শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দারিদ্র্যমোচন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে এসএমই তথা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ভূমিকা ও অবদান আজ বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত। বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত নির্বিশেষে সব দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতে এসএমই খাতের গড় অবদান ৫০ শতাংশের বেশি হলেও বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। এ কারণে সরকার এসএমই খাতের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে ২০১৯ সালে প্রণয়ন করে পাঁচ বছর মেয়াদি এসএমই নীতিমালা। কিন্তু হতাশাজনক বিষয় হলো, নীতিমালা প্রণয়নের পর তিন বছর অতিবাহিত হলেও ৬০টি পরিকল্পনার ৪৪টিই বাস্তবায়ন হয়নি। অবশিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুই বছরেরও কম সময় রয়েছে। এতদিন যথাযথ নীতিমালার অভাবে এসএমই খাত এগোচ্ছে না বলে দাবি করা হলেও এখন বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টিও উঠে আসছে, যা কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতার পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও কাজের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

বিশ্বের বেশির ভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে এসএমই কৌশলগত স্থান দখল করে আছে। শিল্পায়নে এসএমই খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে জাপানের সফলতা বিপুল প্রশংসিত। জাপানের এসএমইগুলো সাবকনট্রাকটিং পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বৃহৎ ফার্মে সংযুক্ত থাকে। ফার্মগুলোর মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে এসএমইগুলোর কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য বা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর সাবকনট্রাকটিংয়ের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে প্রায়ই এসএমই খাতের উন্নয়ন ও বিকাশে সফলতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসএমই খাতের উন্নয়নে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সফল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, তারা এসএমই খাতের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা ও উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। সিঙ্গাপুরের ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি মন্ত্রণালয়াধীন স্ট্যান্ডার্ডস, প্রডাক্টিভিটি অ্যান্ড ইনোভেশন বোর্ড অব সিঙ্গাপুর হলো সে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। অর্থায়ন, সামর্থ্য ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ লাভ ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তায় এন্টারপ্রাইজ উন্নয়নের মুখ্য সংস্থা হিসেবে তার অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে। মালয়েশিয়ায় এসএমই খাতে নীতি-নির্দেশনা প্রদানের জন্য ন্যাশনাল এসএমই ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (এনএসডিসি) এবং নীতি প্রণয়ন ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও এজেন্সির এসএমই সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সমন্বয়ের জন্য আলাদা কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী সংস্থা এসএমই করপোরেশন মালয়েশিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় এসএমই উন্নয়ন কৌশল ন্যাশনাল মিডিয়াম ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে (২০১০-১৪)  অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা নিজ নিজ বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও এজেন্সির কৌশলগত পরিকল্পনা কর্তৃক অনুসৃত হয়। আসিয়ানভুক্ত আরেকটি দেশ থাইল্যান্ড শিল্প মন্ত্রণালয়ের পরিচালনাধীনে অফিস অব এসএমই প্রমোশন প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি এসএমই-বিষয়ক রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের বিন্যাস ও সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সংস্থা। বাংলাদেশে এসএমই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হলেও তাদের স্বল্প জনবল ও আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কাজই করতে পারছে না। যার প্রভাব পড়েছে নীতিমালার লক্ষ্য অর্জনে। তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন।

এসএমই নীতিমালার কৌশলগত লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিসিক ও এসএমই ফাউন্ডেশনের ওপর ন্যস্ত আর কৌশলসমূহ বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণের দায়িত্ব শিল্প মন্ত্রণালয়ের। ৬০টি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে বিসিকি ও এসএমই ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, বিবিএস, আইসিবি, বিটাক, এনপিও, নাসিব ইত্যাদি অধিদপ্তর, বিভাগ ও মন্ত্রণালয় জড়িত। তাদের কাজের সমন্বয়ের জন্য জাতীয় এসএমই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্স প্রস্তাবিত উদ্যোগসমূহের অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করবে। এক্ষেত্রে করোনাসহ অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায়নি সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। 

নীতিমালার অধিকাংশ পরিকল্পনার বাস্তবায়নে নিয়োজিত এসএমই ফাউন্ডেশন বলছে, ২০১৯ সালে এসএমই নীতিমালা গ্রহণের পর তারা যখন কাজ শুরু করে তখনই নভেল করোনাভাইরাস হানা দিয়েছে, যার জন্য সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম প্রায় দুই বছর স্থগিত ছিল। এ কারণে এসএমই নীতিমালার লক্ষ্য অর্জন থেকে পিছিয়ে রয়েছে তারা। এ কথা সত্য, করোনার প্রভাবে কাজ কিছুটা শ্লথ হয়েছে। তবে সেটি তাদের জন্য একটি সুযোগও করে দিয়েছে। করোনোর কারণে এসএমই শিল্পের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। এসএমই ঋণ বিতরণে এসএমই ফাউন্ডেশনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যাংকের সঙ্গেও তারা কাজের সুযোগ পেয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম আরো এগিয়ে নিতে হবে। তারা সফলভাবে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় মেলা আয়োজন করছে। এসব ভালো দিকের মধ্যে মন্দ দিক হলো নীতিমালার অধিকাংশ লক্ষ্য অবাস্তবায়িত থেকে যাওয়া। এসএমই নীতিমালার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সার্বিক দায়িত্ব বিসিক ও এসএমই ফাউন্ডেশনের। এক্ষেত্রে তাদের আরো সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে নীতিমালার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য বিভাগ ও অধিদপ্তরও সহায়তা করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে তা দূরীকরণের উদ্যোগ জাতীয় এসএমই টাস্কফোর্স নিতে পারে। 

নীতিমালার পরিকল্পনার অধিকাংশই বাস্তবায়ন না হওয়ায় এসএমই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে নতুন নয়। কোনো পরিকল্পনা শতভাগ অর্জিত হওয়ার রেকর্ড নেই। এসএমইর ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটুক তা কারো কাম্য নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামী দিনের অগ্রগতি যে খাতের ওপর নির্ভর করছে তাকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে প্রণীত নীতিমালা যথাযথ বাস্তবায়নে আরো সতর্ক দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে উচ্চপর্যায়ের দুটি কমিটিও গঠন করেছে। এর একটি জাতীয় এসএমই উন্নয়ন পরিষদ ও জাতীয় এসএমই টাস্কফোর্স। নীতিমালার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাদের আরো তৎপরতা প্রয়োজন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে যারা কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাবে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এসএমই খাত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মানবসম্পদের উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে যুগের চাহিদা বা চ্যালেঞ্জ মেটানোর মতো উপযোগী করে গড়ে তোলা। সরকারকে এখন থেকেই সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে হবে।

এসএমই খাতের বিকাশকে বেগবান করার ক্ষেত্রে সঠিক কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সুষ্ঠু এসএমই কৌশল গ্রহণ প্রধানত তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে— অনুকূল নীতি ও রেগুলেটরি পরিবেশ, টেকসই ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত উদ্যোক্তাদের (নারী, গ্রামীণ দরিদ্র, যুবক, অক্ষম ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ) আর্থিক ও ব্যবসা সহায়ক সেবা সহায়তা লাভের সুযোগ প্রাপ্তি। এ তিনটি প্রধান বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এসএমই উন্নয়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে নীতিগত ও রেগুলেটরি সংস্থার কার্যক্রম প্রসারে কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি এসএমইকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা উন্নয়ন ও আর্থিক সেবা সহায়তা প্রদানকারী আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি ও সেগুলোকে শক্তিশালীকরণে কৌশল গ্রহণ এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি।