কভিড-১৯ এর কমিউনিটি সংক্রমণ হতে না হতেই করোনা রোগীদের প্রতি যে সামাজিক ঘৃণা আর অবজ্ঞার চর্চা চলছে তা দেখেই চিন্তা করলাম এই ধরনের সোশ্যাল স্টিগমা নিয়ে কিছু লেখা দরকার। যে কোন সংক্রামক রোগের সাথে সোশ্যাল স্টিমগা বা সামাজিক কালিমা লেপনের একটা অদ্ভুত সম্পর্ক দেখা যায়। অন্যান্য রোগের সাথে সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের একটা যোগসূত্র থাকলেও সংক্রামক ব্যধির চরিত্রটা ভিন্ন। সেই ভিন্নতাকে আরো বেশি প্রকট করে তুলেছে চলমান কোভিট-১৯ এর বৈশ্বিক সংক্রমণ। সংক্রমণ যখন পেনডেমিকে রূপ নেয় তখন সোশ্যাল স্টিমগার ধরন শুধু জটিলই হয়না,এই রোগে আক্রান্তরা সমাজের জন্য ভীতিকর একটা বস্তু বলেই সাব্যস্থ হয়। এই করোনাকালে কোভিট-১৯ এ আক্রান্তরা এক অদ্ভুত রকমের সামাজিক দুর্ব্যবহারের শিকার; যার ফলে সামাজিক আচারের ধরণ সোশ্যাল স্টিগমার মধ্যে সীমিত থাকেনা, এর আচার অনেকটা social ostracism বা সামাজিক নির্বাসন/ সামাজিক ধিক্কারের জায়গায় চলে গেছে।

এমনো দেখা যাচ্ছে,করোনা রোগী না হওয়া সত্বেও কোথাও ভর্তি নিচ্ছে না, এক হাসপাতাল থেকে আরেক  হাসপাতালে ছুটাছুটি করতে করতে অবশেষে মৃত্যু। এই যখন অবস্থা, তখন বুঝতে বাকি নেই যে,সোশ্যাল স্টিগমা নিজেই একটা সামাজিক ব্যাধি। এটা এ কারনে যে, বিভিন্ন নেতিবাচক ধ্যান ধারনা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতায় মানুষ রোগিদের সাথে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলে।আমরা তো দিব্যি দেখছি, গরীবেরা ধনীদের চোখে রোগী, কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের চোখে রোগী, ঠিক একই রকম শূদ্ররা ব্রাহ্মণদের চোখে, রোহিঙ্গারা বাঙ্গালীর চোখে রোগী। এই অমানবিক কালচারেরবিস্তার মানুষে মানুষে দূরত্বই বাড়াচ্ছে না, জন্ম দিচ্ছে ঘৃণা, জিঘাংসা আর পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার। কোভিড-১৯ এর মত নতুন ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ আর মৃত্যুর মিছিল সামাজিক সম্পর্কের জায়গাকে দিয়েছে ভিন্নরূপ। সাধারণত মানসিক রোগীরা সুস্থ মানুষদের হাতে নিগ্রহের শিকার হতো, কারন সুস্থরা এই ধারণা করত যে মানসিক রোগীরা হঠাত করে যে কোন ক্ষতি করে ফেলতে পারে, অথবা তাদেরকে মনে করা হত এই সমাজের বাহিরের অন্য প্রজাতি।

কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীরা যদিও মানসিক রোগী নয়, তবুও তারা এখন সবচেয়ে বেশি সামাজিক নিগ্রহ, অপদস্থ আর অন্যায় আচরণের শিকার। এর কিছু স্বাভাবিক ও সামাজিক কারণ আছে। প্রকৃতিগতভাবে মানুষ নিরাপদে থাকতে চায়। কিন্তু করোনা রোগীর সংস্পর্শে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে বিধায় সামাজিক দূরত্বের প্রয়োজন দেখা দেয়। সামাজিক সংক্রমণের হাত থেকে সুরক্ষার জন্য চালু হয় লকডাউন। এই ভীতিকর পরিস্থিতিতে আমরা সামাজিক দূরত্ব যথার্থতার সাথে না মানলেও সোশ্যাল স্টিগমা প্রথা দ্বারা অধিক আক্রান্ত হচ্ছি। এর তিনটি কারন তুলে ধরেছে ইউনিসেফ- ১. এটা সম্পূর্ণ নতুন রোগ যা সম্পর্কে মানুষ অজ্ঞাত ২. এটা অজ্ঞাত বলেই মানুষ ভীতিতে থাকে ৩. এই ধরণের ভীতি অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া খুবই সহজ (ইউনিসেফ, ২০২০)। সোশ্যাল স্টিগমার পেছনে এই তিনটি কারন ছাড়াও গবেষকরা আরো কিছু কারণ উল্লেখ করেনঃ সামাজিক সম্পর্কের আবেগের মধ্যে ব্যত্যয় সৃষ্টি (Baumann et al., 2005), বিপদজ্জনক পরিস্থিতি (Angermeyer, Matschinger, & Corrigan, 2004), মানসিক অসুস্থতা (Baumann, 2007), অসুস্থদের উপর দায়িত্ব ঘাড়ে আসার ভয় (Dietrich et al., 2004), অসুস্থদের কাছ থেকে আক্রান্ত হবার ভয় (Angermeyer,Beck, & Matschinger, 2003) ও লেবেলিং করার মানসিক প্রকৃতি (Angermeyer& Matschinger, 2005)।

কভিড-১৯ এর সাথে উপরোক্ত কারণগুলোর সম্পর্ক আছে, কেননা সংক্রমিত হওয়ার ভয় ও আতঙ্কিত থাকার যে মানসিক প্রকৃতি তাতে সামাজিক দূরত্ব আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যার জটিলতা শুধু মানসিক প্রকৃতি আর সামাজিক লেবেলিং এর মধ্যেই সীমাবন্ধ নয়। এর জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বাউমেন (২০০৭) ‘International Review of Psychiatry’তে উল্লেখ করেন যে- রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসার বিষয়ে জ্ঞানগত অস্পষ্টতা থেকেই মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণার বিস্তার ঘটে, যার পরিনতিতে মানুষে মানুষে বৈষম্য ও সামাজিক অপদস্ততা (social stigma) বেড়ে চলে।

করোনার এক বিপজ্জনক দিক হল, মানবদেহে এই রোগের লক্ষণ পেতেও পারে, নাও পারে। ফলে যে কেউ যে কারো মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। সে কারনে লকডাউন ও কোয়ারেন্টাইন নিয়ম মেনে চলতে বলা হয়। আমাদের দেশের অনেক মানুষ এই নিয়ম নীতি মানতে পারেনা আর্থিক সঙ্কটের কারনে, ভোগ লিপ্সার কারনে, এমনকি ধৈর্য হারিয়ে ফেলার কারণে। যত্র তত্র ঘুরে বেড়ানো, বেশি বেশি বাজারে যাওয়া, ত্রাণ বা বকেয়া বেতনের দাবী তোলার জন্য দূরত্ব মেনে চলা আর সম্ভব হয়না। কিন্তু যখনি শুনতে পায়- কেউ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে, তখনি সবাই তাকে শুধু বিচ্ছিন্নই  রাখেনা, তাকে লেবেলিং করে সামাজিক ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়।

এ ধরণের ঘৃণা আর অবজ্ঞার কালচার স্পষ্ট হয় তখন, যখন দেখি করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা  হাসপাতাল বানাতে গেলেই এলাকার লোকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে দলবেঁধে ছুটে এসেছিল, শ্লোগান তুলেছিল এই বলে যে, এখানে হাসপাতাল বানাতে দিবেনা। এলাকার প্রভাবশালীরা তাদের ফায়দা লুটতে মানুষের অসামাজিক সোশ্যাল স্টিগমাকে কাজে লাগিয়েছিল। এমনো হয়েছে, ঠাণ্ডা কাশি নিয়ে কোন রোগী হাসপাতালে এলেই নার্স, ডাক্তার তার চিকিৎসা না করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে করোনা রোগীরা অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য হাসাপাতালে গেলেও নিজেকে করোনা রোগী হিসেবে প্রকাশ করতোনা। সোশ্যাল স্টিগমা থেকে সাময়িক রক্ষার পরিনতিতে ডাক্তার, নার্সসহ অনেকের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, যে ডাক্তারদের সেবা ছাড়া মানুষের দিন চলে না, সেই ডাক্তাররা এখন আরো বেশি মাত্রায় সোশ্যাল স্টিগমার শিকার। বাড়ির মালিকেরাডাক্তারদের বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেয়া শুরু করে। অপ্রতুল পিপিই আর সোশ্যাল স্টিগমার ফাঁদে পড়ে ডাক্তার- নার্সরা অচ্চ্যুত হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে জঘন্য বিষয় হল, নারায়ণগঞ্জে এক ডাক্তার পরিবারের ১৭ সদস্য করোনা পজিটিভ হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর এলাকার লোকেরা সেই পরিবারের প্রতি কোন সহমর্মিতা তো দেখাইনি, উল্টো ঐ পরিবারের উপর এলাকার মানুষেরা ঘৃণা, অবজ্ঞা আর ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে। এমনো হয়েছে,  এলাকার কিছু অমানুষ ওদেরকে এলাকা ছেড়ে যেতে হুমকী দেয়, তা না হয় মারার মত ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। এর মানে সোশ্যাল স্টিগমার কালচার সারাদেশে বিস্তৃত। এই কালচারের উদ্দেশ্য কি নিজেদের সুরক্ষা? আসলে তা নয়। যদি তাই হত, তাহলে এত সাবধান করার পরও বাজারে মানুষের উপচে পড়ে ভীড় কেন? ত্রাণ বা চাল বিতরণে দূরত্ব মানা হচ্ছেনা, দোকানপাটে আড্ডা থামছেইনা, কি গ্রাম কি শহর কোথাও মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব, সীমিত পরিসর ছাড়া। তাহলে কেন করোনা রোগীদের সামাজিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে?

দিনে দিনে মানুষের স্বার্থপরতা নির্মমভাবে বেড়ে চলছে। এক পরিবারের আক্রান্ত ১৭ জনকে এমনভাবে ঘৃণা করা হচ্ছে, মনে হয় যেন এরা দাগী আসামী বা খুনি। কোন এলাকায় কোন নারী যদি গণধর্ষণের শিকার হয়, আর ধর্ষক ৪/৫ জনকে যদি একটা ঘরে আটকে রাখা হয়, তবুও এলাকার মানুষ ওদের উপর এতটা ক্ষুব্ধ হবেনা, যতটা হচ্ছে ১৭ জনের ঐ পরিবারের উপর।

আমরা যে এতোকাল আমাদের সামাজিক বন্ধন আর সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে গর্ব করতাম তা আসলে বন্ধনের খোলস ছিল, সেই বন্ধনের প্রকৃতি যে কতটা নকল আর ফাঁপা তা করোনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আমরা সব কিছু করতে চাই আমাদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ আর আবেগের বশে। সে কারনে ইমাইল ডুরখেইমের গ্রাম-ভিত্তিক ‘যান্ত্রিক সামাজিক সম্প্রীতি’ (mechanical solidarity) আর নগরকেন্দ্রিক ‘জৈবিক সামাজিক সম্প্রীতি’ (organic solidarity) -দুটোই এক বিপর্যস্ত অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছে। আমরা নিজেদের অধিকার সংশ্লিষ্ট স্বার্থ বুঝিনা বলেই সামাজিক দূরত্ব মানতে চাইনা; না চাই নিজের সুরক্ষা, না চাই অন্যকে বিপদ থেকে রক্ষার চিন্তা। গরীবের ত্রাণ মেরে খাওয়ার অপরাধ যারা করছে তারা উপরে উল্লেখিত দুই ধরণের সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। কিন্তু সামাজিকভাবে যে সোশ্যাল স্টিগমার কালচার চলছে তাতে করে সব ধরনের সামাজিক সম্প্রীতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে পড়েছে।

সোশ্যাল স্টিগমার এই অপকালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জ্ঞানগত দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে,  যেমন- ১. করোনা রোগের লক্ষন প্রকাশিত হওয়ার আগেই ভাইরাস অন্য মানুষের মাঝে ছড়ানোর সম্ভাবনা অধিক ২. লক্ষণ ছাড়াও করোনা রোগী থাকতে পারে, কিন্তু সীমিত কিট পরীক্ষার কারনে তাদের পরীক্ষার আওতায় আনা হয়না ৩. রোগীদের প্রতি ঘৃণা আর অবজ্ঞা না করে আত্ম সাবধানতাকে গুরুত্ব দেয়া দরকার ৪.  অবজ্ঞা করলে এই রোগ থেকে বাঁচা যাবেনা, দরকার স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলে নিজ ঘরেই অবস্থান করা ৫. মানুষ যেহেতু উচ্চতর সামাজিক জীব, মানুষের প্রতি মানুষের জ্ঞানভিত্তিক ভালোবাসা জরুরী ৬. করোনা নিয়ে তথ্য বিভ্রাট দূর করতে মিডিয়াকে আরো কার্যকরী করতে হবে। আমরা শুধু করোনার হাত থেকেই বাঁচতে চাইনা, আমরা চাই সোশ্যাল স্টিগমার মত জঘন্য সামাজিক অনাচার থেকে মুক্তি।

আশেক মাহমুদ

সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

পি এইচ ডি গবেষণাধীন,

ইউনিভার্সিটি অব মালায়া, মালয়েশিয়া
ashmahmud@gmail.com