উৎপাদন খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার শর্তে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) পক্ষ থেকে ক্যাপটিভের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকার জায়গায় সর্বোচ্চ ২৫ টাকা অর্থাৎ ৫৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৩০ টাকা করেছে। পাশাপাশি বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কভিড মহামারী ও ইউক্রেন সংকটের ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণসহ দাম বেড়েছে প্রায় সব খাতে। সার্বিক পরিবহন ব্যয় ও মুদ্রা বিনিময় হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির ফলে ব্যবসা পরিচালনার খরচও অধিক হারে বেড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ব্যবসা পরিচালনার খরচ আরো বেড়ে যাবে। স্থানীয় শিল্প ও রফতানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে অত্যধিক হারে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে এ খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখান থেকে পরিত্রাণ লাভে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো গ্যাসের দাম কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছে। প্রত্যাশা থাকবে, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় সরকার গ্যাসের দাম দ্রুত পুনঃসমন্বয় করবে। 

গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের পক্ষে একটি যুক্তি দেখানো হয়েছে। তা হলো সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে তথা স্পট মার্কেটে গ্যাসের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এলএনজির স্পট মূল্য প্রকৃতই অস্থির এবং তা নানা কারণে অতি বৃদ্ধি বা হ্রাস হয়ে থাকে। গত বছরের প্রথম দিকে স্পট মার্কেটে এলএনজির মূল্য যেখানে ইউনিটপ্রতি ৫ বা ৬ ডলার ছিল, বছর শেষে তা ইউনিটপ্রতি ৪০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ গত বছর কোনো একসময় স্পট মার্কেট থেকে সর্বোচ্চ ৩৬ ডলারে এলএনজি কেনে এবং একসময় অতি উচ্চমূল্যের কারণে সাময়িকভাবে কেনা বন্ধ রাখে। বাংলাদেশ এর আগে নিজস্ব গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ক্রমাগতভাবে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া ও চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। কিন্তু এলএনজি আমদানির খরচ জোগাতে এরই মধ্যে পেট্রোবাংলাকে বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এজন্য বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন।

বর্তমানে সরকার ৩ হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে, তার মধ্যে এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এগুলো আসছে কাতার আর ওমান থেকে। দেশ দুটির সঙ্গে এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি শর্তানুসারে আগামী ৮-১০ বছরে এর দাম খুব একটা ওঠানামা করার কথা না। আর ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নিজস্ব উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে, যেটা বেশ সস্তা। অনেক কম খরচেই উৎপাদন করা হয়। আর বাকি ১৫০ মিলিয়নের মতো গ্যাস স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়, যেটার দাম তিন-চার গুণ বেড়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎসের সহজলভ্য গ্যাস থাকার পরও উচ্চমূল্যস্ফীতির মধ্যে দাম কেন বাড়াতে হলো, তার কোনো  সদুত্তর মিলছে না। 

প্রকৃতপক্ষে দেশের গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য জরুরি পদক্ষেপ না নিয়েই এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত অপরিপক্ব ও অদূরদর্শী। গত দুই দশকে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধানের দুর্বল ধারা বাংলাদেশকে এলএনজি ফাঁদে ফেলেছে। উচ্চমূল্যের এলএনজির ব্যাপক আমদানি ভবিষ্যতে দেশকে আর্থিক সংকটে ফেলবে। অথচ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এলএনজি-নির্ভরতাই প্রাধান্য পেয়েছে। বর্তমানের জোরালো গ্যাস অনুসন্ধান ভবিষ্যতে এলএনজির চাপ থেকে স্বস্তি দিতে পারে, এটি বোঝা কঠিন কোনো বিষয় নয়। এটি ঠিক যে সমুদ্রের বা ভূখণ্ডের নতুন গ্যাস আবিষ্কার করে তা উঠিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমস্যা সমাধানের বাস্তবধর্মী সমাধান কেবল এলএনজি আমদানি বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এটি যে সঠিক নয়, তা এখন প্রমাণিত। 

বর্তমানে এলএনজি আমদানি দেশের গ্যাস খাতে যে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে, তা লাঘবে বাস্তবধর্মী পথ কী হতে পারে? একটি মোক্ষম উপায় হলো এরই মধ্যে আবিষ্কৃত অথচ এখনো উত্তোলন করা হয়নি বা কোনো কারণে উত্তোলন স্থগিত রয়েছে, সেগুলো জরুরি ভিত্তিতে উৎপাদনের আওতায় নিয়ে আসা। উদাহরণস্বরূপ ভোলা দ্বীপে ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্রটি অটুট পড়ে রয়েছে। ভোলার অন্য গ্যাসক্ষেত্র শাহবাজপুরে সক্ষমতার অর্ধেক গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এ দুই গ্যাসক্ষেত্র থেকে পুরোদমে গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ করার সমস্যা হলো ভোলা দ্বীপ থেকে মূল ভূখণ্ডে সংযোগ পাইপ তৈরি করা হয়নি। বিস্ময়ের ব্যাপার যে বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় গ্যাস কবে সরবরাহ করা যাবে বা আদৌ কোনো দিন করা যাবে কিনা সে বিবেচনা না করেই পাইপলাইন তৈরি হয়েছে। কিন্তু গ্যাস পাইপলাইনের অভাবে গ্যাসক্ষেত্র থেকে যে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না, তা কোনো জরুরি কর্মপরিকল্পনায় আসে না। বঙ্গোপসাগরের নিচে গ্যাস ও তেলসম্পদ আবিষ্কারের ফলে ভারত ও মিয়ানমারকে বিশ্বের বড় বড় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এক্ষেত্রে পেছনে পড়ে রয়েছে বাংলাদেশ। অথচ দেশ দুটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সমুদ্র সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি করে সমুদ্রজয় ছিল সরকারের একটি অর্জন। এ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে সমগ্র বিশ্বের নজর কেড়েছে। সমুদ্রজয় তাদের বড় একটি সাফল্য হলেও এখনো সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। ফলে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে গিয়ে সরকার গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সংকটের সূত্রপাত এখান থেকেই। 

গ্যাসের দাম বাড়িয়েও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনো স্থিতিশীল হয়নি। এলএনজি কিনতে দরকার হবে ডলার। ফলে টাকায় দাম বাড়িয়ে ডলারে মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। কয়লার অভাবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেও এক মাসের মতো কয়লা আছে। এলসি খুলতে পারছে না তারা। সমস্যা একটাই, ডলার সংকটের কারণে আমদানি সীমিতকরণ নীতি। সরকার বাজেট ঘাটতিতে আছে। নানা জায়গা থেকে তাকে ঋণ করতে হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার হয়তো সেই ঘাটতি কিছুটা মোকাবেলা করতে পারবে। কিন্তু এটা নিশ্চিত করতে হবে যে শিল্প নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের সরবরাহ পাচ্ছে। 

গ্যাসের দাম পুনর্নির্ধারণের দাবি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় সব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আসছে। বাণিজ্যমন্ত্রীও বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে। আশা করা যায়, দ্রুতই এ বিষয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা মিলবে। উৎপাদন ধরে রাখতে এর কোনো বিকল্প নেই। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো জ্বালানিতে বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিয়ে চলেছে। উদ্দেশ্য মানুষকে স্বস্তি দেয়া, শিল্পের উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা। শুধু ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যও বিপুল অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে শুধু জ্বালানির দাম নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার জন্য। অন্যদিকে বাংলাদেশ গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহারের জন্য সচেষ্ট। এতে মূল্যস্ফীতির হার আরো বেড়ে উঠছে। হঠাৎ করে গ্যাসের দাম অতিমাত্রায় বাড়ানোয় শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে, যা কাম্য নয়। রফতানি বাজার হারানোর ভয় তো আছেই। তাই প্রত্যাশা থাকবে, উদ্যোক্তা ও ভোক্তাদের কথা বিবেচনায় নিয়ে গ্যাসের দাম দ্রুত পুনঃসমন্বয় করবে সরকার।