কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ও মৌলিক দায়িত্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যেকোনো রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গতিবৃদ্ধি এবং সার্বিকভাবে বাণিজ্যের সুষম পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকা দরকার। যখন কোনো ভূখণ্ডে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তখন ওই অঞ্চলের অর্থনীতিও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্পাদনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিষয়ে সব পক্ষের আস্থা থাকতে হয়। যখন এ আস্থার সংকট দেখা দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য হ্রাস পায়, এমনকি দেশী বিনিয়োগকারীরাও পিছু হটেন। যখন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অংশীজনরাই সরে যান, তখন বিদেশী পক্ষ থেকে বিনিয়োগ আসার প্রত্যাশা করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এ নেতিবাচক প্রেক্ষাপটটি বরাবরই জটিল সমস্যা বলেই বিবেচিত হয়ে আসছে। কারণ আমাদের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে বরাবরই পুলিশকে নিয়ে আলোচনা করতে হয়।
দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগের কাজ করে পুলিশ। বাংলাদেশ পুলিশ সাধারণত রিঅ্যাকটিভ পুলিশিং প্র্যাকটিস করে থাকে। অর্থাৎ অপরাধ ঘটার পরবর্তী সময়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ঘটনার বিষয়ে অবহিত হয়ে অপরাধীকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে। এ পুলিশিং ব্যবস্থাপনায় তদন্তকাজ পরিচালনায় বিভিন্ন রকমের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে তদন্তকাজে ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা যায় এবং পুলিশ প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। যদিও আলামত ও সাক্ষ্য প্রমাণ সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়, তথাপি তদন্তসংশ্লিষ্ট অজ্ঞতার কারণে অনেক মামলা সঠিকভাবে নিষ্পত্তি হয় না। এ পুলিশিং ব্যবস্থাপনায় জনগণ একেবারেই সন্তুষ্ট নয়। দেশে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার নিয়ে অসংখ্য আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর কর্মপদ্ধতির দিকটি অনেকের নজর এড়িয়ে গেছে। এ ধরনের রিঅ্যাকটিভ পুলিশ প্রাকটিস বন্ধ করার বিষয়টি ভাবতে হবে। কাজটি সহজ নয়। পুলিশি তদন্ত অবকাঠামোকে আরো শক্তিশালী ও দক্ষ করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন জরুরি। এছাড়া সরকারের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে আধুনিকায়ন করতে হবে।
রিঅ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের বদলে আমরা ভিন্ন কোনো প্র্যাকটিস আনতে পারি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ওয়াচম্যান স্টাইল পুলিশিং অত্যন্ত জনপ্রিয়। ওয়াচম্যান স্টাইল পুলিশিং এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে পুলিশ সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের মতামতের ভিত্তিতে পুলিশিং প্রয়োগ করার চেষ্টা করে থাকে। অর্থাৎ কোনো একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে উক্ত থানা পরিচালিত হয় এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট থানার প্রত্যেক ইউনিয়নের জন্য আলাদা আলাদা সাব-ইন্সপেক্টরকে দায়িত্ব প্রদান করে থাকেন। এখন যদি থানার ওসি একটি থানাধীন প্রত্যেকটি ইউনিয়নের জনগণের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যকে উক্ত এলাকার প্রয়োজনীয়তা জেনে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে সেটিই ওয়াচম্যান স্টাইল পুলিশিং ব্যবস্থাপনা। এর মাধ্যমে ওই এলাকায় কোন অপরাধের মাত্রা বেশি, কখন পুলিশের টহলের প্রয়োজন রয়েছে, মাদক প্রতিহতে যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি সামগ্রিক বিষয় সহজে জানা যায়। আর যখন সার্বিক পরিস্থিতির ধারণা পাওয়া যায়, তখন তদানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াও সহজ হয়। আমাদের মতো জনসংখ্যাবহুল রাষ্ট্রে এ ধরনের পুলিশিং চালু করা যেতে পারে। কারণ আমাদের দেশে এত বেশি মানুষ যে সবাইকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব না। কিন্তু ওয়াচম্যান স্টাইলের পুলিশিং ব্যবস্থা রাষ্ট্রের মানুষের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়।
সামাজিক পর্যায়ে অপরাধ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। চাঁদাবাজির মতো জটিল সমস্যাগুলো বরাবরই ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় সমস্যা। এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে বিট পুলিশিংয়ের কার্যকারিতাকে আরো প্রসারিত করতে হবে। কেননা বিট পুলিশিংয়ের নীতি ও প্রয়োগবিধিকে জনগণ সাধুবাদ জানিয়েছে। কাজেই বিটকে জোরালো করার তাগিদ প্রদান করতে হবে সরকারকে এবং যেসব এলাকায় কিশোর অপরাধের মাত্রাতিরিক্ত উদাহরণ দেখা যায় সেসব এলাকায় বিট পুলিশিং কার্যকরভাবে প্রয়োগ করলে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা বহুলাংশে কমে আসবে। এর আগে জনগণ বিট পুলিশিংয়ের কার্যক্রমকে তাদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করায় বেশ খুশি হয়েছে। কেননা বিট পুলিশিং সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনগণের সন্তুষ্টি অর্জনে সহযোগিতা করতে পেরেছে। যদিও বিট পুলিশিংয়ে জনবল একেবারেই কম, তাই কাজের পরিধি ইচ্ছে করলে বৃদ্ধি করতে পারছে না বিদ্যমান বিট ব্যবস্থাপনায়। সরকারকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে।
দেশে কমিউনিটি পুলিশিংকে আগের ন্যায় সক্রিয় ও কার্যকর করতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাপনায় জনগণ পুলিশের ভূমিকা পালন করে এবং কমিউনিটিতে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানও কমিউনিটি পুলিশিং প্রতিপালন করে থাকে। এর মাধ্যমে দেখা যায়, প্রত্যেকের ইতিবাচক ও সক্রিয় ভূমিকার কারণে সমাজ থেকে যাবতীয় অনাচার, অপরাধ ও নৈরাজ্য দূরীভূত হয়। কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠনকালে যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় কমিটি প্রণয়ন করা হয়, তাহলে হিতে বিপরীত হয় এবং জনগণ কমিউনিটি পুলিশিং থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, দালালচক্র যখন কোনোভাবে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কমিটিতে থাকার সুযোগ পেয়েছে, তখন থেকেই কমিউনিটি পুলিশিংয়ের দর্শন থেকে মানুষ আস্থা হারিয়েছে। রবার্ট পিল প্রণীত কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল দর্শন হচ্ছে, জনগণই পুলিশ অর্থাৎ প্রত্যেক জনগণ পুলিশের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। একটি সমাজে কমিউনিটির মানুষের সংস্পর্শ ব্যতীত কোনোভাবেই মাদক প্রবেশ করতে পারে না। এখন সমাজ যদি উদ্যোগী হয়ে এ সমস্যার সমাধান করতে ব্রতী হয়ে ওঠে, তাহলে খুব সহজেই সমাজ থেকে মাদক প্রতিহত করা সম্ভব। কেবল মাদক নয়, অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সুফল পাওয়া সম্ভব। কাজেই সরকারকে সঠিক পদ্ধতিতে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
সর্বোপরি আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের নিকট সব নাগরিক সমানভাবে বিবেচিত হবে, এ বাস্তব সত্যটুকুকে বাস্তবে রূপদানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মানুষকে হয়রানি করা যাবে না, আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় আইনকে ফাঁকি দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে, এমন ব্যবস্থারও বিলীন করতে হবে। কোনো আসামির জামিন পাওয়া না পাওয়া আদালতের বিষয়, এখানে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার যদি এতদসংক্রান্তে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে আইনের শাসন বাধাগ্রস্ত হয়, সরকারের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে। সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি প্রণয়ন করতে হবে। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধী, তার অন্য কোনো পরিচয় থাকতে পারে না। আত্মীয়করণ, রাজনৈতিক সহকর্মী ইত্যাদি পরিচয়ে কোনো মানুষকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা যাবে না। আবার ঘুস লেনদেনের কারণে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায়, পুলিশের দুর্নীতির ব্যাপারে লাগাম টেনে ধরতে হবে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সরকারকে আইনের শাসনের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে।
অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধে জনগণকে একীভূত করার উদ্যোগ সরকারকেই গ্রহণ করতে হবে। এর নিমিত্তে অপরাধের ভয়াবহতার ক্ষতিগ্রস্ততার ব্যাপারে জনসাধারণকে সচেতন করার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষ যাতে অবলীলায় থানা থেকে নাগরিক সেবা গ্রহণ করতে পারে, সে ব্যাপারে সরকারের মনিটরিং জোরালো করতে হবে। জনগণকে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর গাফিলতি প্রমাণ হলে সরকারের পক্ষ থেকে ত্বরিত গতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষকে আশ্বস্ত করতে হবে। কাজেই উপরোল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার মধ্য দিয়ে সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ও সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে।
মো. সাখাওয়াত হোসেন: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।










