বাংলাদেশের শিল্পায়নের যাত্রাটি গোছানো হলেও পরবর্তী সময়ে সেটি অপরিকল্পিতভাবেই বড় হয়েছে। পাকিস্তান শাসনামলে ঢাকার তেজগাঁওয়ের মতো কিছু এলাকাকে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল শিল্পায়নের জন্য কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর বিশেষত নব্বইয়ের দশকে এটি বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম অবস্থায় শিল্পায়নকে উৎসাহিত করতে সরকারও অপরিকল্পিত ও যত্রতত্র গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানার বিরুদ্ধে বড় কোনো পদক্ষেপও নেয়নি। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে অপরিকল্পিত শিল্পায়নই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল বণিক বার্তায় সীতাকুণ্ড-মিরসরাই শিল্প জোনের অপরিকল্পনার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, সরকারি শিল্প-কারখানার জন্য গড়ে তোলা অঞ্চলটি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। মহাসড়কের এক পাশে জাহাজ ভাঙা শিল্প ও আরেক পাশে বেসরকারি খাতের ভারী শিল্প-কারখানার নতুন শিল্প জোনে পরিণত হয়েছে। সরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি না থাকায় এখানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রথম অবস্থায় অপরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন হলেও এখন সেগুলোকে পরিকল্পনার আওতায় আনা জরুরি। কারখানায় কর্মরতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে আনতে হলে এর বিকল্প নেই। 

বাংলাদেশে পরিকল্পিত শিল্পায়নের অন্যতম সফল উদাহরণ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড)। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ইপিজেডে। কঠোর তদারকি ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে রফতানি আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিল্পাঞ্চলগুলো অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলছে। ইপিজেডগুলোয় দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার হারও কম, ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতি থাকে নিয়ন্ত্রিত। ইপিজেডের সাফল্যের ওপর নির্ভর করেই সরকার দেশজুড়ে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের কাজ শুরু করে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তৈরি পোশাক শিল্পকে একটি অঞ্চলের আওতায় আনতে গার্মেন্টস পল্লীও তৈরি করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে শিল্পায়ন আকৃষ্ট করতে করছাড়সহ নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছে সরকার। হতাশাজনক বিষয় হলো, এখনো আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। কারখানাগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকায় তদারকি করাও ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। শিল্পায়নের অতিরিক্ত ছড়িয়ে যাওয়ার ফলে সরকারকে সমস্যায়ও পড়তে হচ্ছে। যেখানে কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে এমন সব জায়গায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগসহ আরো কিছু সুবিধা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। অথচ শিল্পায়ন যদি পরিকল্পিত হয়, তাহলে সুনির্দিষ্টভাবে একটা এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুতের সংযোগ টেনে দেয়া যায় কিংবা গ্যাস ও পানির একটা বড় সংযোগ টেনে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজগুলো চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয়। আলাদা করে বিচ্ছিন্নভাবে শত শত সংযোগ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। 

শিল্প উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই পরিকল্পিত শিল্প এলাকার বাইরে শিল্প গড়ে তুলতে আগ্রহী। এ কারণে নিজেদের মতো করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি কিনে সেখানে কারখানা স্থাপন করছেন। এতে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এর একটি হলো শিল্প স্থাপনের জন্য বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি বিনষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে কারখানাগুলোয় কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ স্বতন্ত্রভাবে কারখানার নিরাপত্তায় ব্যয় অনেক বেশি। অর্থনীতির বিকাশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান জরুরি হলেও তা কোথায় স্থাপন হচ্ছে, কীভাবে বিস্তার ঘটছে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বেশির ভাগ শিল্প স্থাপন করা হচ্ছে অপরিকল্পিত এলাকায়। রাজধানী ঢাকা, বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামসহ সব এলাকায় একই চিত্র দৃশ্যমান। তবে সরকার এখন পরিকল্পিত এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতি বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ঢাকার মধ্যেই হাজারীবাগে যুগের পর যুগ ধরে গড়ে ওঠা চামড়া শিল্প-কারখানা ঢাকার অদূরে সাভারে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেখানে কিছু সমস্যা হলেও ক্রমান্বয়ে সেগুলোর সমাধান হবে বলে আশা করা যায়। তবে এর বাইরে ওষুধ শিল্প, কেমিক্যাল শিল্প একই জায়গায় সরিয়ে নেয়ার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু উদ্যোগগুলোর শ্লথগতি দুর্ঘটনার শঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। 

পরিকল্পিত শিল্পায়নের সফল উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ভিয়েতনাম। ভিয়েতনামে শিল্পায়ন হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। শিল্পাঞ্চল তৈরি করে সব সুবিধা নিশ্চিত করায় বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে দ্রুত। পাশাপাশি দেশটি দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে দৃষ্টি দিয়েছে। আজ দেশটিতে শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল রয়েছে। জাপানেও শিল্পায়ন সম্প্রসারণ হয়েছে শিল্প জোনিংয়ের মাধ্যমে। দেশটিতে তিনটি বৃহত্তম শিল্প অঞ্চল রয়েছে, আছে আরো ছোট-মাঝারি অঞ্চল। এগুলোয় পরিকল্পিতভাবে শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। রাসায়নিকসহ দাহ্য শিল্পগুলোকে এক স্থানে রেখে সেগুলোর নিরাপত্তায় বাড়তি নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে ব্যয় সাশ্রয়ী প্রক্রিয়ায় মালিকপক্ষ ও সরকার কাজগুলো সঠিকভাবে সমাধান করতে পারছে। বাংলাদেশে দেশব্যাপী শিল্প-কারখানা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় সেগুলো নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সুযোগে উদ্যোক্তারা নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করছে। এতে দুর্ঘটনা বেড়ে উঠছে। 

ব্যবসা, শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোর অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি নির্মাণ ও উন্নয়নের সময় ভবন ও কমপ্লেক্সের মধ্যে ইমারতসংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা, ব্যবহারকালীন নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ও দুর্যোগকালীন প্রস্তুতির বিরাট ঘাটতি শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের নিরাপদ জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে বারবার এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ প্রভৃতি ঘটনা ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে, যার অবর্ণনীয় ক্ষতি রাষ্ট্র তথা সাধারণ জনগণের ওপর ভয়ংকরভাবে নেমে এসেছে।

পূর্বাপর বিস্ফোরণ ও অগ্নিদুর্ঘটনার সময়, বিশেষত বিএম কনটেইনার টার্মিনাল, নিমতলী, চুড়িহাট্টা, রূপগঞ্জ হাশেম ফুডস ফ্যাক্টরির ঘটনাগুলোর অব্যবহিত পরে রাষ্ট্র কর্তৃক এ ধরনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ এবং রাসায়নিক দ্রব্যাদির নিরাপদ ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে করণীয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও দপ্তরগুলোর দায়দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এটা বিস্ময়কর যে এ ধরনের ঘটনাগুলোর হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা ধারণ করার পরও দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখায়নি। সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপো এবং সম্প্রতি সীমা অক্সিজেন কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনায় বিস্ফোরক অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, শ্রম অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন প্রত্যেকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়টি আবারো সামনে উঠে এসেছে। 

শিল্প-কারখানা ও রাসায়নিক গুদাম-ডিপোগুলোকে যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও নিয়মনীতির মধ্যে নিয়ে এসে শ্রমিকের জীবন ও জীবিকার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান প্রতিপালনে শিল্প-কারখানা, গুদাম-ডিপোগুলোকে বাধ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পরিকল্পিত শিল্পায়নে জোর দিতে হবে। 

শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে পরিদর্শনের আলোকে অগ্নি ও অন্যান্য দুর্ঘটনা নিরোধের বিদ্যমান অবস্থা পর্যালোচনা করে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করে কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমর্যাদায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পোশাক রফতানিসহ চামড়া রফতানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, জুতা ও বাইসাইকেলসহ রফতানি পণ্য বিদেশে নির্বিঘ্ন রফতানিতে যে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে তাতে সব কারখানা ও তার পরিবেশের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে সরকারি নীতি সহায়তা ও তদারকি আরো জোরদার করা উচিত।