চীন ও ভারত বড় বাজার হলেও উভয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েই চলছে এবং সহসাই এটি কমার সম্ভাবনাও নেই। উভয় দেশই নিজ বাজারে বাংলাদেশী পণ্য আমদানিতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। কিন্তু সে সুবিধা ব্যবহার করে দেশ দুটিতে রফতানি কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়াতে পারছে না বাংলাদেশ। এর অন্যতম কারণ চীন ও ভারতে যে ধরনের পণ্য আমদানির চাহিদা রয়েছে, তার অধিকাংশই বাংলাদেশে উৎপাদন হয় না। আবার কিছু পণ্য উৎপাদন হলেও সেগুলোর দাম ও মান বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারেনি। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা বর্তমান সময়ে বড় কোনো ইস্যু নয়। কারণ বাংলাদেশ যেমন চীন ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে ঘাটতিতে রয়েছে, ঠিক তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে উদ্বৃত্তে রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভারত ও চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের রফতানি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে কিনা। অবশ্যই আছে। সেক্ষেত্রে দেশ দুটির মানুষের চাহিদা সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণাপূর্বক পণ্য উৎপাদন ও তা সরবরাহ করতে হবে। তাছাড়া ভারত ও চীন শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও বেশকিছু অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে, যা দূরীকরণে কূটনৈতিক সক্রিয়তা বাড়াতে হবে।
ভারত থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি ব্যাপক হারে বেড়েছে। গত অর্থবছরে ভারত থেকে যেসব দেশ পণ্য আমদানি করেছে, তার মধ্যে চতুর্থ বৃহত্তম অবস্থানে উন্নীত হয়েছে বাংলাদেশ। দুই বছর আগে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল নবম। ভারত থেকে আমদানিই শুধু নয়, সে দেশে বাংলাদেশের রফতানিও বেড়েছে। তবে আমদানির সঙ্গে রফতানির তফাত অনেক বেশি। করোনার সংক্রমণ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে তুলনামূলক কম দূরত্বের বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বাণিজ্য উচ্চ হারে বেড়েছে। বাংলাদেশকে রফতানি বাড়ানোয় মনোযোগ দিতে হবে। ভারতে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি আরো বাড়ানো সম্ভব। এর জন্য রফতানিকারকদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত মান পরিপালনের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। তবে ভারতের বাজারে অনেক সময় অযৌক্তিকভাবে অশুল্ক বাধা আরোপ করা হয়। অশুল্ক বাধা দূর করার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং রফতানিকারকদের নেগোসিয়েশন দক্ষতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের পাটপণ্য রফতানির ওপর উচ্চ হারে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্কারোপ করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এটি প্রত্যাহারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তেমন উচ্চবাচ্য লক্ষ করা যাচ্ছে না। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ চীনের বাজারে বাংলাদেশ ৯৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুুক্ত সুবিধা পায়। কিন্তু পণ্য বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অভাবে রফতানি বাণিজ্যের এ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ সুবিধা কাজে লাগাতে হলে চীনের বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে উৎপাদিত পণ্য চীনে পাঠানোর মাধ্যমে রফতানি আয় বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন খাতে চীনের আঞ্চলিক কেন্দ্র হতে পারে বাংলাদেশ। কভিড-১৯-পরবর্তী ২০২১ সালে চীন বাংলাদেশকে ৯৭ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়। এর আগে ছিল ৬১ শতাংশ। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের সময় আরো ১ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার আশ্বাস দেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরো কিছু পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব।
রফতানি বৈষম্য কমাতে নতুন কিছু পণ্যের তালিকা দেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক মাছ, সবজি, ফল, চামড়াজাত পণ্য, লাইভস্টক ফিশারিজ, কুটির শিল্প, মধু, পাট এবং পাটজাত ও তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য। চীন বিশ্ববাজার থেকে বছরে ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার পণ্য আমদানি করে। বাংলাদেশ যদি এর ১ শতাংশ রফতানি করতে পারে তাহলে এ আয় দাঁড়াবে ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধায় বাংলদেশের ভারত ও চীনের বাজারে প্রবেশ যথেষ্ট নয়। এজন্য ভারত ও চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। পোশাকের বাইরে পণ্য বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে। দেশ দুটির সঙ্গে পিটিএ, এফটিএ চুক্তির জন্য বিটুবি বা জিটুজি আলোচনা হতে পারে। ভারত ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে পণ্য বহুমুখীকরণ করতে হবে সর্বাগ্রে। পাশাপাশি বিনিয়োগের মাধ্যমে রফতানি বাড়ানো গেলে বাণিজ্য ঘাটতি কমবে। বাংলাদেশ থেকে ছোট ছোট কিছু পণ্য গেলেও বেশির ভাগ রফতানি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে চীন বিশ্বের প্রধান রফতানিকারক দেশ। তাই রফতানি বাড়াতে পোশাকের বাইরে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম, প্লাস্টিক, চামড়াজাত পণ্যে জোর দেয়া হচ্ছে। পণ্যের বৈচিত্র্য নিয়ে বাংলাদেশ কাজ করছে। এছাড়া দেশটিতে যাতায়াত ও ভিসা জটিলতা রয়েছে, তা দূর করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শীর্ষ রফতানি বাজারগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, জাপান, চীন, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, সুইডেন, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাংলাদেশের অর্থনীতি রফতানিনির্ভর। এক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলে দেশের সার্বিক কর্মসংস্থানসহ সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়বে। ফলে রফতানি আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে করণীয় নির্ধারণসহ পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন বাজার অনুসন্ধান ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান রফতানি পণ্যের দিকেও নজর দিতে হবে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে প্রায় সময়ই। অনেক বাধা-বিপত্তির কারণে মাঝেমধ্যে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য হোঁচট খাচ্ছে। তেমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
ভারত-চীনের বাজার বিশাল হলেও প্রতিযোগিতামূলক। স্থানীয় উৎপাদন-সরবরাহকারীদের সঙ্গে ভালো মানের বিদেশী কোম্পানিই এখানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। তবে ভোক্তাদের আচরণগত ধরন অনুসারে বলা যায়, উচ্চ হারে মূল্য সংযোজিত পণ্যের চাহিদা দেশটিতে ক্রমেই বাড়তে থাকবে। বর্তমানে চীনের বাজারে রফতানি বৃদ্ধির জন্য মানসম্মত পণ্য ও অনলাইনে এসব পণ্যের ব্যাপক হারে প্রচারণা থাকতে হবে। দেশটির প্রধান ২০ আমদানি পণ্যের একটিও রফতানি করে না বাংলাদেশ। তাই প্রচলিত পণ্য দিয়ে চীনের বাজার কোনোভাবেই দখল করা সম্ভব নয়। ২০২১ সালে চীনের মোট আমদানির ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশই এসেছে চীন নিয়ন্ত্রিত তাইওয়ান থেকে। এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, চিলি, ইতালি, কানাডা, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পণ্য আমদানি করে চীন। তবে বর্তমানে চীনের প্রধান ২০ আমদানি পণ্যের একটিও বাংলাদেশ রফতানি করে না। তাই চীনের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা খুব বেশি নয়। তবে চীন একটি বড় বাজার হওয়ায় বাংলাদেশের রফতানীকৃত পণ্যের চাহিদা রয়েছে। ভারতের বাজারও বৃহৎ। তাদের পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী জোগান বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক।
ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। আমাদের প্রয়োজনেই অনেক পণ্য ভারত থেকে আমদানি করি। সেখান থেকে আমদানীকৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে অতি প্রয়োজনীয় উৎপাদনমুখী কাঁচামাল ও দ্রব্যাদি। যেমন সুতা, কাপড়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও কয়লা, যানবাহন, যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, পাথর, চুনাপাথর ইত্যাদি। আমরা আমদানি করি বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য। যেমন চাল, গম, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ও অন্য ভোগ্যপণ্য। এ আমদানি যদি ভারতের বদলে চীন থেকে করা হয়, তাতে খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি সময়ও বেশি লাগবে। ভারত থেকে যে পণ্য তিনদিনে চলে আসতে পারে, সেটা চীন থেকে আসতে তিন মাসও লেগে যেতে পারে। সেদিক থেকে ভারত স্বাভাবিকভাবেই আমাদের জন্য সুবিধাজনক। বাণিজ্য ঘাটতি থাকুক; একই সঙ্গে ভারতের বাজারেও আমাদের পণ্য রফতানি বাড়ানোর বিষয়ে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। কারণ, সেখানকার বিশাল বাজার ধরতে পারলে বাংলাদেশ ব্যাপক লাভবান হবে। বিশেষ করে ভারতের তৈরি পোশাকের বাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে আমাদের রফতানি অবশ্য বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত দ্রব্য, সাবান, গার্মেন্টস সামগ্রী, ব্যাটারি, মাছ, কেমিক্যাল, এসি ও ফ্রিজ ভারতে রফতানি হচ্ছে। এসব পণ্য রফতানি আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়ার সময় থেকে চীন-ভারতের ক্ষেত্রে শুল্ক সমস্যা কেটে গিয়েছে। তবে অশুল্ক বাধার ক্ষেত্রে বাজার নিয়মনীতি একটা চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমা বাজারের নিয়মকানুন আমাদের জানা রয়েছে। কিন্তু আঞ্চলিক বাজার বিশেষত চীন-ভারতের বাজার সম্পর্কে ধারণা অপ্রতুল। অর্থাৎ পশ্চিমা বাজারকেন্দ্রিক মনোযোগ আমাদের এখনো রয়ে গিয়েছে। আঞ্চলিক বাজারের প্রতি গুরুত্ব নিশ্চিত হলে চীনা বাজারে বাজার সুবিধা কাজে লাগানো অনেক সহজ হবে। দুটি দেশই আমাদের চেয়ে সস্তায় পণ্য উৎপাদন করতে পারে। অন্যদিকে আমাদের রফতানির ঝুড়িতেও তেমন পণ্যসম্ভার নেই বললেই চলে। রফতানি পণ্য বাড়াতে গেলে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নিতে হবে।
বর্তমানে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য চালু রয়েছে এর বাইরে আরো নতুন দেশে বাজার খোঁজার চেষ্টা জোরালো করতে হবে। রফতানি বাণিজ্যের বিকাশ ঘটাতে হলে উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের পণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ায় এর বাজার বিস্তৃতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সে সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।










