সত্তর দশকের শেষের দিকে জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা করা হয়। যেসব দেশ এ তালিকায় রয়েছে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি রোধে ও উন্নয়নের লক্ষ্যে নানা সুবিধা ও সহায়তার মাধ্যমে কাজ করতে থাকে এবং লক্ষ্য ঠিক করে দেয় দেশগুলোকে নিজেদের আর্থসামাজিক অবস্থা সুদৃঢ় করার জন্য। ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু আজ সেই তলাবিহীন ঝুড়ির দেশটি বিশ্বের অন্যতম এক উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ নিজেদের দরিদ্রতা নির্মূল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জন্মহার হ্রাসকরণ, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমানো, প্রত্যাশিত আয়ু বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে বাংলাদেশকে উন্নয়ন প্রতিযোগিতায়। এ পরিবর্তনগুলোর হাত ধরেই বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রায় দ্বারপ্রান্তে এসেছে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বিবেচিত হওয়ার জন্য কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিপিডি) মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এ তিন সূচকের কমপক্ষে দুটিতে উত্তীর্ণ হতে হয় এবং পরপর দুটি পর্যালোচনায় এ মানদণ্ড বজায় রাখতে পারলে কোনো দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। প্রতি তিন বছর পর যোগ্যতা পর্যালোচনা করা হয়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ প্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হয়। ২০১৬ সালে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করে। জাতিসংঘ ২০১৮ সালে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী ২০২১ সালে চূড়ান্তভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এ তিন সূচকে যে যোগ্যতা অর্জিত হয়েছে তা ছয় বছর ধরে রাখতে পারলেই ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। সুখবর এই যে ২০১৮ সালের মতো ২০২১ সালেও বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই যোগ্যতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। পূর্বে অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি। এখানে নিয়মানুযায়ী তিন বছর পর এলডিসি থেকে উত্তরণের ঘোষণা দেয়া হলেও বিশ্বে কভিড মহামারীর প্রভাব মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ আরো দুই বছর সময় বেশি পাবে, অর্থাৎ ২০২৪-এর পরিবর্তে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত হবে।
মূলত বর্তমানে ৪৬টি স্বল্পোন্নত দেশে প্রায় ১১০ কোটি মানুষ বসবাস করে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ। অন্যান্য দেশের তুলনায় স্বল্পোন্নত দেশগুলো আরো গভীর দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং অনুন্নত অবস্থায় রয়েছে। এসব স্বল্পোন্নত দেশ বাহ্যিক অর্থনৈতিক ধাক্কা, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, সংক্রামক রোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা এবং সর্বোপরি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়ে গেছে। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে আরো মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হতে পারলে বিশ্ব বা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়বে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে নিজেদের পক্ষে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। বিভিন্ন আঞ্চলিক এবং উপ-আঞ্চলিক ব্লকে যোগদানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়া উন্নয়নের ফলে বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তিতে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে। যেহেতু উন্নয়নশীল দেশের শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি থাকে, সেই কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আস্থা পাবেন এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে, অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। যারা এখন পর্যন্ত স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে। সুতরাং বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হলে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাপক শিল্পায়ন ও প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা কিনা দেশের বেকার সমস্যা দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া বিদেশী বিনিয়োগের ফলে দেশের রিজার্ভ আরো শক্তিশালী হবে। অনেক দেশের সঙ্গে নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বারও উন্মোচিত হবে।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর যেসব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন আমাদের হতে হবে সেগুলো হলো রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হারানো। এটা আমাদের দেশের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে দেশ এসব অগ্রাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। রফতানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকবে। অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তিতে যেসব বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আমরা ভোগ করছি সেগুলোও থাকবে না। উচ্চসুদে বৈদেশিক ঋণ নিতে হবে আমাদের। ফলে বৈদেশিক অনুদাননির্ভর এনজিওগুলোর অর্থ সংকট দেখা দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলাসহ অন্যান্য কারণে উন্নত বিশ্ব থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক অনুদান কমে আসবে, জাতিসংঘকে দেয়া চাঁদার পরিমাণ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় কারণে বেড়ে যাবে। স্বল্পোন্নত দেশের ছাত্রছাত্রীরা বিদেশে বিশেষ ছাড়সহ যেসব সুবিধা পেয়ে থাকে তার অনেকটাই হারাবে। এছাড়া ওষুধ রফতানির ক্ষেত্রে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের যে অব্যাহতি পেয়েছে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ, সেটাও আর পাওয়া যাবে না। ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতেও প্রাপ্ত শুল্ক সুবিধা হারাতে হবে, যা দেশের ওষুধ রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ৫ মার্চ থেকে কাতারের দোহায় ‘এলডিসি-৫: সম্ভাবনা থেকে সমৃদ্ধি’ শীর্ষক স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পঞ্চম জাতিসংঘ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবকে সুবিধা বাতিল না করে এলডিসি উত্তরণকারীদের পুরস্কৃত করা উচিত এমন বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি আরো বলেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর এলডিসিতে উত্তরণে তাদের পারফরম্যান্সের জন্য কিছু প্রণোদনা থাকা উচিত। আর স্বল্পোন্নত দেশগুলো (এলডিসি) অনুদান নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রকৃত কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য তাদের প্রাপ্য চায়। শুল্কমুক্ত সুবিধা না পেলেও অন্যান্য দেশের সঙ্গে যাতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারি সেজন্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে আমাদের। তাছাড়া রফতানি বাড়াতে স্বল্পমূল্যে নিজেদের জিআই পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। রফতানি বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে এনে প্রয়োজনীয় পণ্য নিজেরাই উৎপাদন করে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারলে আমাদের দেশেরই সক্ষমতা বাড়বে। জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা হবে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। তার জন্য তরুণ সমাজকে কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করতে হবে। দেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ যুগে বাস করছে। তাই আশা করা হচ্ছে এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে বাংলাদেশ। স্থানীয় উদ্যোক্তারা উৎপাদিত পণ্যের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বহুমুখীকরণ ও গুণগতমান নিশ্চিত করতে পারলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর বিষয়টি তেমন একটা প্রভাব ফেলবে না। আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় যাতে রফতানি বৃদ্ধি করা যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য গতানুগতিক দেশগুলোয় কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার সন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
মহামারী, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় আক্রান্ত এই সময়ে এসে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদের প্রস্তুত করতে আরো ব্যাপক আকারে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই এলডিসিতে বাস্তব কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য তার প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বৈশ্বিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার জন্য টেকসই সহায়তা প্রয়োজন পড়বে। তা না হলে বিশ্বের মানচিত্রে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল এবং উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশে রূপান্তরের ক্ষেত্রে আমাদের প্রাপ্তির তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি হবে। সরকারের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যেই দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করা। আর সে লক্ষ্য পূরণে সরকারের উচিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার ক্ষেত্রে আন্তরিকভাবে কাজ করা আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে শর্তাবলি নিয়ে পুনঃআলোচনা করা দরকার।
মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক










