কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রফতানি নীতি ও বাণিজ্য কাঠামোয় কৌশলগত পরিবর্তনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর সমন্বয় ও সময়োপযোগী অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ বন্দর দেশের কৃষিভিত্তিক রফতানি খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্গানিক ফল ও সবজি এ নতুন সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় নির্মিত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ১৮ দশমিক ৫ মিটার গভীরতায় বৃহৎ কন্টেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি নোঙর করার সক্ষমতা অর্জন করবে। বর্তমানে বাংলাদেশের রফতানি ব্যবস্থায় বড় আকারের জাহাজে সরাসরি পণ্য বোঝাই করা সম্ভব নয়। ফলে রফতানি পণ্য প্রথমে ছোট জাহাজের মাধ্যমে আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে পাঠাতে হয়, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে। এ প্রক্রিয়া সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি করে এবং বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করে তোলে।
বাংলাদেশের ফল এবং সবজির বৃহৎ ঝুড়ির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এ তিন পার্বত্য জেলা থেকে। পাহাড়ি ঢাল, প্রাকৃতিক বনভূমি এবং তুলনামূলক কম হস্তক্ষেপপূর্ণ কৃষি ব্যবস্থার কারণে অঞ্চলটি কার্যত দেশের এক অনন্য কৃষি উৎপাদন ভূমিতে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ কৃষিশুমারি (২০২৩-২৪) অনুযায়ী, দেশের মোট কমলার প্রায় ৭১ শতাংশ উৎপাদন হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে। পাশাপাশি আনারসের ১৯ শতাংশ, মালটার ২০, আমলকীর ২৬, তেঁতুলের ১৪, পেঁপের ৭, কাঁঠালের ৮ ও কলার ৬ শতাংশসহ আরো বহু ফল, মসলা, বনাজি বা ভেষজ ঔষধি গাছ এবং বিপুল পরিমাণ সবজি এ অঞ্চলে উৎপাদন হয়। এ উৎপাদনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষিপণ্য প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এখানে তুলনামূলক সীমিত, অনেক ক্ষেত্রে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব পণ্য ‘অর্গানিক’ বা ‘প্রিমিয়াম’ হিসেবে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষিপণ্য বাস্তব অর্থেই সে গুণাবলি ধারণ করে। এ কারণে সঠিক পরিকল্পনা, মাননিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক বিপণন কৌশল গ্রহণ করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষিপণ্যকে আন্তর্জাতিক অর্গানিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
কলার পাশাপাশি আনারস, পেঁপে, লেবু, কাঁঠাল, আম, মালটা ও আমলকিসহ বহু প্রকার ফল পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপাদন হয়। তুলনামূলক কম রাসায়নিক ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক চাষ পদ্ধতির কারণে এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ‘অর্গানিক’ বা প্রিমিয়াম মানের হিসেবে বিপণনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রাখে। সঠিক সংরক্ষণ, গ্রেডিং, প্রি-কুলিং ও আধুনিক প্যাকেজিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষিপণ্য বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতাকে বহুগুণে শক্তিশালী করতে পারে। ২০২২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সভায় জানা যায় জাপান সরকার ও বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি আমদানির জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করছে। এ তথ্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপাদিত কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সিঙ্গাপুরে চাষযোগ্য জমি মোট ভূমির মাত্র ১ শতাংশ; ফলে খাদ্য সরবরাহে দেশটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ফল ও সবজির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে সরাসরি জাহাজীকরণ সম্ভব হলে এ বাজারগুলোয় বাংলাদেশের কৃষিপণ্য আরো দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পৌঁছনো সম্ভব হবে।
বর্তমান বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদনে নয়; বরং ফসল উত্তোলনের পর ব্যবস্থাপনায়। পাহাড়ি এলাকা থেকে ফল সংগ্রহ, গ্রেডিং, প্রি-কুলিং, সংরক্ষণ ও দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। কোল্ড স্টোরেজ ও সংগ্রহ কেন্দ্রের ঘাটতি, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মধ্যস্বত্বভোগীর দীর্ঘ শৃঙ্খল কৃষকের প্রকৃত লাভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
২০১৮ সালে বার্ডের খাগড়াছড়িতে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ফসল উত্তোলনের সঠিক পদ্ধতি ও যথাযথ যত্নের অভাবে মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমসাময়িক গবেষণায় দেখা গেছে, পার্বত্য তিন জেলা এবং মৌলভীবাজার অঞ্চলে কৃষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে কলা, আনারস, কমলা, আম, লিচু এবং কাঁঠালের ফসল উত্তোলন-পরবর্তী ক্ষতির হার যথাক্রমে ৩৭ শতাংশ, ২৭, ২০, ২৪, ১৭ ও ৩৮ শতাংশ। ২০১৭ সালের খুচরা বাজারমূল্য অনুযায়ী এ ক্ষতির মোট আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩৪১ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বাধিক ক্ষতি হয়েছে কলার ক্ষেত্রে (৭০৫ দশমিক ৭৯ কোটি টাকা), এরপর আনারস (৫৫০ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা) ও আম (৫০৮ দশমিক ৯৫ কোটি টাকা)। অন্যদিকে কমলার ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম, মাত্র ১ দশমিক ১২ কোটি টাকা। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী এ আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিঃসন্দেহে আরো বেশি হবে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের অক্টোবরে পুনরায় পরিচালিত গবেষণায়ও এ ফলগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যার উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।
এ অবস্থায় মাঠ থেকে বন্দর পর্যন্ত একটি কার্যকর ও সমন্বিত কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। পার্বত্য অঞ্চলে আধুনিক সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে গ্রেডিং, প্রি-কুলিং, প্যাকিং ও স্বল্পমেয়াদি সংরক্ষণের সুবিধা নিশ্চিত করা যেতে পারে। পাশাপাশি সৌরশক্তিচালিত রেফ্রিজারেটেড কন্টেইনার ব্যবহার করলে দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ ঘাটতির সমস্যা অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। অন্যদিকে ফল উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, জিআইএস ম্যাপিং, ব্লকচেইনভিত্তিক ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং কৃষক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পুরো সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য সময়মতো ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
মান নিয়ন্ত্রণ ও সার্টিফিকেশন: উত্তম কৃষি চর্চা (জিএপি) ও অর্গানিক সনদ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত কাস্টমস ও ফাইটোস্যানিটারি সেবা নিশ্চিত করলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ আরো সহজ হবে। কৃষক সমবায় ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে।
মূল্য সংযোজন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা: মাতারবাড়ী বন্দর কেবল কাঁচা ফল রফতানির কেন্দ্র নয়; এটি মূল্য সংযোজনমূলক শিল্পের সুযোগও তৈরি করে। ফল থেকে জ্যাম, জুস, পাল্প, শুকনো ফল ও মসলা প্রক্রিয়াজাত করলে পণ্যের সংরক্ষণকাল বাড়বে, রফতানি মান উন্নত হবে এবং দেশের বৈদেশিক আয় বাড়বে। বন্দরসংলগ্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে এ ধরনের শিল্প স্থাপিত হলে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ফিনটেক সুবিধা: উন্নত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকরা আধুনিক চারা, কার্যকর সেচ ব্যবস্থা, প্রি-কুলিং ও মানসম্মত প্যাকেজিং সুবিধা ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে ফসল সংগ্রহের পর সঠিক গ্রেডিং, সংরক্ষণ ও দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করা গেলে পণ্যের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। ফিনটেকভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা চালু হলে কৃষকরা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারবেন, ফলে তারা উৎপাদনের প্রকৃত লাভের অংশীদার হবেন। সমন্বিত পরিকল্পনা, আধুনিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা, কোল্ড চেইন অবকাঠামো এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্গানিক কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হয়ে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করতে পারবে।
সবুজ পাহাড়ের উৎপাদন যখন আধুনিক সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে নীল সমুদ্রপথে বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছবে, তখন মাতারবাড়ী বন্দর কেবল একটি অবকাঠামো হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি হবে বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক রফতানির নতুন যুগের সূচনাবিন্দু। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, সুপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনা এবং দৃঢ় বাস্তবায়ন। বাংলাদেশ এরই মধ্যে কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে; তবে সে সাফল্য তখনই প্রকৃত অর্থে মূল্যবান হবে, যখন তা দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা ও কার্যকর বাজার সংযোগের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিষ্ঠা পাবে। এ প্রেক্ষাপটে মাতারবাড়ী বন্দর বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেয়ার একটি শক্তিশালী ও কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
ফৌজিয়া নাসরিন সুলতানা: পরিচালক (স্থানীয় সরকার), বার্ড, কুমিল্লা; প্রকল্প প্রণেতা, পার্বত্য চট্টগ্রামের ফলের সাপ্লাই চেইন আধুনিকায়ন প্রকল্প
জিয়া করিম: শিপিং, লজিস্টিকস ও ইন্টিগ্রেটেড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ










