টেকসই উন্নয়ন ও সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদারে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা সম্প্রসারণে সচেতনতা বাড়ছে। ১৯৯৯ থেকে ২০১৫ সময় পর্বের জন্য ২১টি অভীষ্ট ও ৬০টি সূচক নিয়ে জাতিসংঘ আটটি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) গ্রহণ করেছিল। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দেশ তাদের নিজস্ব নৈপুণ্য বা কর্মকৃতি মূল্যায়ন করছে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ উন্নয়ন এজেন্ডা হিসেবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) গ্রহণ করেছে; যা অর্জনের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০৩০ সাল নাগাদ। রাষ্ট্র ও নিজস্ব অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ বাজার এবং উত্তর ও দক্ষিণ উভয় মেরুর দেশগুলোর মধ্যকার জটিল সম্পর্কের প্রাসঙ্গিকতায় এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা ও ১৬৯টি অভীষ্ট অর্জন করতে হবে।
২০১৫ সালের জুলাইয়ে আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সমবেত রাষ্ট্রপ্রধান ও ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা পুনর্নিশ্চিত করেছেন যে শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে দরিদ্র দেশগুলোর উন্নয়নে অর্থায়নের জন্য একটি বৈশ্বিক কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), ভূমিবেষ্টিত
উন্নয়নশীল দেশ (এলএলডিসি) ও উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর (এসআইডিএস) অবস্থা রূপান্তরে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ও সংহতি উৎসাহিত করতে দক্ষিণ-দক্ষিণ এবং ত্রিপক্ষীয় বা ত্রিমাত্রিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বিপুল অংশেরই বাস এশিয়ায়।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস করে দক্ষিণ গোলার্ধের রাষ্ট্রগুলোয়। বিশ্বায়নের উত্থান বিশ্ব অর্থনীতির উন্মুক্ততা বাড়িয়েছে; যেটি দেশ, দাতা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক করপোরেশন, ব্যক্তি উদ্যোক্তা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে এ থেকে দেশগুলো অভিন্নভাবে সুফল পায়নি। কিছু দেশ এমনকি বৈশ্বিক উন্নয়নের ‘নেতিবাচক প্রভাবে’ ভুগেছে। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো সুনির্দিষ্টভাবে পিছিয়ে; চীন, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কিছু বড় দেশ ছাড়া।
জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী, ‘স্বল্পোন্নত
দেশের’ তালিকায় রয়েছে ৪৮টি দেশ। এর মধ্যে কিছু দেশকে ভূমিবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ এবং কিছু দেশকে উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় আফ্রিকা মহাদেশের ৩৪টি দেশ, এশিয়ার নয়টি দেশ, ওশেনিয়া অঞ্চলের চারটি দেশ এবং আমেরিকা অঞ্চলের (আমেরিকাস) একটি দেশ রয়েছে।
এলডিসি ক্যাটাগরি সূচিত হওয়ার পর থেকে কেবল ১০টি দেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার প্রথম দেশ ছিল বতসোয়ানা, ১৯৯৪ সালে। দ্বিতীয় দেশ ছিল কেপ ভার্দে, ২০০৭ সালে। তৃতীয় দেশ হিসেবে মালদ্বীপ উন্নয়নশীল দেশের অভিধায় উন্নীত হয়েছিল ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি এবং চতুর্থ দেশ হিসেবে সামোয়া উন্নয়নশীল দেশের অভিধা পেয়েছিল ২০১৪ সালে। অনুমান করা হচ্ছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়া পরবর্তী দেশ হবে ইকুয়েটরিয়েল গিনি ও ভানুয়াটু। ২০১১ সালের মে মাসে এলডিসির ওপর জাতিসংঘের চতুর্থ সম্মেলনে প্রতিনিধিরা পরবর্তী ২০ বছরের মধ্যে অন্তত বর্তমান এলডিসিভুক্ত দেশের অর্ধাংশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়নের অভীষ্ট নির্ধারণ করেছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ২০২৪ সালে কার্যকর হবে।
বর্তমানে তিনটি দেশ এলডিসি মর্যাদার মানদণ্ড পূরণ করেছে, তবে জাতিসংঘের তথ্যের বৈধতা বা যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আলোচ্য সূচকে অন্তর্ভুক্তি অস্বীকার করেছে। দেশগুলো হলো ঘানা, পাপুয়া নিউ গিনি ও জিম্বাবুয়ে।
২০১৫-পরবর্তী এজেন্ডায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য কিছু প্রত্যক্ষ জবাবদিহিতা প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এজেন্ডার মধ্যে উন্নয়নের ধারণাগত কাঠামোর অংশ হিসেবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করা উচিত। এসবের জন্য যথেষ্ট চিন্তা ও উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন, যা বৈশ্বিক উন্নয়নে বহু পক্ষের (মাল্টিপল অ্যাক্টর) রাজনৈতিক ও প্রায়োগিক চাহিদা মেটায়।
সহযোগিতার চ্যানেল
বিশ্বায়নের প্রাসঙ্গিকতায় সহযোগিতার বেশ কয়েকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বাণিজ্য, বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ, ইকুইটি প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বন্ড বিক্রয়। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ হলো রফতানি ও আমদানি। উন্নয়নের প্রবক্তারা সহায়তার চেয়ে বাণিজ্যের পক্ষে অধিক জোর দেন। কারণ উন্নত দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে প্রাপ্ত সহায়তার অভিজ্ঞতা উৎসাহব্যঞ্জক নয়, বিশেষত সমতামূলক উন্নয়ন নিশ্চিত ও দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে। বাণিজ্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে কিছু উন্নয়নশীল দেশের মিশ্র অভিজ্ঞতা রয়েছে। যেমন ২০০৭ সালের তুলনায় ২০১২ সালে জিডিপির অনুপাত হিসাবে ১০টি দেশের রফতানি কমেছে। আবার বাংলাদেশসহ কিছু দেশের ক্ষেত্রে এটি সামান্য বেড়েছে। কেবল কোরিয়া প্রজাতন্ত্রে রফতানিতে তাত্পর্যপূর্ণ বৃদ্ধি ঘটেছে। এদিকে আমদানির দিক থেকে বাংলাদেশসহ ছয় দেশে আমদানি বেড়েছে। আবার নয়টি দেশে আমদানি কমেছে। চূড়ান্ত মূল্যে লাওস এও পাকিস্তান ছাড়া সব দেশেই লক্ষণীয় মাত্রায় এফডিআই বেড়েছে। আবার দেখা যায়, প্রধান অর্থনীতিগুলোসহ (চীন ও ভারত) আটটি অর্থনীতিতে ২০১১ থেকে ২০১৪—এ সময় পর্বে প্রতি বছরই প্রবৃদ্ধি হার কমেছে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের আগের সময়ের তুলনায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এসব দেশে বাণিজ্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও রফতানির প্রধান গন্তব্য হলো উন্নত দেশগুলো। উন্নত দেশগুলোয় নিম্নপ্রবৃদ্ধির বাস্তবতায় উন্নয়নশীল দেশের চ্যালেঞ্জ হলো, ওইসব দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং তাদের প্রবৃদ্ধি নৈপুণ্যের উন্নয়ন। উন্নত দেশ থেকে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহ কমতে পারে, কারণ বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং বিষেশত বর্তমানে ইউরোপে আর্থিক খাতের গোলযোগ বা অস্থিরতা থেকে সেসব দেশের ধীর পুনরুদ্ধার। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর উন্নয়নের গতি বাড়াতে বৃহত্তর দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদারের জন্যই উল্লিখিত পরিস্থিতির বিশ্লেষণ জরুরি।
বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা নেয়ার ক্ষেত্রে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর সম্ভাবনা উন্নয়নে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো নিজস্ব ক্ষুদ্র অভ্যন্তরীণ বাজার, অপর্যাপ্ত মূলধন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পরিপূরণে দক্ষতা ঘাটতি সৃষ্ট উন্নয়ন অসুবিধা প্রশমন দ্বারা প্রভূতভাবে সুফল পেতে পারে। গত তিন দশকে বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খল (গ্লোবাল ভ্যালু চেইন বা জিভিসি) বিশ্বায়নে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। জিভিসি পূর্ণমাত্রার আন্তঃসীমান্ত, মূল্য সংযোজিত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে নির্দেশ করে, যার জন্য প্রয়োজন ধারণা, ডিজাইন, কাঁচামাল আহরণ, মধ্যবর্তী ইনপুট ধাপ, উৎপাদনের মাধ্যমে একটি পণ্য বা সেবা সামনে আনা এবং বিপণন ও বণ্টনের মাধ্যমে সেই পণ্য বা সেবা চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানো। আঙ্কটাড কর্তৃক সংজ্ঞায়িত জিভিসি অংশগ্রহণ হার কোনো দেশের রফতানিতে বিদেশী মূল্য সংযোজিত উপকরণ সমন্বয়ের পরিধি কত (ঊর্ধ্বমুখী উপাদান) এবং কোনো দেশের রফতানির মূল্য সংযোজনের পরিধি অন্য দেশের রফতানিতে (নিম্নমুখী উপাদান) কত, সেটি নির্দেশ করে।
এসব দেশের মধ্যে জিভিসির সুযোগ-সুবিধা ভিন্ন ভিন্ন হলেও ক্ষুদ্র অভ্যন্তরীণ বাজার, আঞ্চলিক বাজারের এবং এরই মধ্যে উন্নয়ন হওয়া উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে কম সংযুক্ততার কারণে দেশগুলোর কিছু সাধারণ অসুবিধাও রয়েছে। ওইসিডি-ডব্লিউটিওর (২০১৩) জরিপ অনুযায়ী, অর্ধেকের বেশি অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানের চিহ্নিত করা মূল্য নিগড়ে সংযুক্তির ক্ষেত্রে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর প্রধান প্রতিবন্ধক হলো অপর্যাপ্ত অবকাঠামো। এছাড়া রয়েছে বাণিজ্য অর্থায়ন ও কারিগরি মান পরিপালনে সক্ষমতার ঘাটতি।
এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে অবকাঠামো উন্নয়নে বড় মাত্রার বিনিয়োগ, শিক্ষাগত ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থায় সংস্কার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোয় (এসএমই) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান প্রয়োজন হবে। এলডিসিগুলোয় মূলধন প্রাপ্যতা এবং কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে ‘এইড ফর ট্রেড’ কর্মসূচির মাধ্যমে সহযোগী দেশগুলো থেকে কারিগরি সহায়তা, জিভিসির নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
কাজ করার ক্ষেত্র
দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা উন্নয়নে নিচের ক্ষেত্রগুলোকে প্রাধিকার দেয়া উচিত।
এক. অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালন: কর ভিত্তি বাড়ানো, কর আহরণকারী কর্তৃপক্ষের দক্ষতা-সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং কর কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা (ডিসক্রেশনারি পাওয়ার) কমাতে হবে। তবে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের কৌশল জাতীয় সরকারের নির্ধারণ করা উচিত। উল্লেখ করা দরকার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিক থেকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালনের বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহায়তার (ওডিএ) প্রাসঙ্গিকতা কমানোর অজুহাত হিসেবে নেয়া উচিত নয়।
দুই. নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও এফডিআইসহ ব্যক্তি খাতের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি: বিদ্যমান বাস্তবতায় ভূমি নিবন্ধন এবং চুক্তি কার্যকর সম্পর্কিত আইনগুলোকে অধিকতর প্রাসঙ্গিক করতে হবে।
তিন. আর্থিক খাত শক্তিশালী করা: ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি ও পুঁজিবাজারের ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং লিঙ্গসমতার উন্নয়ন ঘটানো উচিত।
চার. নীতির ভূমিকা: সরকারগুলোকে নিজ উদ্যোগে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়া রাজস্ব ও আর্থিক নীতিসহ শিল্পনীতি, রফতানি নীতি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো নীতিগুলো প্রবর্তন করতে হবে।
পাঁচ. নিরাপত্তা ইস্যুগুলো মোকাবেলার ক্ষেত্রে জোরালো ও অধিক সমন্বিত দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত নাটকীয়ভাবে কমানোর সম্ভাবনা আছে, বিশেষ করে যদি মাদক পাচার, অর্থ পাচার ও বৈশ্বিক চোরাচালান বাজার বিলোপে সামষ্টিকভাবে টার্গেট করা হয়।
ছয়. লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের মানবিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবেলার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে। তবে সেটি করতে হবে দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়ে অসমতা হ্রাস, সামাজিক অস্থিরতা প্রতিরোধ এবং সামাজিক সংহতি উন্নয়নের মাধ্যমে।
সাত. জাতিসংঘ ব্যবস্থায় যেহেতু স্বতন্ত্র সংস্থাগুলো দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা বৃদ্ধিতে নিজস্ব নীতি ও কর্মসূচির জন্য কৌশলগত পন্থা অবলম্বন করে, সেহেতু উৎপাদনশীলতার সামর্থ্য এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্য শৃৃঙ্খল (জিভিসি) প্রতিষ্ঠার মতো প্রাধিকার ক্ষেত্রগুলোয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রচেষ্টাকে পৃষ্ঠপোষকতা জোগাতে একই দক্ষতার সহায়ক এজেন্সিগুলোকেও তাদের সমর্থন বাড়াতে হবে। এটি দেশগুলোয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ।
আট. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সবচেয়ে মৌলিক প্রভাবগুলো এখনো উপলব্ধিতে আসেনি, বিশেষত নতুন অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং বিপণন আয়োজনে সহায়তার ক্ষেত্রে, যা করপোরেশনের সেকেলে পদানুক্রমিক, ওপর-নিচ গঠনকে প্রতিদান দেবে। সম্ভাবনাময় নতুন বাজার বৃদ্ধি কারুশিল্প বা গ্রামীণ পণ্য উৎপাদনকে প্রতিযোগিতামূলক করবে, যদি যথাযথ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সামর্থ্য দক্ষিণ গোলার্ধজুড়ে গ্রামীণ এলাকার ক্ষুদ্র ও গুণগত মানের শিল্প উৎপাদনে আরো ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়।
নয়. দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতায় ব্যক্তি খাত ও নাগরিক সমাজের অসংখ্য অবদান জোরালো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে লালিত হতে পারে; যেটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবনসহ উচ্চপর্যায়ের দক্ষতা ও সম্পদ থাকা নন-স্টেট অ্যাক্টরের মতো অন্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রাধিকারমূলক উন্নয়ন চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে পদ্ধতিগতভাবে বিন্যাস করা হয়।
দশ. উন্নয়নশীল দেশগুলোর রফতানি খাত বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে (জিভিসি) অব্যাহতভাবে অংশ নিতে পারে, যা অভ্যন্তরে ও দেশগুলোর মধ্যে সুফল বৃদ্ধি করবে। অব্যাহত জিভিসির কর্মসূচি ২০১৫-পরবর্তী এসডিজির সঙ্গে একীভূত হতে পারে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য গৃহীত ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডায় রাষ্ট্র ও বাজারের মধ্যকার জটিল সম্পর্ক চিহ্নিত করা প্রয়োজন, যে সম্পর্কের প্রকৃতি মূলত সম্পূরক। অধিকন্তু সময় ও সুনির্দিষ্ট দেশের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র ও বাজারের পরিবর্তনশীল ভূমিকা চিহ্নিত করা এবং একে অন্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া প্রয়োজন। অতীতে সেসব দেশেই সাফল্য এসেছে, বিশেষত অবকাঠামো ও সামাজিক খাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন-প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতে যেসব দেশ রাষ্ট্র ও বাজারের মধ্যে সঠিক মেলবন্ধন ঘটাতে সমর্থ হয়েছে। একটি সুস্পষ্ট বার্তা থাকা উচিত যে এমডিজি অর্জন এবং ২০১৫-পরবর্তী এসডিজি বাস্তবায়ন ঐচ্ছিক নয়; যেহেতু একটি অধিকতর নিরাপদ, মানবিক ও সমৃদ্ধ বিশ্বের জন্য এটি অত্যাবশ্যকীয় বৈশ্বিক কার্যক্রম। আলোচ্য লক্ষ্যগুলো কেবল ‘সহায়তা বাধ্যবাধকতা’ নয়, সেগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের ভিত্তি; যা কেবল সবচেয়ে কম সৌভাগ্যবান নয়, বিশ্বের সব নাগরিকের উপকার করবে।
ড. সালেহ্উদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক










