বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের অভিঘাত এরই মধ্যে দ্রুততর এবং ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের (জিএফসি) চেয়ে আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, এমনকি তা ১৯৩০ সালের মহামন্দার চেয়েও। আগের দুটি ঘটনায় পুঁজিবাজারের ৫০ শতাংশ বা তার বেশি পতন ঘটা, ঋণবাজার রুদ্ধ হওয়া, অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে পড়া, বেকারত্ব হার ১০ শতাংশের ওপরে উন্নীত এবং জিডিপি বার্ষিক ১০ শতাংশ বা তারও বেশি সংকুচিত হয়েছিল। তবে এসব ঘটতে সময় লেগেছিল প্রায় তিন বছর। একইভাবে বর্তমান সংকটে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী কঠিন সামষ্টিক, অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিণাম (আউটকাম) বাস্তব রূপ লাভ করেছে।
চলতি মাসের প্রথম দিকে ঠিক ১৫ দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজার বিয়ার টেরিটরিতে (সূচকের শীর্ষ অবস্থান ২০ শতাংশ পতন) নিমজ্জিত হয়েছে—এ ধরনের পতন এ-যাবত্কালের সবচেয়ে দ্রুতগতির। এখন বাজারের ৩৫ শতাংশ অধোগতি ঘটেছে, ঋণবাজার অনেকটাই রুদ্ধ হয়েছে এবং ক্রেডিট স্প্রেড (জাংক বন্ডের মতো) ২০০৮ সালের মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। এমনকি গোল্ডম্যান স্যাকস, জেপি মরগান ও মরগান স্ট্যানলির মতো মূলধারার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাক্কলন করে যে যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপি প্রথম প্রান্তিকে বার্ষিক ৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে ২৪-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমবে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্টিভেন মানিউচিন সতর্ক করেছেন যে বেকারত্ব হার ২০ শতাংশের ওপরে উন্নীত হতে পারে (জিএফসির সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ)।
অন্য কথায়, সামষ্টিক চাহিদার প্রতিটি উপাদানই—ভোগ, মূলধন ব্যয়, রফতানি—নজিরবিহীনভাবে নিম্নমুখী হচ্ছে। অধিকাংশ ভাষ্যকার যদিও এক প্রান্তিকের জন্য উৎপাদন লক্ষণীয় মাত্রায় পতনসহ একটি ভি-আকারের অধোগতি এবং তারপর পরবর্তী সময়ে দ্রুতগতিতে পুনরুদ্ধার অনুমান করে আসছেন, তবে এখন এটি পরিষ্কার হওয়া উচিত যে কভিড-১৯ সংকট পুরোপুরিভাবে আরো অনেক কিছুতে গড়াবে। এ মুহূর্তে চলমান বৈশ্বিক অর্থনীতির সংকোচন দেখতে ভি, ইউ কিংবা এল আকারের নয়; বরং এটি দেখতে অনেকটা আই আকারের। মানে এটি একটি উল্লম্ব রেখা, যা আর্থিক বাজার ও প্রকৃত অর্থনীতির নিম্নগামিতারই প্রতিফলন ঘটায়।
আক্ষরিক অর্থে মহামন্দা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এতটা বন্ধ হয়নি, যতটা আমরা সাম্প্রতিক সময়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে দেখেছি কিংবা এখনো দেখছি। সর্বোত্তম ঘটনার দৃশ্যপট (বেস্ট কেস সিনারিও) হবে অধোগতির—জিএফসির চেয়েও যা অধিক ভয়াবহ (হ্রাসকৃত বৈশ্বিক সার্বিক উৎপাদনের দিক থেকে); তবে তা হবে স্বল্পমেয়াদি, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিক নাগাদ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাজারগুলো তখনই পুনরুদ্ধার হওয়া শুরু করবে, যখন সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলো দেখা যাবে।
তবে সর্বোত্তম ঘটনার দৃশ্যপট মনে হয় কিছু শর্ত বা অবস্থার ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত. যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অন্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিগুলোকে বিস্তৃতভাবে কভিড-১৯-এর পরীক্ষা, কনট্যাক্ট ট্রেসিং, চিকিৎসা ব্যবস্থা, কোয়ারেন্টিন প্রয়োগ এবং চীনের মতো পূর্ণমাত্রার লকডাউন বাস্তবায়ন চালিয়ে যেতে হবে। আবার যেহেতু করোনাভাইরাস প্রতিরোধের টিকা উন্নয়ন এবং ব্যাপক মাত্রায় তা উৎপাদনে ১৮ মাস সময় লাগবে, সেহেতু ভাইরাসবিরোধী এবং অন্য চিকিৎসাবিদ্যাগত (থেরাপিউটিক) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও কৌশলগুলো বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ দরকার হবে।
দ্বিতীয়ত, আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকদের (এক মাসের কম সময়ের মধ্যে যারা যা করেছেন, জিএফসির পর তাদের তা করতে সময় লেগেছিল তিন বছর) সংকটকালে অগতানুগতিক পদক্ষেপগুলো নেয়া অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে। তার মানে হলো, শূন্য বা ঋণাত্মক সুদহার, সম্প্রসারিত সম্মুখদর্শী নির্দেশনা, কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং, ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রেডিট ইজিং (প্রাইভেট অ্যাসেট কেনা), মানি মার্কেট ফান্ড এবং এমনকি বড় করপোরেশনের কমার্শিয়াল পেপার ও করপোরেট বন্ড ফ্যাসিলিটিজের মতো ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে। ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ বিশ্ববাজারে ডলারের বিপুল তারল্য ঘাটতি সামলাতে সংস্থাটির ক্রস-বর্ডার সোয়াপ লাইন সম্প্রসারণ করেছে, তবে অনগদযোগ্য সম্পদ থাকা এখনো সমর্থ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ প্রদানে উৎসাহিত করতে ব্যাংকগুলোকে আমাদের অধিক সুবিধা জোগানো প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, পরিবারগুলোয় ‘হেলিকপ্টার ড্রপের’ সরাসরি নগদ অর্থ ছাড়সহ সরকারগুলোকে ব্যাপক আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে। চলমান অর্থনৈতিক অভিঘাতের সম্প্রসারণশীল আকারের বাস্তবতায় উন্নত অর্থনীতিগুলোর জিডিপির ২-৩ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ বা ততোধিক আর্থিক ঘাটতি (ফিসক্যাল ডিফিসিট) বাড়াতে হবে। ব্যক্তি খাতের পতন ঠেকাতে কেবল কেন্দ্রীয় সরকারগুলোরই বড় ও যথেষ্ট শক্তিশালী স্থিতিপত্র রয়েছে।
কিন্তু এসব ঘাটতি ও অর্থায়িত হস্তক্ষেপগুলোকে অবশ্যই পুরোপুরিভাবে নগদীকরণকৃত (মনিটাইজড) হতে হবে। যদি সেগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড সরকারি ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয় তাহলে সুদহার লক্ষণীয়ভাবে বাড়বে এবং পুনরুদ্ধারও আরো সহজ ও সুগম হবে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে বামপন্থী ঘরানার আধুনিক আর্থিক তত্ত্ব-সমর্থিত দীর্ঘকাল ধরে প্রস্তাবিত হেলিকপ্টার ড্রপসহ হস্তক্ষেপগুলো মূলধারার হস্তক্ষেপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
দুর্ভাগ্যক্রমে সর্বোত্তম ঘটনার দৃশ্যপট সৃষ্টির জন্য উন্নত দেশগুলোয় জনস্বাস্থ্যগত সাড়া ও পদক্ষেপ মহামারী নিয়ন্ত্রণে আনতে যতটা প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশ অপ্রতুলতার সমস্যায় পড়েছে। একই সঙ্গে বর্তমানে যেসব আর্থিক নীতি-প্যাকেজ নেয়া হয়েছে, তা সময়মতো পুনরুদ্ধারের পরিস্থিতি তৈরিতে যথেষ্ট কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় আগের মহামন্দার চেয়ে খারাপ ও গভীরতর নতুন মহামন্দার ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলেছে।
মহামারী না থামা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও বাজারগুলোয় পতন অব্যাহত থাকবে। তবে এমনকি মহামারী কমবেশি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ২০২০ সালের শেষ নাগাদ সার্বিক প্রবৃদ্ধি তখনো আগের ধারায় ফিরে আসবে না। সর্বোপরি তখন নতুন মিউটেশনের মাধ্যমে অভিযোজিত হয়ে আরেকটি ভাইরাস মৌসুম শুরু হতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেকেই যে ধরনের চিকিৎসাবিদ্যাগত হস্তক্ষেপগুলোর (থেরাপিউটিক ইন্টারভেনশন) জন্য প্রহর গুনছেন, সেগুলো আশার তুলনায় কম কার্যকর হতে পারে। কাজেই অর্থনীতিগুলো আবারো সংকুচিত এবং বাজারগুলোর আবারো পতন ঘটবে।
অধিকন্তু, আর্থিক সাড়া বা পদক্ষেপ দেয়ালে আঘাত করলে বিপুল ঘাটতির নগদায়ন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ঘটাবে, বিশেষত যদি ভাইরাসসংক্রান্ত পর্যায়ক্রমিক ঋণাত্মক সরবরাহ অভিঘাত সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি হ্রাস করে। এবং অনেক দেশ এসব দেনা নিজেদের মুদ্রায় বাস্তবিক অর্থে ধারণ করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে উদীয়মান বাজারের সরকার, করপোরেশন, ব্যাংক ও পরিবারগুলোকে কে বেইলআউট করবে?
যেকোনোভাবে এমনকি মহামারী ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় যদি নিয়ন্ত্রণে আনাও যায়, তবু বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কিছু ‘সাদা রাজহাঁসের’ (সুনিশ্চিত) ঝুঁকি থেকে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন সামনে আসায় কভিড-১৯-এর সংকট পশ্চিম এবং চীন, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়াসহ অন্তত চার সংশোধনবাদী শক্তির (যে শক্তিগুলো এরই মধ্যে অপ্রতিসমভাবে ভেতর থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করতে সাইবার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে) মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করবে। মার্কিন নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর অনিবার্য সাইবার হামলা বিতর্কিত চূড়ান্ত ফলাফলের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের অভিযোগ ঘিরে অতিমাত্রায় সহিংসতা ও জনবিশৃঙ্খলা তৈরির সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
একইভাবে আগে যেমনটা বলেছি, বাজারগুলো চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে অবমূল্যায়ন করছে; চীন-আমেরিকার সম্পর্কের অবনতি ত্বরান্বিত হওয়ায় দুটি দেশই কভিড-১৯ মহামারীর মাত্রার জন্য একে অন্যকে দুষবে। বর্তমান সংকট বোধহয় চলমান বলকানাইজেশনকে বেগবান করছে এবং সামনের মাস-বছরগুলোয় বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিভক্ত ও দুর্বল করবে।
এই ত্রিমুখী ঝুঁকি—বেসামাল মহামারী, অপর্যাপ্ত অর্থনৈতিক নীতি হাতিয়ার ও ভূরাজনৈতিক সাদা রাজহাঁসের ঘটনা (সুনিশ্চিত ও অবশ্যম্ভাবী ঘটনা) বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধারাবাহিক মন্দায় ফেলা এবং আর্থিক বাজারের বিপর্যয়ের জন্য যথেষ্ট হবে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় একটি বলপূর্বক ( যদিও দেরিতে) নীতি সমর্থন বৈশ্বিক অর্থনীতিকে পতনের অতলগহ্বর থেকে টেনে তুলেছিল। আমরা সেদিক থেকে এবার অতটা সৌভাগ্যবান না-ও হতে পারি।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
নুরিয়েল রুবিনি: রুবিনি ম্যাক্রো অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান নির্বাহী ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতির অধ্যাপক
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










