বাজার নিয়ন্ত্রণে চাল আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে ১২ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক জারীকৃত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চাল আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হলো এবং শর্ত সাপেক্ষে সমুদয় রেগুলেটরি ডিউটি থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো। এ প্রজ্ঞাপনের আওতায় রেয়াতি শুল্ক হারে চাল আমদানির শর্ত হচ্ছে, চাল আমদানির জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক মনোনীত কমপক্ষে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপনটির কার্যকারিতা আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকবে।

চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। ১ জুলাই অনুষ্ঠিত খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভায় বিদ্যমান ২৫ শতাংশ শুল্ক হারে বেসরকারি খাতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। সভায় এও সিদ্ধান্ত হয় যে বাজারদর স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনে চাল আমদানির পরিমাণ কমাতে-বাড়াতে পারবে। একই সঙ্গে খাদ্য মন্ত্রণালয় চালের আমদানি শুল্কহার কমানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অনুরোধ করার প্রক্রিয়া শুরু করে। যেসব কারণে সরকারকে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে এক. গত অর্থবছরে উপর্যুপরি বন্যায় আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমন চালের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টনে, যা শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম নয়, বরং এর আগের বছরের তুলনায় সাত লাখ টন কম। আর মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাবে হিটশক ও পোকার আক্রমণে গত অর্থবছরে বোরো চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৯০ লাখ টনে, যা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ লাখ টন কম এবং এর আগের বছরের তুলনায় ৬ লাখ টন কম। উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে শুধু চাল উৎপাদনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখায় ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়নি, বরং চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হারে নিম্নমুখিতা দেখা গেছে। ফলে বেড়ে গেছে পণ্যটির আমদানি। বণিক বার্তার ২৪ আগস্টের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের (চাল ও গম) আমদানিনির্ভরতার হার ১২ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশে। এতে ‘খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার মিথ দুর্বল হয়ে পড়ছে।’ দুই. উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ব্যর্থতার প্রভাব পড়ে অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহের ওপর। সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে সরকার ৬ লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। সরকার ধান-চাল সংগ্রহ মূল্য এর আগের বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১ ও ৩ টাকা বৃদ্ধি করে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যে দেখা যায়, ৬ লাখ টন বোরো ধান সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত বোরো ধান সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৭৪ টন, যা সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকের সামান্য বেশি। আর সিদ্ধ ও আতপ মিলে সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে একই তারিখ পর্যন্ত মোট চাল সংগ্রহের পরিমাণ ১০ লাখ ৭ হাজার ৯১২ টনে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু আগস্টেই ধান-চাল সংগ্রহের সময় শেষ হচ্ছে, সেহেতু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জনের সম্ভাবনা নেই। তিন. বর্তমানে (২৩ আগস্ট) সরকারি গুদামে চাল ও ধানের মজুদ যথাক্রমে ১৩ লাখ ৭৮ হাজার টন এবং ১ লাখ ২৩ হাজার টনে দাঁড়ালেও তা সরকারের খাদ্যভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, স্ট্যাটিউটরি রেশনিং এবং গ্রামের ৫০ লাখ দুস্থ পরিবারের মধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণে সরকারি কর্মসূচির জন্য যথেষ্ট নয়। চার. সব ধরনের চালের দামে ঊর্ধ্বমুখিতা। ১২ আগস্ট প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার যেদিন (৭ জানুয়ারি, ২০১৯) দায়িত্বভার গ্রহণ করে, সেদিন ঢাকার বাজারে মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৩৮ থেকে ৪২ টাকা। গত ১১ আগস্ট তা দাঁড়ায় ৪৭ থেকে ৫৫ টাকায়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বরাত দিয়ে ১২ আগস্ট ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। শুধু মোটা চালের দাম বাড়েনি, বেড়েছে মাঝারি ও সরু চালের দাম। ১০ আগস্ট মানবজমিনের এক রিপোর্টে বলা হয়, মাঝারি ধরনের নাজিরশাইল ও মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬৬-৬৮ টাকা। আর সরু নাজির ও মিনিকেট ৭২ টাকা কেজিতে।

একটি ভালো দিক হলো, চলতি অর্থবছরে খাদ্য মন্ত্রণালয় সচেতন রয়েছে যেন চাল আমদানি নিয়ে গত অর্থবছরের শৈথিল্যের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। অবশ্য গত অর্থবছরে চাল আমদানিতে শৈথিল্যের জন্য যতটা না খাদ্য মন্ত্রণালয় দায়ী ছিল, তার চেয়ে বেশি দায়ী ছিল চাল উৎপাদন নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় সরবরাহকৃত অতিরঞ্জিত তথ্য। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরের আগের অর্থবছরে (২০১৯-২০) দেশে চালের উৎপাদন দাঁড়ায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ টনে। এদিকে কিছুদিন পরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেয়া হিসাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে চালের প্রকৃত উৎপাদন দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টনে। বিবিএসের হিসাবের সঙ্গে ডিএইর হিসাবের পার্থক্য দাঁড়ায় ২১ লাখ টনে। অর্থাৎ ডিএই ২১ লাখ টন বেশি চাল উৎপাদনের তথ্য সরবরাহ করে। ডিএইর হিসাবের এ গরমিলের কারণে সঠিক সময়ে চাল আমদানি করতে পারেনি সরকার—স্বয়ং খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এ অভিযোগ করেন। এক সংবাদ সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ করা তথ্যের চেয়ে প্রায় ২১ লাখ টন কম চাল উৎপাদন হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস। উৎপাদনের সঠিক তথ্যটি যথাসময়ে জানা গেলে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। আমদানির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা সত্ত্বেও ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ভাগে চাল আমদানির উদ্যোগ না নেয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি ইত্যাদির খেসারত দিতে হয় জনগণকে। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ৫০ শতাংশের বেশি আমদানি শুল্ক হ্রাস করে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরও বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে তেমন উৎসাহিত করা যায়নি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকারি খাতেও চাল আমদানি সম্ভব হয়নি। ফলে ওই অর্থছরের এপ্রিলে সরকারি গুদামে চালের মজুদ এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এর সুযোগ নেন চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা। দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ৫০ টাকায় পৌঁছে। আর মাঝারি ও সরু চালের দামেও বল্গাহীন ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়।

সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ও দেশের চাহিদার চেয়ে কম পরিমাণ চাল উৎপাদিত হওয়ায় সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে ঊর্ধ্বমুখী বাজার নিয়ন্ত্রণে চালের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে উৎসাহিত করার যে সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে আরো ভালো হতো যদি চালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশে নির্ধারণ করা হতো। কারণ দেশে চাল উৎপাদন অনেকটা প্রকৃতিনির্ভর। দেশে চাল উৎপাদনে শীর্ষস্থানে রয়েছে বোরো ফসল। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় সেই বোরো ফসল নষ্ট হওয়ার ঘটনা আমরা দেখে আসছি। চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আমন ফসলের প্রকৃতিনির্ভরতা আরো বেশি। গত অর্থবছর এবং এর আগের কয়েক অর্থবছরে আমন উৎপাদনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ বছরে প্রলয়ংকরী বন্যায় আমন উৎপাদন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও যে আমনের আবাদ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়। আর আমন আবাদের মৌসুম প্রায় শেষ হওয়ায় এখন ফসলটি বন্যার কবলে পড়লে পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ থাকবে না। বাজারদর স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনে চাল আমদানির পরিমাণ কমাতে-বাড়াতে পারবে—এফপিএমসির সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা যায়। তাই বেসরকারি খাতে কমপক্ষে আরো পাঁচ লাখ টন চাল আমদানি করা সমীচীন হবে। সরকারি খাদ্য গুদামে চালের মজুদ মোটামুটি সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখার জন্য সরকারি খাতেও কয়েক লাখ টন চাল আমদানি করা যুক্তিযুক্ত হবে।

 

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল: সাবেক খাদ্য সচিব