্য না দেখানোর জন্যই সম্ভবত এ ছয় নতুন সদস্যভুক্তির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এ সম্পর্কে টিআরটি ওয়ার্ল্ড টেলিভিশনে সম্প্রতি একটি আলোচনায় নয়াদিল্লি থেকে সুহাসিনী হায়দার মন্তব্য করেন, ব্রিকসে যোগদানের জন্য দক্ষিণী দেশগুলোয় অভাবিত উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় শিল্পোন্নত বিশ্বের জোট জি৭-এর পরিবর্ধনে আগ্রহ দেখাচ্ছে না জোটভুক্তরা। জিডিপি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বিশ্ব বাণিজ্যের অংশ এবং জনসংখ্যার দিকে ‌ব্রিকস নিঃসন্দেহে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই শীর্ষ সম্মেলন শুধু টক শো নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া থেকে অংশগ্রহণকারী বোট স্যাং বলেন, ‘‌ইরান ও সৌদি আরবের পাশাপাশি অবস্থান বিশেষ লক্ষণীয়। আফ্রিকায় নাইজেরিয়ার আগে ইথিওপিয়া কী করে সদস্যভুক্তিতে অগ্রাধিকার পেল, তা ভাবলে মনে হয় চীনের সঙ্গে ইথিওপিয়ার গভীর সম্পর্ক এতে প্রভাব ফেলেছে।’ বেইজিং থেকে ঝাউ ইং বলেন, ‘‌চীন ও ভারতের সম্পর্কের ডাইনামিকস এক্ষেত্রে কীভাবে কার্যকরী হবে তা লক্ষণীয়। এই জোটে তো সব রকমের রাষ্ট্রই আছে। আছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ভারত ও সৌদি আরব।’

তবে একটি কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশ যে এবার ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ করেনি এতে বাংলাদেশের কোনো মর্যাদাহানি বা ক্ষতি কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো কূটনৈতিক ব্যর্থতা হয়েছে, তা মোটেই নয়। গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃত হয়েই বাংলাদেশ আলোচনায় ছিল এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক কারণে শুধু বাংলাদেশ কেন, অন্য কোনো দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশেরই অন্তর্ভুক্তি ঘটেনি। এটা নিয়ে বাংলাদেশের কোনো তাড়াহুড়োও ছিল না। বরং সদস্যপদ লাভের জন্যে সবিশেষ কোনো প্রচেষ্টা করলে তা হয়তো অন্য কোনো মিত্রদেশ, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, প্রতিকূলতার সঙ্গেও দেখতে পারত। কী দরকার ছিল ঝুঁকি নিয়ে? এমনিতেই জোটের স্বার্থেই বাংলাদেশ নির্বিঘ্নে যথাযথভাবে যথাযথ সময়েই সদস্য হবে। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই, নেই কোনো খেদ।

তবে বাংলাদেশ ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য হয়েছে এটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্রিকস যে কালে কালে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনের সামর্থ্য ও সম্ভাবনা রাখে, তা অনস্বীকার্য। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, ব্রিকস তো এখন পর্যন্ত ‘‌টক লেফট, ওয়াক রাইট’  (বাম পন্থার কথা বলে ডান পন্থায় হাঁটে) নীতি অনুসরণ করে এসেছে। তারা তো ‘‌রুলস অব দ্য নিও-লিবারেল মাল্টিলেটারাল অর্ডার’ পরিবর্তনে বা পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে না। বস্তুত পক্ষে ব্রিকস তো ঘোষণাই করেছে, কোনো ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক কোনো অবস্থা সৃষ্টি করা এটার কাম্য নয়। বরং ব্রেটন উডস সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতারও সম্পূরকের ভূমিকাই তারা পালনে ইচ্ছুক এবং তা-ই করছে। ইউএন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অনুসারেই তো ব্রিকসের সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট। এটা ঠিক যে প্রথম বছরগুলোতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান বিনিয়োগ সুবিধাদির যথাযথ ব্যবহার করে এবং উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্রিকস বিশ্ব অর্থনীতিতে পশ্চিমা দেশগুলো অর্থাৎ জি৭-এর একক নিয়ন্ত্রণ খর্ব করতে পারেনি বা এ ব্যাপারে পরিকল্পিত কোনো প্রচেষ্টাও দৃশ্যমান হয়নি। কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধ হয়েছে। ব্রিকসের পরিসর বৃদ্ধির পর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভা বলেছেন, আওয়ার ডাইভারসিটি স্ট্রেংদেনস দ্য ফাইট ফর আ নিউ ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার (আমাদের বৈচিত্র্য নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরির লড়াইকে জোরদার করেছে)। জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি জোহানেসবার্গে বলেছেন, ‘‌An overhaul of the worlds outdated, dysfunctional and unfair global financial architectures was necessary...but it won’t happen overnight. ...For multilateral institutions to remain truly universal, they must reform to reflect today’s power and economic realities; in the absence of such reform fragmentation is inevitable.’ জোহানেসবার্গে শুরু হলো সে কর্মতৎপরতার আনুষ্ঠানিক সূচনা এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এক্ষেত্রে পালন করবে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, এ এনডিবি টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি নতুন ধরনের পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যাতে বর্তমানের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর সহায়তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পূর্বশর্তসমূহ থাকবে না। এনডিবির প্রধান (এবং ব্রাজিলের ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট) ডিলমা রোসেফ তার বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে সহায়তা গ্রহণকারী উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাস্তবিক অর্থে ফলপ্রসূ হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট রামাফোসা বলেছেন, ব্রিকসের সদস্যগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্য বর্তমানে ৭৬২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং তা দ্রুত আরো বেড়ে চলছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার বক্তব্যে বলেছেন, ২০২২ সালেই সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মার্কিন ডলারে দেনা-পাওনার হিসেবনিকাশ শতকরা ২৮ ভাগ কমে গেছে এবং স্থানীয় মুদ্রায়ই ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্য আরো অধিক মাত্রায় পরিচালিত হবে। নতুন সদস্য সৌদি আরবের সঙ্গে ‘‌ব্রিকস’-এর বাণিজ্য এরই মধ্যে ১৬ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। যোগদান প্রসঙ্গে সৌদি প্রতিনিধি দলের নেতা প্রিন্স ফয়সাল বলেন, ‘‌এ পদক্ষেপ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পক্ষকে সমর্থন করার জন্য। বহুপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামো সক্রিয় করতে সৌদির নিরলস প্রচেষ্টার সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে এনডিবির সদস্য বাংলাদেশে ছোট-বড় ২৫টি প্রকল্প চলমান রয়েছে চীনের। এ ধরনের নয়টি বৃহৎ প্রকল্পেই চীনের বিনিয়োগ ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী স্বাধীনতার পর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন খাতে ঋণ ও অনুদান হিসেবে মোট ১ হাজার ৭৭ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি চীন দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৯৪ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নয়নের সম্ভাবনাময় বেল্ট অ্যান্ড রোড মহাপরিকল্পনার বাংলাদেশ একটি উৎসাহী অংশীদার। বস্তুত ব্রিকসভুক্ত ও সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বর্ধনের অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্য এনডিবি এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেছেন,‌ এনডিবি এরই মধ্যে বাংলাদেশকে দুটো প্রজেক্টের জন্য ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দান করেছে। ইন্দোনেশিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম জাকার্তা পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এনডিবি বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা বিধানে কার্যকরী হতে পারবে। বিশেষ করে যখন শিল্পোন্নত দেশগুলোকে সুদহার বাড়ানো থেকে ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনে বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে সরবরাহ চেইন। 

স্থানীয় মুদ্রায় বিনিয়োগ ও অর্থায়ন করাই এনডিবির অন্যতম উদ্দেশ্য। আর এ পদক্ষেপ টেকসই উন্নয়ন অর্জনে এগিয়ে যেতে কার্যকর সহায়তা দেবে। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন সম্প্রসারণ করে সহজেই এনডিবি উন্নয়নকারী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক (অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই) সহজতর করে তুলতে পারে। এ জাতীয় উন্নয়ন শুধু ডলারকেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়ালে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে এবং ডলার আধিপত্য কী ধরনের সংকটের সৃষ্টি করতে পারে তার অভিজ্ঞতা উন্নয়নশীল দেশের হয়েছে। ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা পড়ে যায় হুমকির মুখে। ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং টেকসই উন্নয়নে কার্যকর এবং সহজলভ্য সহযোগী হিসেবেই উন্নয়নশীল বিশ্বে বা দক্ষিণী জোটে বিশেষ ফলপ্রসূ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এনডিবি। সময়ের ব্যবধানে হয়তো প্রয়োজনবোধে একটি ‘কারেন্সি’ সৃষ্টিরও চেষ্টা করতে পারে। সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে (বণিক বার্তা, ৩১ আগস্ট ২০২৩) প্রকাশিত হয়েছে, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত ব্রিকসের নতুন সদস্য—এই দুটো দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে ব্যয় যথাক্রমে ৩ হাজার ৪৬০ কোটি ও ২ হাজার কোটি ডলার। তারা মধ্যপ্রাচ্যের ডিজিটাল অর্থনীতিকরণের বিবর্তনে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করছে। উদ্ধৃত সুইস ব্যাংক ইউবিএসের সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ আছে, মধ্যপ্রাচ্যের ডিজিটাল অর্থনীতির আকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৮ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাবে। অনুকূল পরিবেশ, সরকারি সহযোগিতা ও পর্যাপ্ত তহবিলের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতির আকার হবে বর্তমানের তুলনায় চার গুণ। বৈশ্বিক অর্থনীতির তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের সম্প্রসারণ হবে দ্রুত। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সঙ্গে ব্রিকসে যুক্ত হয়েছে ইরানও। ডিজিটাল স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের এনডিবিভুক্তি এবং ব্রিকসের সহযোগিতা নিঃসন্দেহে সহায়তার দ্বার উন্মোচন করবে। এনডিবির সদস্যদেশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্রেন্ডস অব ব্রিকস লিডারস কনফারেন্সের সংলাপে ২৪ মে আগস্ট (২০২৩) এক দিকনির্দেশনাকারী বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‌‘আমাদের মধ্যে বিভক্তিকরণের এবং আন্তর্জাতিক মূল্যবোধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতাকে ব্যাহত করতে হবে। অবলুপ্ত হতে হবে ‘‌স্যাংশন’ এবং প্রতি-স্যাংশনের চক্র। যুদ্ধ, যুদ্ধের উসকানি প্রদান এবং যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তিনি আরো বলেন, নিয়মনীতিনির্ভর বহুজাতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বজায় রেখেও আমাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ ও সুবিধার সন্ধান আমাদের করতে হবে। বহুপক্ষীয় বিশ্বে (মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড) দিকনির্দেশক বাতিঘর হিসেবে ব্রিকসের অভ্যুদয়ের প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ করেন তিনি।

ইনাম আহমদ চৌধুরী: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ