সবাইকে বলতে শুনছি, করোনায় স্বাস্থ্যসেবা তথা জীবন বাঁচানো সবচেয়ে বড় ফরজ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান শুরু থেকেই বলে আসছেন—পরীক্ষা, পরীক্ষা আর পরীক্ষা। সেই সঙ্গে আমরা সবাই জানি, ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আর চিরকাল জেনে এসেছি, চিকিৎসাসেবা একটি মহান পেশা। জীবন দিতে বা রক্ষা করতে পারেন বলে সৃষ্টিকর্তা আর মায়ের পরই চিকিৎসকের অবস্থান। সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ, এসজিএইচ বা এনইউএইচে চিকিৎসকের চেম্বারে গেলে দেখতে পাই দেশ-বিদেশের অনেক রোগী জটিল রোগ থেকে নিরাময় লাভ করে কত কত কৃতজ্ঞতা জানান ডাক্তারকে। আমাদের দেশেও প্রায় একই রকম। অনেক চিকিৎসক রাত-বিরাতে এমনকি বন্ধের দিনেও চিকিৎসাপত্র দিতে বিন্দু পরিমাণ দ্বিধা করেন না। সংখ্যায় কম হলেও অনেকে দেখেছি গরিব রোগীকে নিজ চেম্বারেও স্বল্প মূল্যে বা অনেক সময় প্রায় বিনা মূল্যে যে শুধু চিকিৎসাপত্র দেন তা নয়, ফ্রি ওষুধও দিয়ে দেন।
কিন্তু করোনায় কী দেখছি? খোদ হাসপাতালের প্রধান এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে দেখছি খেদোক্তি করতে। প্রথমে ধমক, এখন পুরস্কৃৃত করার উদ্যোগ।
মার্চের ১৮ তারিখে চোখে কিছু সমস্যা নিয়ে ফোন করলাম আমার চিকিৎসককে। তার চেম্বার অ্যাসিস্ট্যান্ট জানালেন পর্যাপ্ত মাস্ক নেই বলে ম্যাডাম রোগী দেখছেন না। গুলশানের এক হাসপাতালে আমার ছোটবেলার এক বন্ধুর বাইপাস সার্জারি হয়েছে। দেখতে যাওয়া উচিত, ফোন করলাম অনুজপ্রতিম এক হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে। তিনি সংগত কারণেই নিষেধ করলেন, অন্যান্য রোগীর সংক্রমণের ভয়ে। মাস শেষে ফোন করলাম আমার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে বসুন্ধরার একটি আন্তর্জাতিক হাসপাতালে। তার এক রোগী সম্প্রতি মারা যাওয়ায় তিনি নিজেই দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টিন ছিলেন। কিন্তু আমার ফোন পেয়ে তিনি যেন চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। বিভিন্ন আলামত যাচাই-বাছাই করে চোখের অ্যালার্জি আর উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসাপত্র দিলেন। অনেক আগ্রহ নিয়ে আমার ও পরিবারের খোঁজ নিলেন। একই অবস্থা প্রায় বেশির ভাগ সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেরও। জানান দিতে ভুললেন না, তিনি দেশেই আছেন এবং স্কাইপে বা অনলাইনে পরামর্শ দিতে প্রস্তুত।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসছে, তাহলে করোনা চিকিৎসায় ডাক্তারদের এত অনীহা কেন, কেন এত নিষ্ঠুরতা? আগে শুনেছিলাম করোনা ছোঁয়াচে, তাই পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট বা পিপিই ছাড়া এসব রোগীর কাছে যাওয়া উচিত নয়। হয়তো যথার্থ যুক্তি। অতিদ্রুত স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বীমারও ব্যবস্থা হওয়া উচিত। সরকার, ডিজি হেলথসহ অনেক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে, হয়তো আরো আসবে কিংবা প্রয়োজন, কিন্তু ডাক্তারদের নাকি ভয় কাটছেই না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বলছেন, এটা ভয় নয়, অবহেলা। ডাক্তাররা আবার বলছেন, তারাও মানুষ, তাদেরও মা-বাবা, পরিবার-পরিজন আছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা আর এগোবেন না। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নাকি একজন ইন্টার্নি ডাক্তারও যোগ দেননি, পালিয়ে গেছেন।
ব্যক্তিগতভাবে অনেক বৃহৎ হাসপাতালের আর্থিক কাঠামো বিন্যাসের সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে ছোটবেলার এক মেধাবী ডাক্তার বন্ধুকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম সেই হাসপাতালগুলোর একটিতে মোটা মাসোহারায় যোগ দিতে। প্রত্যুত্তরে সে হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করল। সে সরকারি হাসপাতালে থেকে অনেক ধরনের রোগীর চিকিৎসা করে আরো শিখতে চায়। একই কাজ করল আমার এক নিকটাত্মীয়। মুক্তিযোদ্ধা বাবার পরামর্শক্রমে গ্রামের গরিব রোগীদের চিকিৎসাপত্র দিচ্ছে সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোয়। তাদেরই বন্ধুরা কিনা রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছে। সাধারণ সর্দি-কাশির রোগীরও চিকিৎসা দিতে নারাজ। পর্যাপ্ত পিপিই দেয়া হচ্ছে বা আসছে, সরকার হয়তো প্রণোদনাও দেবে, কিন্তু তাদের বেশির ভাগ অনড়, বিভ্রান্ত বা ভীত। জানি ব্যতিক্রম আছেন, তবে সেটা আমরা খুব বেশি জানতে পারছি না।
এবার আসি করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতি বিবেচনায়। শুরু থেকেই আইইডিসিআর বা সংক্রামক ব্যাধি কেন্দ্রের দোমনায় মানুষের মধ্যে অনেক সন্দেহ দানা বাঁধে। তাদের পাশে নিপসম ও আইসিডিডিআর,বি। কিন্তু তাদের ইচ্ছা সত্ত্বেও করোনা পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত করা হচ্ছিল না, পর্যাপ্ত কিট নেই বলে। এরই মধ্যে পরীক্ষা কিট এসেছে বেশ, তবে পরীক্ষার প্রক্রিয়া এখনো শ্লথ। যেতে হবে বহুদূর।
বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজ রয়েছে ১১১টি, তার মধ্যে ৩৬টি সরকারি, ৬৯টি বেসরকারি আর ছয়টি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন। রয়েছে ৬০টি পূর্ণাঙ্গ নার্সিং কলেজ। তার মধ্যে ১৫টি সরকারি আর ৪৫টি বেসরকারি। তদুপরি ডিপ্লোমা প্রদানের জন্য রয়েছে ১৮৩টি নার্সিং ইনস্টিটিউট। ২০১৮ সালের হিসাবে বাংলাদেশে রয়েছেন ৫৬ হাজার ৬৭০ জন নার্স ও ৯১ হাজার ৩২১ জন রেজিস্টার্ড ডাক্তার। তার মধ্যে সরকারের সঙ্গে জড়িত ২৫ হাজার ৯৮০টি পদের বিপরীতে ২০ হাজার ৯১৪ জন। কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া প্রাথমিক সেবাদানকারী হাসপাতালের সংখ্যা সরকারে ২ হাজার ৪টি আর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৪টি। এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে মোট বেড রয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৯৪টি। সরকারের ৫২ হাজার ৮০৪টি আর বেসরকারি খাতে ৯০ হাজার ৫৮৭টি। তার মধ্যে আইসিইউ বা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে বেড রয়েছে ১ হাজার ১৬৯টি। তার মধ্যে ৪৩২টি সরকারি এবং ৭৩৭টি বেসরকারি। তার মধ্যে ১১২টিকে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে। দেশে মোট ভেন্টিলেটর রয়েছে ১ হাজার ২৫০টি। তার মধ্যে ৫০০ সরকারি হাসপাতালগুলোয় আর ৭৫০টি বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন ২৫ হাজার ভেন্টিলেটর।
একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা যে স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে খুব পিছিয়ে আছি তা কিন্তু নয়। অবশ্যই আমাদের আরো আইসিইউ প্রয়োজন, প্রয়োজন সংক্রমণ ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও ভেন্টিলেটরের।
তবে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন একটি ন্যূনতম কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কার্যরত ডাক্তারদের মধ্যে ন্যূনতম জবাবদিহিতা সৃষ্টি। শুধু মহান পেশা, মহান পেশা বলে কাজ হবে না। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য থাকতে হবে সমন্বিত বিধিমালা।
মনে রাখতে হবে জবাবদিহিতা আবার দেশের সামগ্রিক সুশাসনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজনৈতিক কারণে সুবিধা নেয়া ডাক্তারদের কাছ থেকে ক্রান্তিলগ্নে বেশি আশা করাটাও কিছুটা বোকামি।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক










